হাড়ের হরিণী : আনন্দ ও বেদনার দীপ্ত কাব্য

ইসতিয়াক জাহাঙ্গীর

শুক্রবার , ১৬ মার্চ, ২০১৮ at ৭:২১ পূর্বাহ্ণ
102

প্রথমেই স্বীকার করে নেয়া ভাল যে,না আমি সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম,না প্রথাগত সাহিত্য সমালোচক।কবি এবং কবিতার প্রতি মোহ থেকে কখনও কখনও প্রিয় কিছু কবির কাব্য আলোচনা করেছি। আমাদের কালের বাতিঘর দৈনিক আজাদীর অরুণ দাশ গুপ্ত এবং তরুণ লেখকদের ভরসার নোঙর কবি, লেখক রাশেদ রউফ এর প্রশ্নয়ে তা ছাপাও হয়ে যায়।কেবল সেটুকুন ভরসায় অগ্রজ কবি আকতার হোসাইন’র সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ “হাড়ের হরিণী” নিয়ে অল্প কিছু বলার সাহস পাচ্ছি।

কাব্য বিচারের জন্য দশকওয়ারী বিভাজন খুব প্রয়োজন কি? তারপরেও যদি চিহ্নিত করতে হয়,তবে এক স্বতন্ত্র রোমান্টিক কণ্ঠস্বরের কবি আকতার হোসাইন নিঃসন্দেহে আশির দশকের তরুণ তুর্কি। আবার এরইমাঝে লেখালেখি থেকে স্বেচ্ছানির্বাসনও।ফলে সমসাময়িক লেখক কবিদের থেকে পিছিয়ে পড়াটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু নব্বইর দশকে আমরা পুনঃ আবির্ভূত হতে দেখি এক অনাবিল প্রাণবন্ত কবিকে। অতি অল্প সময়ে পুষিয়ে নিতে চাইলেন দীর্ঘ বিরতির যাবতীয় ক্ষতি। নিরবচ্ছিন্ন এবং দ্রুতলয়ে শুরু করলেন লেখালেখি। নির্বাচিত কবিতা এবং নির্বাচিত প্রেমের কবিতাসহ প্রায় নয়টি গ্রন্থের গর্বিত জনক হয়ে গেলেন এই সময়টুকুতেই।তার মানে যেন,পাগলা হাওয়ায় ভেসে গিয়ে কাব্যলক্ষীর শ্রীচরণ ছূঁতে চাইছেন এক তাড়িত কবি। কাব্য তালিকা দেখে সহজে অনুমেয়, কবির নিবেদন বিফলে যায়নি। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রশ্ন জাগতে পারে,সে কি কেবল প্রকাশের তাড়না মাত্র না, কবি আকতার হোসাইন’র নিবিষ্ঠ পাঠকমাত্রই জানেন,তাঁর প্রকাশিত প্রতিটি কাব্যগ্রন্থেই তিনি নিজেকে বারবার ভেঙেচুরে অতিক্রম করেছেন পরম অবলীলায়।

কবির “নির্বাচিত কবিতা“ প্রকাশের ছয় বছর পর ফেব্রুয়ারি ২০১৭তে প্রকাশিত আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ “হাড়ের হরিণী“।এবার পাঠকের সামনে কিরূপে হাজির হন কবি! ব্যক্তি আকতার হোসাইন’র সৌন্দর্যের সাথে যেন নিয়তি গ্রন্থ রোমান্টিকতার এক যোগসূত্র বর্তমান। সেহেতু উক্ত গ্রন্থেও নারী চিত্রিত হয় বহুভাবে,বহুবর্ণে। সে খুব স্বাভাবিকও বটে। তারও বাহিরে আটপৌঢ়ে এমন এক কবিকে এখানে পাঠক আবিষ্কার করেন, সমাজসংসাররাষ্ট্র ইত্যাদি এক অতি আশ্চর্য বয়ানে যিনি হয়ত বর্তমান, আবার হয়ত অবর্তমানও। না দুঃখ,না বেদনা কিংবা অসীম আনন্দ, অপার জৌলুসদুদিকেরই এক মহান ভারসাম্য। অন্তর্লোকের আলোতে আমরা কয়েকটি কবিতায় দৃষ্টি রাখতেই পারি।

এই যে না এবং হ্যা এর মহামিলন, সূচির প্রথম কবিতা ‘ধুলিসান্ত্বনা’ তা কেমন, একটু দেখা যাক।

এ প্রণয় বিভ্রান্তিসঞ্চারি।

উটের জকির দৃষ্টিপথে মরীচিকা অন্তরেখা

কোলাহল আর উল্লাস শেষে রক্তকান্নামাখা

ধুলিসান্ত্বনা।

রক্তকান্নামাখা এ কঠিন ধুলিসান্ত্বনার বিপরীতে তবু ধনাত্মক সুর শুনতে পাই এভাবে

তবু এ প্রণয়ছাড়পত্রের জন্য ভিড় ঠেলে কেউ লাইনে দাঁড়ায়

মায়ের বাঁশের ঠুনির ব্যাংক থেকে পয়সা হাতিয়ে দৌড়ায় সূর্যমেলায়

সেজেগুজে মন পেতে চায় কেউ দ্রৌপদীলিঞ্ঝু বহুবল্লভের।

বিপরীত্যের ঐক্য সুরের কি এক মনোহর ব্যঞ্জনায় পাঠক হৃদয় উদ্বেল করার এক আগ্রাসী যাদুমন্ত্র যেন ছড়িয়ে রয়েছে পুরো কবিতায়।আর কবিতার চিত্রকল্প! উটের জকির দৃষ্টিপথ ধরে পাঠককেও তিনি নিয়ে যাচ্ছেন সুদূর কোনো কল্পলোকের মরুদ্যানে।কবি হিসাবে আকতার হোসাইন এভাবে সতত মুগ্ধকর।

পরের কবিতাটির শিরোনাম সমুদ্রভ্রমণ। অনন্ত কোলাহল মাঝেও শেষ পর্যন্ত মানুষ আসলেই যে চূড়ান্ত অর্থে নিঃসঙ্গ,বড় করুণরাগে সে সুর শুনি

সমুদ্রভ্রমণ শেষে, ঘরে ফিরে এলানো শরীরে

আবার দাঁড়াও তুমি রঙ করা দেয়ালের পাশে, অভ্যাসের বশে

—————————————————

শরীরসমুদ্র সাঁতরে শতাব্দীর সিকিভাগ শেষে

বালি বুকে, সে নিজেকে দেখে এক খোলভাঙা ঝিনুকের বেশে।

সমুদ্রসম সমগ্রের অংশ হয়েও অবশেষে ঝিনুকের বেশে একাকী মানব। দর্পনে দেখতে পায় নিজেকে ভাঙা ঝিনুকের বেশে। এমনই সরল এবং নির্লিপ্ত দর্শনে প্রতিটি কবিতা নিয়ে এগিয়ে যায় হাড়ের হরিণী।

স্বাদ কবিতায় কি অনুপম চিত্রকল্পে মৃত্যুর মতো কঠিন বাস্তবতাও বিস্ময় জাগানিয়া পেলব চিত্রধারণ করে

মৃত্যুর কথা যদি বলি

মৃত্যুর বন্ধন অবিকল তোমার আলিঙ্গন“

মরণ যদি এমন মধুময় হয়, তবে মৃত্যুও বড় তুচ্ছ। একজন কবিই কেবল পারেন এমন অনল মাঝে গোলাপ চারা বুনতে।সেরকম অজস্র উদাহরণ কাব্যভুক্ত কবিতার পরতে পরতে পেয়ে যাবেন তৃষ্ণার্থ পাঠক।

কবি আকতার হোসাইন’র পাঠকমাত্র জানেন ছন্দ নিয়ে খেলতে তিনি বড় ভালবাসেন। এবং তা নিরেট ব্যাকরণসিদ্ধ।চলতি কাবগ্রন্থেও তেমনি দহন,অবলীন মহাশূন্যে, খাড়াঙ্গ প্রমুখ কবিতায় বোদ্ধা পাঠক ছান্দসিক এ কবিকে পুনরায় আবিষ্কার করবেন।

সমসাময়িক প্রসঙ্গ যে কোনো সৃষ্টিশীল কবির রচনার খুব সাধারণ উপাদান। আমাদের আলোচ্য কবিও সে পথে হেঁটেছেন এবং সরাসরি। ফেসবুক নামীয় কবিতার দিকে একটু চোখ রাখি

ফেসবুকে না বসলে আজকাল নিজেকে আর দেখতে পাই নে।”

————-

ফেসবুকে বসলেই মনে হয় দাম্পত্যকলহ শব্দটা বানানো

—-

আমরা আসলেই প্রকৃত মানুষ!

তারপরই মোক্ষম কথাটি বলছেন,

ফেসবুক কি আত্মদর্শন

না কি নিখুঁত সাঁটানো মুখোশ।

প্রথমেই উল্লেখ করেছি, একেবারে আটপৌঢ়ে এবং সাদাসিধে ভাষ্যে এ গ্রন্থে কবি নিজেকে উন্মোচন করেন। আলোচিত কিছু কবিতার অংশবিশেষ পাঠে পাঠকও ইতিমধ্যে তা অনুমান করছেন। চলমান এ ধারা শান্ত ও সমহিত। শব্দ, বাক্যের অহেতুকী আস্ফালন ব্যতিরেকেই তরতর এগিয়ে যান কবি। পাঠক হিসেবে আমার তো মনে হয়, একজন কবির এ বড় মহার্ঘ অর্জন।

অন্তর্ভুক্ত চল্লিশটি কবিতা নিয়ে নির্মেদ এবং বহুমাত্রিক বিষয়ের কাব্যগ্রন্থটির আলোচনার একেবারে শেষে পৌঁছে শেষের কবিতাটি দিয়েই আমরাও ইতি টানতে চাই। বেহালাবাদক শিরোনামোক্ত কবিতাটিতে একজন শিল্পীর কাঁধে এক দুঃসহ শিল্পের ভার বহন করে চরাচরে ঐশ্বর্য ও আনন্দ ছড়িয়ে দিয়ে শববাহকের মতো সুরের কফিন সযত্নে নামিয়ে রেখে শূন্য চাতালের দিকে স্থির চেয়ে থাকতে দেখি। শিল্পী মাত্রই তাই। কবি আকতার হোসাইন ও সেই মহৎ শিল্পীদের একজন। তাঁকে আমাদের নতশির শ্রদ্ধা।

ঘাড়ের হরিণী: আকতার হোসাইন, একুশে বইমেলা ২০১৭তে শরীফা বুলবুল কর্তৃক বলাকা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত। প্রচ্ছদ:মোস্তাফিজ কারিগর। মূল্য: ১০০ টাকা।

x