হিমোফিলিয়া নিরাময়ে

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ
90

হিমোফিলিয়া হচ্ছে এক ধরনের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণজনিত বংশগত রোগ। যে রোগে রক্ত সহজে জমাট বাঁধে না। এ রোগ পুরুষদের হয়, তবে নারীরা এ রোগের জিনের বাহক।
হিমোফিলিয়ার কারণ : হিমোফিলিয়া হওয়ার কারণ লিঙ্গনির্ধারক ক্রোমজমের নির্দিষ্ট কিছু গঠনগত বিকৃতি। এতে রক্তে কিছু ফ্যাক্টরের (ফ্যাক্টর এইট বা ফ্যাক্টর নাইন) ঘাটতি হতে পারে। যে কারণে শরীরের কোথাও থেকে রক্তক্ষরণ হলে তা আর জমাট বেঁধে বন্ধ হতে পারে না। ফ্যাক্টর এইট ঘাটতির কারণে হয় হিমোফিলিয়া-এ, ফ্যাক্টর লাইন ঘাটতি হলে হয় হিমোফিলিয়া-বি।
হিমোফিলিয়ার লক্ষণ : দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষরণই এ রোগের প্রধান লক্ষণ।
অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টের অভ্যন্তরে বা মাংসপেশির অভ্যন্তরে কোনো রকম আঘাত ছাড়া বা সামান্য আঘাতেই রক্তপাত ঘটে। যার কারণে সংশ্লিষ্ট স্থানে ফুলে যাওয়া, ব্যথা হওয়া এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া না করতে পারা।
অনেক সময় বাচ্চা ভূমিষ্ট হওয়ার পর নাড়ি কাটা স্থান থেকে প্রচন্ড রক্তক্ষরণ হয়।
শিশু যখন হামাগুড়ি দিতে শেখে, তখন অস্থি সন্ধিতে স্বতঃস্ফূর্ত রক্তক্ষরণ হয়ে হাঁটু, কনুই, পায়ের গোড়ালি ফুলে যায়।
খৎনা করার পর অথবা দাঁত ফেলার পর রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়া।
প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তপাত হওয়া।
পায়খানার সঙ্গে রক্তপাত হওয়া।
মাংসপেশী যেমন উরু, নিতম্ব, তলপেটের মাংসপেশিতে রক্তক্ষরণ ও ব্যথা হওয়া।
সামান্য আঘাত ও আঘাত ছাড়াও মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হওয়ার কারণে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
হিমোফিলিয়া রোগীর ৭০-৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে বড় বড় অস্থিসন্ধি যেমন- হাটু, কনুই ও পায়ের গোড়ালিতে রক্তক্ষরণ হয়। ফলে জয়েন্ট ফুলে যায় ও প্রচন্ড ব্যথা হয়। সঠিক চিকিৎসা না করলে একই জয়েন্ট বারবার আক্রান্ত হওয়ার ফলে নির্দিষ্ট জয়েন্ট কার্যকারিতা হারায়।
জ্বর, খিদে কমে যাওয়া, রক্ত পাত বা অ্যানিমিয়াও এর লক্ষণ।
রোগ নির্ণয় : হিমোফিলিয়া রোগ নির্ণয়ের জন্য পারিবারিক ইতিহাস, রোগের লক্ষণ এবং রক্তের কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নিশ্চিত হওয়া যায়। এখানে পারিবারিক ইতিহাস বলতে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ হিমোফিলিয়ার রোগীর মাতৃকুলের পুরুষ সদস্যদের কারো এই রোগের ইতিহাস পাওয়া যায়। আর এর সঙ্গে ওপরে বর্ণিত লক্ষণগুলো যদি থাকে, তাহলে তাদের রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যার ধরণ নির্ণয়ের জন্য ধাপে ধাপে কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে হিমোফিলিয়া বা এ জাতীয় যেকোনো রক্ত জমাট বাঁধা সমস্যা নির্ণয় করা হয়।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষা : বিটি, সিটি, পিটি, এপিটিটি করতে হবে। আরো নিশ্চিত ও নির্দিষ্টভাবে কোন্‌ ফ্যাক্টরের অভাব তা জানার জন্য এপিটিটি মিক্সিং টেস্ট ও ফ্যাক্টর ৮ বা ৯ অ্যাসে করতে হয়।
আনুষঙ্গিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও পরামর্শ : হিমোফিনিয়া নিরাময়যোগ্য রোগ নয়। হিমোফিনিয়া রোগের চিকিৎসা মূলত প্রতিরোধমূলক। এ রোগের চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হিমোফিলিয়াজনিত জটিলতা থেকে রোগীকে রক্ষা করা। জটিলতা মধ্যে আছে জয়েন্টে এবং মাংসপেশিতে বারবার রক্তক্ষরণের কারণে তা নষ্ট হয়ে পঙ্গুত্ববরণ, মস্তিস্কের অভ্যন্তরে বা শ্বাসনালির ভেতরে রক্তক্ষরণজনিত মৃত্যু ইত্যাদি। তাই রক্তপাত প্রতিরোধ করা, রক্তক্ষরণ শুরু হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণই হচ্ছে এর প্রধান চিকিৎসা। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া এদের অস্ত্রোপচার করা উচিত নয়। ক্ষতস্থানে অন্টিসেপটিক ড্রেসিং করা প্রয়োজন এবং উচিত নয় তা বারবার পাল্টানো, যদি না খুবই দরকার হয়। এ কথা খেয়াল রাখা উচিত যে হিমোফিলিক রোগীর ক্ষতস্থান সম্পূর্ণ নিরাময় না হওয়া অবধি তা থেকে রক্তপাত হবেই।
হেমো-আরথ্রোসিস আঘাতজনিত ইন্ট্রাক্রোনিয়াল অথবা স্পাইনাল একসট্রাডুরাল হেমোটোমা খুবই মারাত্মক ব্যাপার। যদি চামড়া কেটে রক্তপাত হয়, তবে তা চেপে ধরলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত চাপ উলটো বিপত্তি ঘটাতে পারে। সেক্ষেত্রে হেমোগ্লোবিন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায় সেক্ষেত্রে রক্তদান জীবন বাঁচাতে পারে।
যেসব খেলাধুলায় ব্যথা পাওয়ার আকাংখা থাকে যেমন- ক্রিকেট, হকি, ফুটবল পরিহার করা। হালকা ব্যায়াম করা (যেমন- সাঁতার কাটা, হাঁটা ইত্যাদি)। ব্যথা নিরাময়ের জন্য অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ গ্রহণ না করা।
জয়েন্ট বা মাংসপেশিতে রক্তক্ষরণ হলে ঘরে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ, যেমন- আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে ৫ মিনিট বরফ দিয়ে চেপে ধরতে হবে। তারপর ৫-১০ মিনিট বিরতি দিয়ে পুনরায় ৫-১০ মিনিট বরফের সেঁক দিতে হবে।
হিমোফিলিয়া রোগীদের মাংস পেশিতে কোনো ইনজেকশন দেয়া যাবে না।
হিমোফিলিয়া প্রতিরোধ : হিমোফিলিয়া প্রতিরোধের উপায় আছে। হিমোফিলিয়া বাহক মায়ের গর্ভে যদি পুত্র সন্তান আসে, তবে সেই ভ্রুণটি হিমোফিলিয়ার রোগে আক্রান্ত কিনা তা পরীক্ষা করে নির্ণয় করা যায়। এ পরীক্ষাটি বাংলাদেশেও করা যায়।
হিমোফিলিয়ার ডায়েট : হাই ইউরিক অ্যাসিড বা হাই প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন- রেডমিট, মটরশুটি, পালংশাক কম পরিমানে খাওয়াই ভাল। সবুজ শাকসবজি, তাজা ফল, সিজনের ফল, বিট, গাজর খাওয়ার চেষ্টা করা। ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল- যেমন- কমলালেবু, মুসাম্বি, আমলকি খেতে দিতে হবে।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : হিমোফিলিয়া রোগের ক্ষেত্রে লক্ষণ সাদৃশ্যে দীর্ঘদিন ধাতুগত চিকিৎসা চালালে আরো অনেক দুঃসাধ্য জটিল রোগের মত এ ক্ষেত্রেও উপকার পাওয়া যেতে পারে। এ রোগে ব্যবহৃত কয়েকটি ওষুধ নিম্নে প্রদত্ত হলো। যথা- (১) আর্নিকা মল্ট, (২) কার্বোভেজ, (৩) ক্রোকাস, (৪) এরিজেরন, (৫) ইপিকাক, (৬) ফসফরাস, (৭) এসিড সালফ, (৮) চিনিনাম সালফ, (৯) ক্রোটেলাস, (১০) হ্যামামেলিস, (১১) ল্যাকেসিস, (১২) রাসভেনেনেটা, (১৩) সিকেলি, (১৪) টেরিবিন্থনা, (১৫) পালসেটিলা, (১৬) থুজা উল্লেখযোগ্য।
এনিমিয়া উপস্থিত হলে- আর্সেনিক, চায়না, চিনিনাম আর্স, ফেরাম, নেট্রাম সালফ প্রভৃতি ওষুধ প্রযোজ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x