হুল

ফারজানা রহমান শিমু

মঙ্গলবার , ১২ জুন, ২০১৮ at ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ
14

অফিস করছে, বউকে সময় দিচ্ছে, মেয়ের

প্যানপ্যানানি, ছেলের ধুমধাম . . . উফ্‌, মাঝে মাঝে ক্লান্তি লাগে খুব।

গায়ের জোরে কলমটি ছুঁড়ে মারল রেহান। কালিশূন্য কলমটি দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পুরু কার্পেটের উপর গিয়ে পড়ল। বেয়ারা চানাস্তার ট্রে হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে গেল থমকে। তিন বছর ধরে রেহান স্যারকে বেশ ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ বলে মনে হয়েছে।

কিন্তু তার সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে জানে, স্যারদের ঊনিশবিশের দিকে চোখ তুলে দেখতে নেই। তাই সে ‘আসবো স্যার’ বলে হাঁক মারল। রেহান হাত ইশারায় বেয়ারাকে অনুমতি দিল। কিছুই না দেখার ভান করে সে তার কাজ সারল। কেবল চলে যাওয়ার সময় চোরাচোখে স্যারের দিকে দেখল একবার। রেহান ততক্ষণে ডুবে গেছে কাজে।

তিনদিন ধরে ক্রমাগত একই হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছে রেহান। এত বড় গরমিলটা হয় কি করে? একটা সূতাও যদি ফ্যাক্টরিতে ঢোকে, কয়েক জায়গায় তার রেকর্ড রাখা হয়। একটি চেক ছাড়তে হলে তিনজনের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। তাহলে একই চেক দু’বার পে হয় কি করে? তবে কি ঘরের শত্রু বিভীষণ হয়ে দাঁড়াল? মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে আসাদকে ডেকে পাঠালো রেহান। দু’জনে মিলেও কোন সমাধান খুঁজে পেল না।

প্রবল অস্বস্তি নিয়ে ঘরে ফিরল রেহান। মাথার দু’পাশটা টিপটিপ করছে যন্ত্রণায়। বেডরুমে অন্ধকার দেখে রাগের মাত্রা খানিকটা বেড়ে গেল তার। এই হয়েছে জ্বালা! দু’তিনদিন পরপর শান্তার মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হবে আর বেডরুম অন্ধকার করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় লেপ্টে থাকবে সে। মহারাণীর আশেপাশে কেউ যেতে পারবে না, কোন শব্দ করা যাবে না। নানা রকম কঠিন রোগের প্রতিষেধক পাওয়া যায়, মাইগ্রেনের কিছু হয় না কেন? তাতে অন্তত: অফিস ফেরত রেহানের সন্ধ্যাটা খানিকটা মায়ায় জড়িয়ে থাকত। টাইয়ের নট লূজ করতে করতে বেশ জোরেই সে হাঁক ছাড়ল, ‘বুয়া, কিছু থাকলে দাও। খিদে পেয়েছে। বেডরুমে নড়াচড়ার আভাস পাওয়া গেল। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে শান্তা এসে বলল, ‘আমার পেইন উঠলে তুমি রাগারাগি করো কেন? তোমার সব ঠিক করে রেখেছি।’ কঠোর নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও রেহানের কণ্ঠটা ভারী শোনায়। কপাল কুঁচকে সে বলে, ‘বুয়াকে নাস্তা দিতে বলছি। রাগ করলাম কোথায়?’ শান্তা গটমট করে ঢুকে পড়লো বেডরুমে।

চানাস্তার ফাঁকে ছোট্ট নিকিতা এসে বাপের কোল ঘেঁষে বসে। রেহান একটি বিস্কিট তুলে দেয় তার হাতে। কিন্তু না, বিস্কিটের প্রতি তার কোন আগ্রহ নেই। রাজ্যের আগ্রহ তার হাজার রকম প্রশ্নে। শুরুটা এভাবেই হল, ‘আচ্ছা বাপী, মামুনীর কি হয়েছে?’ রেহান মেয়ের গালে টুক করে একটি চুমু খেয়ে বললো-‘পেইন করছে, মা।’

নিকিতার দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘কেন বাপী?’ রেহান আনমনে বলল, ‘এমনি।’ তৃতীয় প্রশ্ন বড়ই সরল, ‘এমনি কেন বাপী?’ রেহান অসহিষ্ণু স্বরে বললো-‘খেলতে যাও, মা।’ নিকিতা অভিমানী কণ্ঠে জানালো– ‘কার সাথে, বাপী? ভাইয়ার এক্সাম। ভাইয়া তাই আমার মাথায় গাট্টা দিয়েছে। বলেছে আর কোনদিন খেলবেনা আমার সাথে।” নিকিতার ঠোঁট কেঁপে উঠতে দেখে রেহান সজোরে ডাকল, ‘বুয়া, নিকির সাথে খেল।’

এক অদ্ভুত শূন্যতা পাক খেতে লাগল রেহানের মনে। এক সময় কি ছটফটে আর দুরন্ত ছিল রেহান! খেলছে, ছুটছে, আড্ডা মারছে, তাস পিটাচ্ছে, সাঁতার কাটছে, বাইক চালাচ্ছে বেপরোয়া। হোটেলে ভরপেট খাবার খেয়ে ইচ্ছে করে বিল না দিয়ে পালাচ্ছে রেহান। প্রিয় বন্ধুর প্রেয়সীর সাথে মোবাইলে প্রক্সি দিচ্ছে রেহান। আর আজ! মাজাঘষা করে পরিবেশিত কোন এন্টিক্‌সের মত পোলাইট রেহান। অফিস করছে, বউকে সময় দিচ্ছে, মেয়ের প্যানপ্যানানি, ছেলের ধুমধাম . . . উফ্‌, মাঝে মাঝে ক্লান্তি লাগে খুব।

আচ্ছা বাপী, একটা মোবাইল কখন কিনে দেবে? আমার সব ফ্রেন্ডদের মোবাইল আছে, আমি শুধু ল্যাগ বিহাইন্ড।’ ইংলিশ মিডিয়ামের এই হল প্রোডাকশন। টুটুলের কোন বাক্যই পুরোপুরি বাংলা নয়। আর কেমন যেন উদ্ধত একটা ভাব এসে যাচ্ছে ওর আচরণে। রেহান নিজেও চঞ্চল ছিল, কৈশোরে তারও কিছু পরিবর্তন এসেছিল, কিন্তু তাকে ঠিক অমার্জিত বলা যায় না। মাঝে মাঝে টুটুলের আচরণ রেহানকে দ্বিধান্বিত করে। মনে হয় এই ছেলে বড়ই দায়িত্ব জ্ঞানহীন হবে। এসব ভাবতে ভাবতেই রেহান জবাব দেয়, ‘আরেকটু বড় হও, বাপ।’ ছেলের অসহিষ্ণু ঝাঁজ, ‘আই অ্যাম ওল্ড এনাফ, ড্যাড। বেটার ইউ গ্রো আপ।’ দুপদাপ পা ফেলে অন্য রুমে চলে গেল টুটুল। কষে একটা থাপ্পড় মারার ইচ্ছেটা অতি কষ্টে দমন করল রেহান। নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবল সময় বলে কথা!

মোবাইলের রিংটোন শুনে ঝাঁকি খেল রেহান। হালকা তন্দ্রা এসে গিয়েছিল সোফাতেই। কল রিসিভ করতেই রবিনের দরাজ কণ্ঠ শুনতে পেল, ‘কিরে, তোর এলিয়ন না’কি বিগড়ে গেছে? প্রবলেম কি?’ জবাবে রেহান বলল, ‘আর বলিসনা, সার্ভিসিংয়ে দিলাম। তোর চলছে কেমন?’ টুকটাক খুচরা আলাপের ফাঁকে হিসেবের গরমিলটা আবারো মনে পড়ে গেল। অস্বস্তির কাঁটা ফুটতে লাগল রেহান। বারবার মনে হচ্ছে, কি যেন ধরতে গিয়ে ধরা গেল না, চোখে পড়তে পড়তেই চোখের আড়াল হয়ে গেল।

ভাবনায় ডুব সাঁতারে নিজেকে হারাতে হারাতে মনে পড়ে গেল জেনিকে। প্রবল দাবদাহে এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়ার মতো জেনি এসেছিল রেহানের জীবনে। দুরন্ত রেহানের চঞ্চলতায় কেমন স্নিগ্ধতার পরশ বুলিয়ে দিত জেনির মৃদুহাসি। কখনোবা দু’চার বাক্যের জবাব। খুব কম বলে এত বেশি বোঝাতে পারার ক্ষমতা আর কারো মধ্যে দেখেনি রেহান। কিন্তু কি নিদারুণ তার চলে যাওয়া! এতটুকু ভাবান্তর ছিল না মুখে, ছিল না আচরণে কোন গ্লানিবোধ। খুব সাধারণ বিদায়ের মতই বলেছিল, ‘এসো বিয়েতে।’ জেনিহীন জীবন যেন থম্‌কে গিয়েছিল স্থিরচিত্রের মত।

জীবনীশক্তির সবটুকু শুষে নিয়ে চলে যাওয়া সেই জেনি আবারো সামনে এসে দাঁড়াল আজ সকালে। শোকে আর বেদনায় মূহ্যমান জেনি সিভি জমা দিতে এসেছিল। কোনো নারী নয়, যেন এক নির্জীব রোবট দাঁড়িয়েছিল সামনে। জেনিকে চলমান এক মন্ত্র বলে মনে হচ্ছিল রেহানের। কোথায়, কেমন আছে জানতে চাইলে ঠিক আগের মতো একটি শব্দে জবাব দিল, ‘একা’। বিচলিত রেহান জানতে চাইল, ‘কেন? কি হয়েছে? কোন প্রবলেম?’ জেনির জবাব, “এক্সিডেন্ট। স্পট ডেড।’

একদিন জেনির অন্তর্ধান রেহানের জীবনকে যেমন নিঃসঙ্গ করে দিয়েছিল, আজ তার বেদনা ও মনকে ছুঁয়ে গেল তীব্রভাবে। ক্ষণিকের জন্য শান্তা, টুটুলও নিকিতা ফ্ল্যাশ ব্যাকে চলে গেল। চিত্ত জুড়ে স্থির হয়ে রইল জেনি। এরপর সর্বনাশের ঘণ্টা বাজার আগ মুহূর্তে অসহায়ত্বের হুলটা হৃদয়ের ঠিক মাঝ বরাবর গেঁথে গেল বড্ড শক্ত হয়ে। কালের প্রবাহ জেনিকে কবেই ঢেকে দিয়েছে অন্ধকার চাদরে! কিছুই আর করার নেই রেহানের। ঠিক সে সময় পা পিছলে মুখ থুবড়ে পড়ে চিৎকার করে ডাকলো নিকিতা, ‘বাপী . . .’

x