হৃদরোগের ঝুঁকি কোলেস্টেরল সারাতে হোমিওপ্যাথি

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১৮ মে, ২০১৯ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
167

আধুনিক জীবন যাপনের মাধ্যমে লুকিয়ে আছে বিভিন্ন ধরনের বিপদ। জাংকফুড, তেল, মসলাযুক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে কম বয়সে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, হার্টের সুস্থতা ও রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বিশেষ সম্পর্কযুক্ত।
কোলেস্টেরল হচ্ছে এক ধরনের চর্বি। এটি দেখতে অনেকটা মোমের মতো নরম। এটি আমাদের দেহের কোষের দেখালে থাকে। আমরা যখন চর্বি জাতীয় খাবার খাই, তখন আমাদের লিভারে এই কোলেস্টেরল তৈরি হয় এবং রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে আমাদের দেহের সমস্ত রক্তনালিতে ছড়িয়ে পড়ে। এটি হরমোন তৈরিতে, চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলোর পরিপাকে ও ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে। যদি অধিক পরিমাণে চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়া হয় তবে এই অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ধমনির দেয়ালে জমাট বেঁধে প্লাক তৈরি করে এবং রক্ত চলাচলে বাঁধা দেয়। ফলে দেখা দেয় বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা।
প্রতিদিন মানুষ কত প্রকার খাদ্য গ্রহণ করে : প্রতিদিন মানুষ তিন প্রকার খাদ্য গ্রহণ করে থাকে, যেমন-ফ্যাট, প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট। এই ৩টি উপাদানের মধ্যে ফ্যাট সর্বোচ্চ শক্তিদান করে (৯ ক্যালরি/গ্রাম)। আমরা গড়ে প্রতিদিন ৪০০ গ্রাম ফ্যাট, ১০০ গ্রাম প্রোটিন ও ১০০ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করি। ফ্যাট বা স্নেহ বা চর্বি জাতীয় দ্রব্যকে মানব দেহের শত্রু ভাবা হলেও দেহের গঠন ও স্বাভাবিক কর্মকান্ডে ফ্যাটের ভূমিকা অনন্য।
ফ্যাট বা স্নেহ বা চর্বি জাতীয় দ্রব্যের কাজ কি

১. দেহের গঠনে সহায়তা করা।
২. দেহের গড়ন রক্ষা করা।
৩. দেহের প্রতিটি কোষে আবরণ তৈরি করা।
৪. দেহের নিয়মিত কাজে সহায়তা করা।
৫. দেহের খাদ্য ও শক্তি ভান্ডার হিসেবে কাজ করা।
৬. দেহের বিভিন্ন অঙ্গকে সঠিক অবস্থানে ধরে রাখা।
স্নেহ বা চর্বি জাতীয় পদার্থের ভূমিকা কি

স্নেহ জাতীয় পদার্থ দেহের জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু পরিমাণে বেশি হলেই বিপর্যয় ঘটে। দেহ খাদ্যের মাধ্যমে যে স্নেহ পদার্থ গ্রহণ ও কাজ করে তা খরচ করায় বৈষম্য হলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। গড়ে আমরা প্রতিদিন যে-পরিমাণ খাদ্য খাই তার মধ্যে ১৫% ফ্যাট থাকে। এই খাদ্য ফ্যাট খাদ্যনালিতে বিপাকের পর এবং রক্ত সংশোধনের পর লিভারে যায়। লিভারে কিছু পরিবর্তনের পর আবার রক্তনালি দিয়ে দেহের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে। দেহের সর্ব চর্বি বা কোলেস্টেরল আমরা খাবারের মাধ্যমে পাই না।
কোলেস্টেরল দু’ধরনের

এইচডিএল : একটি হাইডেনসিটি লাইপো প্রোটিন অর্থাৎ এইচডিএল। অন্যটি লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন অর্থাৎ এলডিএল। এইচডিএল ধমনির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় এলডিএল কোলেস্টেরল সরিয়ে দিতে সাহায্য করে। শরীরের অতিরিক্ত কোলেস্টেরলকে ধরে ধরে লিভারে নিয়ে যায়। লিভারে গিয়ে কোলেস্টেরল ভেঙ্গে যায়। এইচডিএলের পরিমাণ যত বেশি হৃদরোগের ঝুকি তত কম। তাই এটি ভালো কোলেস্টেরল।
এলডিএল : এলডিএল লিভার থেকে রক্তনালি ও অন্যান্য অংশে কোলেস্টেরল নিয়ে যায়। অতিরিক্ত কোলেস্টেরল রক্তনালিতে জমে জমে প্লাক তৈরি করে। তাই প্লাক পর্যায়ক্রমে রক্তনালিকে বন্ধ করে দেয়। তখন হার্ট এটাক হয়। তাই হার্ট এটাকের মতো জটিল ও জীবন সংহারি অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে হলে এলডিএল কমাতে হবে। সুতরাং এটা খারাপ কোলেস্টেরল।
কোলেস্টেরলের উৎস : প্রাণীদেহ ছাড়া অন্য কোথাও কোলেস্টেরল তৈরি হতে পারে না। আমাদের দেহের মধ্যে যতটুকু কোলেস্টেরল আছে তার ৭০% আমাদের লিভার থেকে আসে, বাকি ৩০% অন্যান্য প্রাণীজ উৎস (মাছ, মাংস, ডিম, লিভার, মগজ, গিলা ইত্যাদি) থেকে আসে।
কোলেস্টেরলের কারণে কি জটিলতা হতে পারে : অতিরিক্ত এলডিএল বা কম এইচডিএল বা বেশি ট্রাইগ্লিসারাইড থাকলে কিছু জটিল রোগ হতে পারে। আবার কিছু রোগের জটিলতা বৃদ্ধি পায়। যেমন : ১. ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ (আইএইচডি) বা বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগ ২. স্ট্রোক ৩. উচ্চ রক্তচাপ ৪. কিডনি ফেইলর ৫. শ্বাস কষ্ট ৬. সন্তানহীনতা ইত্যাদি।
কোলেস্টেরলের ঝুঁকি কমাতে যে ধরনের খাদ্য খেতে হবে : এ ক্ষেত্রে জলপাই তেল ও জলপাইয়ের তৈরি খাবার খুব উপকারী। যা খেলে শরীরে ভালো কোলেস্টেরল বাড়ে। এতে রয়েছে মনো-অ্যানস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড ও ভিটামিন-ই। শুকনো সোয়া প্রোডাক্ট, মটরশুঁটি জাতীয় খাবার শরীরের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। শিম জাতীয় ওয়ালনাট, জলপাইয়ের মধ্যে রয়েছে ওমেগা থ্রি ফ্যাট অ্যাসিড। সব ধরনের সবজি ও ফল খারাপ কোলেস্টেরেলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যেসব সবজিতে ভিটামিন-সি ও বিটা ক্যারোটিন রয়েছে, যেগুলো বেশি করে খেতে হবে। যেমন- কমলালেবু, আঙুর, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাকবেরি, পেয়ারা, আম, কাঁঠাল। এছাড়া বাঁধাকপি, ব্রকলি ও ভিটামিন সি’র ভালো উৎস। কুমড়ো, কাঠ বাদাম, গাজর, ইত্যাদির মধ্যে রয়েছে প্রচুর বিটা ক্যারোটিন। রসুন, পেঁয়াজ শরীরে বাজে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায় ও হৃদয় ভালো রাখে। রুটি, লাল চাউল, লাল গম, আটা ভুট্টা ওটমিল এ রয়েছে হাই সলিউবল ফাইবার। এই খাবারগুলো শরীরে ভালো কোলেস্টেরল তৈরিতে সাহায্য করে থাকে। সপ্তাহে তিনদিন অথবা তার চেয়ে বেশি মাছ খেলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরল কম থাকে। উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদযন্ত্রের রোগে মাছ খুব উপকারী। এতে উচ্চমাত্রার ওমেগা থ্রিফ্যাট অ্যাসিড রয়েছে।

যেসব খাবার খাদ্য তালিকা থেকে বাদ
দিতে হবে বা কম খেতে হবে
১. ফাস্টফুড (বার্গার, পেটিস, হটডগ, রোস্ট মাংস ও চকোলেট)।
২. ননিযুক্ত দুধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রী।
৩. গিলা, কলিজা, মাথা, ডিমের কুসুম।
৪. লাল মাংস (গরুর গোশত)
৫. প্যাকেটজাত মাছ ও মাংস ও ভাত।
৬. প্যাকেট জুস, কোলা ও মাখন
৭. বিস্কটু চিপস ও কেক
৮. সাদা চাল, সাদা আটা ও সাদা চিনি।
নিয়মিত ব্যায়াম ও কায়িক শ্রম করা
১. চিকনা মোটা নির্বিচারে প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ব্যায়াম করতে হবে।
২. চিকিৎসকদের পরামর্শক্রমে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে।
৩. হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, সাঁতার কিংবা যোগ ব্যায়াম যেভাবেই হোক ব্যায়াম করতেই হবে। নিজে বাগানের পরিচর্যা করা।
৪. খাবারের আগে ৫-১০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা।
৫. লিফট ব্যবহারের পরিবর্তে মাঝে মাঝে সিঁড়ি ব্যবহার করা।
৬. দীর্ঘ সময় বসে না থকে মাঝে মাঝে হাঁটাহাঁটি ও হাত-পাত নাড়াচাড়া করা।
৭. বাইসাইকেল বা ফিক্সড সাইকেল চালানো।
৮. রাতে কম খাওয়া।
৯. ধূমপান, মদ্যপান না করা বা ত্যাগ করা।
১০. ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চললের মানুষের জীবন ছন্দময় হয়।
১১. প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা। পরিমিত খাদ্য গ্রহণ কোলেস্টের নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায়।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান

মানুষের জীবনকাল সীমিত। সুস্থতার জন্য কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক মাত্রায় রাখতে হবে। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমেও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই রোগ প্রতিকারে নির্দিষ্ট মাত্রায় লক্ষণ সাদৃশ্যে নিম্মলিখিত ওষুধ ব্যবহৃত হয়।
যথা : ১. ক্রেটিগ্রাস ২. ডিজিটেলিস ৩. ন্যাজা ৪. কোবরা, ৫. ক্যাক্টাস ৬. নেট্রাম সালফ ৭. ক্যালকেরিয়া কার্ব ৮. অরামমেট ৯. কার্কুম লঙ্গা ১০. অ্যালিয়াম সেটিভাম ১১. স্ট্রোফেনথাস ১২. হিস্পাডাস ১৩. কোলেস্টেরিনাম ১৪. নাক্সভমিকা ১৫. মার্কসল ছাড়াও আরো ফলদায়ক ওষুধ আছে। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x