‘হাসি খুশির জোনাক জ্বলে’ : শাব্দিক জোনাকের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি

এমরান চৌধুরী

শুক্রবার , ২৭ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ
29

কিশোর কবিতা কী এবং কার জন্য এ প্রসঙ্গে না গিয়ে পড়ে নিই এক বই প্রাণছোঁয়া কিশোর কবিতা। প্রাণছোঁয়া এ কারণেই যে এ বইয়ের একটা লাইন পড়লে আপনার মধ্যে অবশ্যই দ্বিতীয় লাইন পড়ার ইচ্ছা প্রবল হবে। যেমন আমরা কৈশোরে গ্রোগ্রাসে গেলার মতো পড়েছি পল্লী কবি অভিধাসিক্ত জসীম উদ্দীনের কবর কবিতাটি। এখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে/ত্রিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুনয়নের জলে। বাংলাসাহিত্যে এ কবিতাটি কিশোর কবিতার এক অনন্য উদাহরণ।এখানে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একজন কিশোর অত্যন্ত নিকট থেকে প্রত্যক্ষ করে তার দাদার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা হ্নদয়ভাঙার কথা।এ কবিতাটিতে শব্দের পরতে পরতে এক অশীতিপর বৃদ্ধের জীবনকাহিনী এমনভাবে উঠে এসেছে যা শুধু হ্নদয়গ্রাহী নয় হ্নদয়ে আজন্ম ধরে রাখার মতো। তেমনি আর একটি কবিতা কাজলা দিদি। বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ/মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?

দুটো কবিতারই প্রথম লাইন পড়ার পর দ্বিতীয় লাইন পড়ার ইচ্ছা হয়নি এমন নিরস পাঠক সাহিত্যভুবনে একজনও আছে বলে মনে হয় না।কিশোর কবিতা এমনই। যা অনায়াসে পাঠকের মনে নাড়া দেয়,হ্নদয় ছুঁয়ে যায়। বার বার পড়তে ইচ্ছা হয়।এ যেন মরুর জল তৃষ্ণা ।

আনোয়ারুল হক নূরীর প্রথম কিশোরকাব্য হাসি খুশির জোনাক জ্বলে নিয়ে এ প্রসঙ্গের অবতারণা। নূরী বেড়ে উঠেছেন আটষট্টি হাজার গ্রামের একটি গ্রামে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আধার বাঁশখালির কাহারঘোনা গ্রামে। গ্রামটির একপাশে বয়ে গেছে জল কদর খাল। বড় কাব্যিক নাম এ জল কদরের কল কল ধবনি আর কাহারঘোনার নিসর্গে বেড়ে উঠা কবির কবিতায় নিসর্গ যে প্রধান উপজীব্য হবে সেটা বোধয় বলার অপেক্ষা রাখে না। হয়েছেও তাই।কবি আনোয়ারুল হক নূরীর কবিতার পরতে পরতে পরম মমতায় রূপায়িত হয়েছে তাঁর গ্রাম আর জল কদরের রূপবন্দনা। তাঁর কিশোর কাব্যের সূচনা কবিতাতেই তা আমরা প্রত্যক্ষ করি তার প্রিয় গ্রাম আর নদীর প্রতি তাঁর অফুরান ভালোবাসা

বলতো নদী কোন সুদূরে এমন ছুটে চলা

কলকলিয়ে ছলাৎ ছলাৎ চলার শিল্পকলা

যাও গড়িয়ে যাও ছড়িয়ে তুলতুলে জলশাড়ি

চলছো কোথায় নিরবধি কোথায় তোমার বাড়ি?

জল না মাটি বলো নদী কেমন তোমার রূপ?

জলের জামায় মাটির কোলে শান্ত ও নিশ্চুপ

মাঠ পেরিয়ে ঘাট পেরিয়ে চলছো অবিরত

হন্যে হয়ে কার জন্য চলার এমন ব্রত?

তোমার বুকে আশার ফানুস নৌকা চলে ভেসে

জেলের জালে মাছের নাচন জীবন ওঠে হেসে

কাঁচের মতো শান্ত শীতল জলের তেপান্তরে

জলপায়রার উড়োজাহাজ নামছে থরেথরে

(নদী মাতার প্রীতি,পৃষ্ঠা০৫)

উপর্যুক্ত অংশটুকু পাঠমাত্রই পাঠককে অনায়াসে জানান দেয় কবির শক্তিমত্তা। কোথায়ও এতটুকু জড়তা নেই,কোথায়ও তিলমাত্র রাখঢাক নেই, সহজ সরল শব্দ চয়ন, নিবিড় বাক্য বুনন, অনুপ্রাসের দোলনায় দোল দিতে দিতে কবি একেঁ গেছেন একেকটা দৃশ্য। যাকে কবিতায় আমরা চিত্রকল্প বলি। কোন কোন চিত্রকল্প পাঠকের চোখে পাঠমাত্র খোলাসা হয় না। ভাবিত করে। কিন্তু কিশোর কবিতার চিত্রকল্পকে হতে হয় পাঠমাত্র খোলাসা। এ দিকটায় যিনি যতবেশি দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন তিনি ততবেশি সফল। এ দৃষ্টিকোণে নূরী অবশ্যই কুশলী। তিনি প্রথম গ্রন্থেই কিশোর কবিতার সমস্ত উপাচার সাজিয়েছেন সম্পূর্ণ নিজের মতো করে। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ।এ দেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য নদী। সব নদীর গন্তব্য ও লক্ষ্য অভিন্ন। নদী,জল আর মাটি নিয়ে আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ। গ্রামে বেড়ে উঠা কিশোরের প্রথম ভালোবাসা নদী। আর এ নদীকে নিয়ে তার নানা কৌতূহল থাকাই স্বাভাবিক। এ কবিতার কিশোরেরও প্রশ্ন নদীর কেন বিরাম নেই? নদী কোথায় যায়? নদীর বাড়ি কোথায়? এ কটি প্রশ্নের উত্তর আমরা অনায়াসে পেয়ে যাই নদী মাতার প্রীতিকবিতাটি পাঠে।

হাসিখুশির জোনাক জ্বলে গ্রন্থ গ্রন্থিত হয়েছে মোট ১৮টি কিশোর কবিতা। কবিতাগুলোকে যদি সংক্ষিপ্ত বিভাজন করা যায় তাহলে আমরা পেতে পারি তিন শ্রেণির কবিতা১। নিসর্গ তথা বাংলার প্রকৃতি বন্দনা ২।,কৈশোরিক নানা ভাবনা ৩।মুক্তিযুদ্ধ। আবার কোনো কবিতায় প্রকৃতি আর কিশোর এবং কোনো কবিতায় কিশোর আর মুক্তিযুদ্ধ একাকার হয়ে অভিন্ন সুরে উচ্চকিত হয়েছে।

প্রকৃতি আর কিশোরের নানা ভাবনা একীভূত করে এক অপরূপ প্রকাশ প্রত্যক্ষ করি নিচের কবিতাটিতে

চাই না আমি স্বপ্ন রঙিন সূর্যহাসির ভোর

মায়ের মুখের হাসির গোলাপ নিবিড় স্নেহ ডোর

চাই না আমি নীল নোয়ানো আকাশ নামের ছাতা

মেঘপাহাড়ে লুকিয়ে থাকা চাঁদবুড়িটার মাথা।(আনন্দে হই চই, পৃষ্ঠা ০৮)

কিংবা

কেমন আছো জোছনা সাদা জোনাক বাতির গ্রাম

মনে পড়ে পল্লী ছেলে, পল্লীকবির নাম?

কেমন আছো পল্লী কবির নকশিকাঁথার মাঠ,

হারিয়ে যাওয়া রাখাল ছেলের তেপান্তরের বাট?

(সবুজ পাতার শৈশব, পৃষ্ঠা১০)

পাঠক হয়তো বলতে পারেন খুব চেনা, বহুল ব্যবহ্নত শব্দ চয়ন আর বাক্য বুননেও নেই তেমন আহামরি।কিন্তু যা আছে তা আমাদের নিয়ে যাবে সুদূরে অতীতে। এক একটা শব্দ এক একটা চিত্রকল্প পাঠকের মনের আকাশকে বিস্তৃত করবে,হাতছানি দেবে ফিরে যেতে ফেলে আসা সেই শৈশবে।

এভাবে কবি আনোয়ারুল হক নূরী এক একটি কবিতার শরীর গড়ে তুলেছেন যাতে পাঠক কবিতার সকল সুবাসতো পাবেন, তার সাথে পাবেন দেশ ও প্রকৃতির নিখাদ চিত্র। যে চিত্রে ফুটে উঠেছে মাটির সোঁদা ঘ্রাণের কথা।যে ঘ্রাণে আছে স্বাধীনতা রক্ষায় কিশোরের ফের যুদ্ধে যাবার ইচ্ছা(আবার যুদ্ধে যাবো০৬),দারিদ্র্য জয়ের স্বপ্ন (খোকন হয়ে যাবো০৭),খোকার দুরন্তপনা (আনন্দে হই চই০৮০৯),শহুরে কিশোরের চোখে চিরায়ত বাংলার প্রিয় চরিত্র রাখালের হাতছানি (কিশোর রাখাল১১)ইত্যাদি।

সচেতন মানুষমাত্রই আজকাল পরিবেশ সুরক্ষায় উচ্চকিত। কবি কিংবা শিশুপ্রেমী কেউ এ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেন না। যেমন পারেননি শিশুসাহিত্যিক আনোয়ারুল হক নূরী। কবিতার বিভিন্ন রসায়ন বিবেচনায় পরিবেশ সুরক্ষার আকুতি নিয়ে রচিততোমরা কাছে এসো শিরোনামের কবিতাটি এ গ্রন্থের সেরা কবিতার দাবি রাখে। প্রকৃতির সব উপাদান আল্লাহর নেয়ামত। কিন্তু মানুষ সে নেয়ামতের যথাযথ পরিচর্যা না করার ফলে তা এক সময় বৈরী হয়ে ওঠে। বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ বিপর্যয়ের পেছনে মানুষের কোনো না কোনো কর্মকান্ডই দায়ি। মানুষ নিজেই যেন নিজের পায়ে কুড়াল মারে। এ আত্মঘাতি কাজের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন কবি এভাবে

তোমরা মানুষ যন্ত্র কত করলে আবিস্কার=

যন্ত্র দানব বানিয়ে আবার কর অহংকার।

চাওনি বলেই আমার আলোর ঠাণ্ডা হাতের ছোঁয়া

মারলে ছুঁড়ে আমার দিকে বিষাক্ত সব ধোঁয়া।

মায়ার দৃষ্টি পুড়িয়ে দিয়ে কুড়িয়ে নিলে শাপ

বিষের ছোঁয়া তোমরা দিলে কিসের অনুতাপ? (তোমরা কাছে এসো১২)

আনোয়ারুল হক নূরী কিশোরের কৈশোরিক ভাবনা,মান অভিমান,দুরন্তপনা,তাদের চাওয়া পাওয়ার অকৃত্রিম রূপকার। তাঁর কিশোর কবিতা তাই কথা বলে দুরন্ত ফটিক, সুবোধ মাখন, স্বপ্নবাজ রতন,অমলের ভাষায়, যা আটষট্টি হাজার গ্রামের অভিন্ন কিশোরের প্রতিচ্ছবি। এ প্রতিচ্ছবিকে নিজের চোখে দেখতে হলে,থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলা অন্তদৃষ্টিতে অনুভবের ইচ্ছে হলে হাসিখুশির জোনাক জ্বলে গ্রন্থটি পড়ে নিতে পারেন। আর পড়লেই আমাদের অন্তরে বাহিরে জ্বলে উঠবে সত্যিকারের হাসিখুশির জোনাক। পেশায় মানুষ গড়ার কারিগর,নেশায় আলোর ফেরিওয়ালা শিশুসাহিত্যিক আনোয়ারুল হক নূরীর এ গ্রন্থটি ছন্দের গতিময়তায়,নির্বাচিত শব্দচয়নে,বাক্যবিন্যাসের কুশলতায়,অন্ত্যমিলের নতুনত্বে,অনুপ্রাসের দ্যোতনায়, উপমার রোদ্দুরে পাঠককে নিশ্চিত হাতছানি দেবে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।

খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী উত্তম সেনের নান্দনিক প্রচ্ছদ ও নান্টু বিকাশের অঙ্গসজ্জায় ২৪ পৃষ্টার গ্রন্থটির প্রকাশ শৈলী প্রকাশন,চট্টগ্রাম।

আর গ্রন্থটির দাম রাখা হয়েছে মাত্র ১৫০ টাকা।আমরা কবি আনোয়ারুল হক নূরীর এ গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করছি।

x