হৃদপিণ্ড হঠাৎ বড় হওয়া মানেই বিপদ

শনিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৮ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ
59

হৃৎপিণ্ডের পেশীর অস্বাভাবিক স্থূলতা ঘটলে তাকে সাধারণত হৃৎপিণ্ডের বিবৃদ্ধি বা হাইপারট্রফি বলে। প্রত্যেক ব্যক্তির হৃৎপিণ্ড বা হার্ট একটি নির্দিষ্ট মাপের হয়ে থাকে। সাধারণত ওই ব্যক্তির মুষ্টিবদ্ধ হাতের আকারের কাছাকাছি পরিমাণ মতো হয়ে থাকে। হার্ট মানুষের মুষ্টিরমতই একটি মাংসপিণ্ডের থলে, যার মধ্যে রক্তভর্তি থাকে এবং মাংসপেশি সংকোচন করে মানে থলের মধ্যে থাকা রক্তে চাপ প্রয়োগ করে রক্তকে হার্টের সঙ্গে সংযুক্ত বড় রক্তনালিতে প্রেরণ করে থাকে। যার জন্য হার্টকে একটি মেকানিক্যাল পাম্প বলা হয়ে থাকে। প্রতি মিনিটে ৭২ বার হার্ট সংকোচন করে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্ত রক্তনালিতে প্রেরণ করে সারা শরীরে রক্ত প্রবাহ নিশ্চিত করে থাকে। সারা শরীরে রক্ত প্রবাহ নিশ্চিত করতে হার্টকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে কাজ করতে অথবা শক্তি খরচ করতে হয়। তবে যদি কোনো কারণে হার্টকে অধিক শক্তি প্রয়োগ করতে হয় বা অধিক পরিমাণে কর্মসম্পাদন করতে হয় এবং সেটা যদি দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত রাখতে হয়, তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে নিয়ে হার্টের কলেবর বৃদ্ধি ঘটে, মাংস পেশির পরিমাণ বৃদ্ধি ঘটে থাকে। শুরুর দিকে হার্টের দেয়াল মোটা হতে থাকে এবং ভিতরে ফাঁপা অংশের আকার ছোট হয়। এ অবস্থা মানে হার্টের অধিক কর্মতৎপরতা যদি আরও বেশি সময় ধরে বজায় রাখতে হয়, তবে প্রাকৃতিক নিয়মেই হার্টের ভিতরে ফাঁপা অংশ বড় হয়ে থাকে। এতে হার্টের বাহ্যিক আকারও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। কখনো কখনো বুকের খাঁচার অর্ধেক জায়গা হার্ট দখল করে নিয়ে থাকে ফলে খাঁচার ভিতর থাকা ফুসফুস ও অন্যান্য অঙ্গ সংকুচিত হয়ে পড়ে। হার্টের আকার বৃদ্ধির ফলে, মানে মাংস পেশির পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে অধিক পরিমানে অক্সিজেন ও রসদের প্রয়োজন ঘটে থাকে। যেহেতু সরবরাহের পথ বা রক্তনালি আগের আকারই থেকে যায় ফলশ্রুতিতে হার্ট অক্সিজেন ও রসদের ঘাটতিতে ভুগতে থাকে। রসদ ও অঙিজেনের ঘাটতির ফলে হার্ট দুর্বল হয়ে পড়ে, কর্মক্ষমতা কমে যায়, ব্যক্তির বুকে ব্যথা অনুভূত হয়। ইহা একটি মারাত্মক রোগ লক্ষণ।

হৃৎপিণ্ড বা হার্ট বড় হওয়ার কারণ: হৃৎপিণ্ড বড় হওয়ার অনেক কারণ আছে। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো হলো অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাডপ্রেসার জন্মগত হৃৎরোগ, হার্টের ভাল্বের সমস্যা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, বাত ব্যথা থেকে হৃদরোগ, বাত জ্বর, হার্ট ব্লক, মাদক সেবন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ইত্যাদি কারণই উল্লেখযোগ্য। তবে কারণ যাই হোক না কেন, হার্ট যখন বড় হয়ে যায় তখন রোগীর লক্ষণগুলো একই ধরনের হয়ে থাকে, এবং প্রায় ক্ষেত্রেই হার্ট একই পরিণতির দিকে অগ্রসর হতে থাকে, যার মানেই হার্ট ফেইলুর।

হৃৎপিণ্ড বা হার্ট বড় হওয়ার লক্ষণ: এই রোগে আক্রান্ত রোগীর হৃৎপিণ্ড স্বশব্দে স্পন্দিত হয়। বিশেষ করে পরিশ্রমকালীন বুকে ব্যথার সঙ্গে সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হওয়া, অতি অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠা বা অধিক পরিশ্রান্ত হয়ে যাওয়া, পরিশ্রমকালীন মাথা হালকা অনুভূত হতে পারে। মুখমাথা ও শরীর অত্যধিক ঘেমে যেতে পারে, বুক ধড়ফড় করতে পারে, শ্বাসপ্রশ্বাস ঘন হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে রোগীর হার্টে অনেক ধরনের জটিলতা দেখা দিয়ে থাকে এবং দুর্বল হতে থাকে। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর যখন হার্টের আয়তন আরও বেশি বৃদ্ধি পায়, হার্ট তখন অত্যধিক দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে রোগীর হার্ট ফেইলুর সৃষ্টি হয়ে থাকে। এতে পূর্ব আলোচিত উপসর্গের সঙ্গে আরও বেশ কিছু উপসর্গ যোগ হয়। যেমনরাতে শ্বাসকষ্ট হওয়া বা শুকনো কাশির উদ্বেগ হওয়া বিশেষ করে ভরা পেটে বিছানায় শুতে যাওয়ার সময়, পেট ফেঁপে যায়, পেটের আকার বড় হয়ে যায়, পেটে অত্যধিক গ্যাস উৎপন্ন হয়, বদহজম দেখা, খাওয়াদাওয়ায় অরুচি সৃষ্টি হয়। হাতপামুখ পানিতে ফুলে যায়, হাতপা জ্বালাপোড়া করতে দেখা যায়, বয়স্ক ব্যক্তিদের বেলায় অত্যধিক শ্বাসকষ্ট হতে দেখা যায়। নাড়ী ক্ষুদ্র ও দ্রুত হয়, মাথা ধরা, মাথা ঘোরা প্রভৃতি লক্ষণ প্রকাশ পায়, কখনো কখনো বুকের এক পাশ ফুলে ওঠে। সাধারণত বামপাশেই রোগ লক্ষণ বেশি দেখা যায়।

আনুষঙ্গিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও পথ্য: যাদের হৃদরোগ থাকে তাদের ঠাণ্ডা জলে স্নান করতে দেয়া উচিত নয়। যাতে ঠাণ্ডা না লাগে সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখা উচিত। সর্বদা গরম পোশাক ব্যবহার করা ভাল। পরিধেয় পোষাক ঢিলা হতে হবে। যাদের শরীরে ক্লান্তি হয় এরূপ পরিশ্রম করা নিষিদ্ধ। সন্ধ্যা সকালে খোলা মাঠে অল্প অল্প বেড়াল ভিন্ন অন্য কোনও প্রকার পরিশ্রম এবং মানসিক পরিশ্রম করাও নিষিদ্ধ, যাতে মস্তিষ্কের চালনা ও মনের উদ্বেগ হয় এরূপ কোন প্রকার ভাবনা চিন্তা করবেন না। স্ত্রীলোকের পুরুষ সহবাস এবং পুরুষের স্ত্রী সহবাস একেবারে নিষিদ্ধ, বিশেষতঃ মাইট্র্যাল ও এওটিকভালভের পীড়াগ্রস্থ ব্যক্তিগণের পক্ষে তা বিষবৎ। এওটিক ভাল্বের পীড়াগ্রস্থ ব্যক্তিগণকে বিছানা হতে আদৌ উঠতে দিবেন না। মলমূত্র ত্যাগ আহার, সমস্ত কিছু বিছানার ওপর করাতে হবে। রোগীর কোস্ট পরিস্কারের বিষয়ে সর্বদা লক্ষ্য রাখা উচিত। পুষ্টিকর অথচ যাতে সহজে হজম হয় এইরূপ সমস্ত খাদ্যই দিতে হবে। সর্বপ্রকার মাদক দ্রব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ।

হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান: হৃৎপিণ্ড বড় হওয়ার কারণে যে উপসর্গ দেখা দেয় তার প্রতিকারে হোমিওপ্যাথিতে অত্যন্ত ফলদায়ক ওষুধ আছে। যা অন্য প্যাথিতে নেই। লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহারে এই রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করে। যথা

) একোনাইট ন্যাপ: হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া দ্রুত, স্পন্দন, ফুসফুসে রক্ত সঞ্চয়, শ্বাসকষ্ট, নাড়ি দ্রুত ইত্যাদি লক্ষ্মণে ইহা প্রযোজ্য। বাম পার্শ্বে বেদনা, হৃদযন্ত্রের পীড়ার সঙ্গে বাম স্কন্ধ মূলে বেদনা। বুকে সূচিভেদ্য বেদনা। উৎকণ্ঠার সংগে বুক ধড়ফড় করে। হাতের আঙুলে ঝিঝি ধরে। নাড়ি পূন কঠিন, শক্ত, নিদ্রার সময় বোবায় ধরা, চিৎকার করা।

) আর্সেনিক এল্বাম: হৃদস্পন্দন, বেদনা, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতার ভাব খুব বেশি। ধুমপায়ী ও তামাক সেবীদের হৃদযন্ত্রের উত্তেজনা। প্রাতকালে নাড়ি অপেক্ষাকৃত দ্রুত, হৃদপিণ্ডের প্রসারণ, নীল পান্ডু রোগ, মেদাপকর্ষ, হৃদশূল তৎসহ ঘাড়ে ও মাথা, পিঠে বেদনা। পিঠের নিুাংশে বেদনা। হাপ ধরা, অস্বস্থি ভাব।

) ক্যাকটাস গ্র্যান্ডি ফ্লোরাস : হৃৎপিণ্ডের বিবৃদ্ধি, লুপ্তপ্রায় নাড়ি, শারীরিক অবসন্নতা, শ্বাসপ্রশ্বাসে অত্যন্ত কষ্ঠ, এই জন্য রোগী শুয়ে থাকতে পারে না, কথা বলতে কষ্ট হয়, ভাল ঘুম হয় না, শোথভাব দেখা দেয়। পায়ে শোথভাবসহ হৃদস্পন্দন, রক্ত দ্রুত জমাট বাঁধার প্রবণতা। রোগ আক্রমণ নির্দিষ্ট সময় উপস্থিত হয়।

) আর্নিকা: হৃদ বেদনা, বাম কনুইয়ের উপর অধিক বেদনা। হৃদ প্রদেশে যেন খোঁচামারা ব্যথা। দুর্বল এবং সবিরাম। শ্বাসকষ্টের সংগে হৃৎপিণ্ডের শোথ, হাতপা ছড়িয়ে রাখে। হৃৎপিণ্ডে মেদ সঞ্চয় এবং হৃৎপিণ্ডের বিবৃদ্ধি। আঘাতজনিত কারণে হৃদবেদনা। আঘাত, পতন, প্রহার, নিস্পেষণ প্রভৃতির জন্য হৃদবেদনা।

) স্পাইজেলিয়া : হৃদপিণ্ডের বিবৃদ্ধি বিশেষ করে ডান দিকে প্রসারণ হলে ইহা বিশেষ উপযোগী। প্রবল হৃদস্পন্দন, হৃদ প্রদেশে বেদনা, সঞ্চালনে অতিশয় বৃদ্ধি, পুনঃপুনঃ বুক ধড়ফড়ানি, মুখে বিশ্রী গন্ধ, নাড়ি দুর্বল এবং অনিয়মিত, হৃদবেষ্ট প্রদাহ তৎসহ খোঁচামারা বেদনা। শ্বাস কষ্ট। স্নায়ুশূলে এক বাহু বা উভয় বাহু আক্রান্ত।

বাতজাতীয় হৃৎপিণ্ড প্রদাহ বামপার্শ্বে টাটান ব্যথা। উল্লেখিত ওষুধ ছাড়াওডিজিটেলিস, ক্যালকেরিয়া ফ্লোর, ভিরেন্ট্রাম ভিরিডি, ট্যাবেকাম, স্ট্রোফ্যান্‌থাস, কনভ্যালেরিয়া, নেরিময়ওডোরাম, এডোনিস ভার্ন্যালিস, ক্র্যাটিগাস, আইবেরিস, ক্যালমিয়া, এপোসাইনাম, অরামমেট, স্পঞ্জিয়া, রাসট্রক্স, ব্রোমিয়াম ইত্যাদি লক্ষণভেদে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x