হাসান হাফিজের কবিতা : মোমের আলোর মত স্নিগ্ধ

ফখরুজ্জামান চৌধুরী

শুক্রবার , ১১ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
42

বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে ইতোমধ্যে নিজেকে যদিও তিনি শক্ত পাটাতনের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। হাসান হাফিজের প্রথম এবং প্রধান পরিচয়, তিনি কবি। এবং প্রেমের কবি। প্রেমের কবি বললে এক হিসেবে তাকে বিশেষ ধারায় আবদ্ধ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রেম তো শুধু নারী আর পুরুষের মধ্যে কোমল সম্পর্ক সর্বস্বই নয়। প্রেমের পরিধি এখন বহুধাবিস্তৃত। একটা সময় ছিল, যখন কবিতাকে শুধুই মনে করা হতো ‘প্রশান্তির মাঝে খুঁজে পাওয়া আবেগ।’ উনিশ শতকের পুরোটা এবং বিশ শতকের প্রথম চার দশকে এই ধারণা প্রবল থাকলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে একান্ত জীবনে চিড় ধরে। এখন কবিতায় প্রশান্তির পাশাপাশি ক্ষোভ আর হতাশার চিত্রও কবির কলমে উঠে আসে।
বাংলাদেশের নিরিখে গত শতকের সত্তরের দশক হলো দ্রোহের শতক। একটি সফল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বদেশের চিত্র সত্তরের কবিরা প্রেম আর দ্রোহের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে কখনো নিজেকে দেখেছেন প্রেমিকের রূপে, আবার কখনো বিপ্লবী রূপে। কবিতার ভাষা হয়েছে অম্লমধুর।
সাহিত্যের নিরন্তর প্রবহমানতা সত্ত্বেও এর দশকওয়ারি বিভাজন কতোটা যৌক্তিক, এই প্রশ্ন উঠলেও কবি ও কবিতার আলোচনায় দশকের উল্লেখ স্বীকৃত প্রথা। সত্তর দশকের কবি ও কবিতার আলোচকদের উচ্চকিত হতে দেখি তার অনন্যতা সম্পর্কে। কারণ আমাদের জাতীয় জীবনে সত্তর দশক শুধু শ্রেষ্ঠ মাইল ফলকই নয়, উৎসে ফেরার কালও। আমাদের জাতীয় জীবনের অগ্নিস্নানের কাল।
হাসান হাফিজ উজ্জ্বল সত্তর দশকের অন্যতম কণ্ঠস্বর আমাদের কবিতা ভুবনে। অতিশয় সরল শোনালেও এই বক্তব্য ইতোমধ্যে গ্রহণযোগতা নিরিখে উত্তীর্ণ।
কাল হিসেবে যেমন সত্তর দশকের অনন্যতা, তেমনি শিল্প মাধ্যম হিসেবে রয়েছে কবিতার। হাসান হাফিজ যদিও বহুমুখী লেখক, তাঁকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে তাঁর কবিসত্তা। আমি তো বলি, তিনি যদি কবি না হন, তাহলে তার অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। এবং তিনি মূলত প্রেমের কবি। কিন্তু শুধু প্রেমেই নিমগ্ন থাকেনি তার কবিসত্তা। তিনি রাজনীতি, সমাজ, প্রকৃতি পরিবেশকেও কবিতার উপজীব্য করেছেন। হাসানের কবিতা পেলব কোমল কবিতা নয়। তার কবিতায় রয়েছে ক্ষোভ,সন্দেহ, দ্রোহ। ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো, ‘প্রশান্তিতে আহরিত আবেগ’ শুধু নয়, কখনো তা হয়েছে সন্দেহ অবিশ্বাস হতাশা আর ক্ষোভজাত আবেগের বহিঃপ্রকাশ।
হাসান তার পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে অচেতন থেকে গজদন্ত চূড়াবাসীর মতো ‘মধুরতম গীত’ গাননি, যদিও কখনো তা এসেছে দুঃখানুভূতি থেকে। কবিরা শুধু সত্যভাষণই করেন না, তারা ভবিষ্যৎদ্রষ্টাও। কখনো সেই ভবিষ্যৎ হয় অনাকাঙ্ক্ষিত। ২০১০ সালে যা প্রাদুর্ভাব আকারে সমাজে নারী নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সেই এসিড সন্ত্রাসে পোড়া নারীর কথা যখন দেখি তার ২০০৮ সালে প্রকাশিত ‘প্রেমের কবিতা সমগ্র’তে তখন চমকিত হতে হয়। ‘তোমাকে পুড়িয়ে দেয়/দুর্বৃত্তের কামনা, এ্যাসিড/তোমার সৌন্দর্য, ত্বকে লেপা হয় পঙ্কিলতা পাপ/ ছিন্নভিন্ন হও তুমি/পশুদের জান্তব নখরে/তোমাকে নিহত করে/ ঘাতকের শান দেয়া ছুরি/কঠিন জবাব দাও/প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় হও/ওদেরই আগুন দিয়ে/ওদের পোড়াও।
তার ‘নারী’ কবিতার শেষ দুই পংক্তি নারী নির্যাতন বিরোধী প্রচারণার স্লোগান হতে পারে। স্লোগান কবিতা নয় জেনেও হাসানের পঙ্‌ক্তি স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করতে বলেছি এর মর্মস্পর্শী আবেদনের জন্য।
হাসান হাফিজ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়কে তার কবিতায় যেমন সংহত রূপ দিয়েছেন, তেমনি তিনি পরবর্তী কালকেও তার কবিতায় ধারণ করেছেন। একটি বিশেষ সময়ে কিংবা একটি বিশেষ ধারায় তিনি নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। বহমান জীবন ধারার সঙ্গে হাসান নিরন্তর নিজেকে নবায়ন করে চলেছেন। তাই তো তাঁর কবিতায় বিভিন্ন সময়ে বাঁকবদল দেখি।
তার অবিশ্রাম সৃষ্টিশীলতাকে যে মূল্যহীন ভাবেননি লোকান্তরিত কবি ও তুখোড় কাব্যবোদ্ধা আবদুল মান্নান সৈয়দ, তা যে যথার্থ, হাসান হাফিজের কবিতার পরতে পরতে তার চিহ্ন দৃশ্যমান।
হাসান হাফিজ তার কবিতায় প্রেমকে আপন মহিমায় রূপায়ণ করেছেন, যেমন সত্য, তেমনি বাস্তবতা হলো নরনারীর সম্পর্কে দুর্জ্ঞেয় রহস্য উন্মোচনের বাইরেও অনেক দিকে তার মনোযোগ নিবদ্ধ হয়েছে। এক জায়গায় তিনি স্থবির হয়ে থাকেননি। গতিই জীবন। এবং গতিময় জীবনে সত্য সুন্দরের পথে আলোকাভিসারী হিসেবে প্রায়ই তার কবিতার পালাবদল ঘটেছে।
সমকালীন একজন আধুনিক মনস্ক মানুষ হিসেবে তিনি পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে উদাসীন থাকেন না। নদীর বিপন্নতায় কাতর হয়ে লেখেন ‘নদী যখন স্মৃতি’। ‘শুকিয়ে গিয়েছে সেই ভরা গাঙ, কোথা পাবো ঢেউ…’। নদীমাতৃক দেশে বর্তমানে নদীসমূহের চিত্র এর চেয়ে মূর্ত আর কি হতে পারে! মনে হয় এ যেন কবিতা তো নয়, দীর্ঘশ্বাসে দীর্ণ আর্তি।
হাসান হাফিজের মনোযোগের বাইরে থাকেনি স্বদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, পরিবেশ, নারীমুক্তি, বিদ্রোহ, বিপ্লব। এক কথায় জীবনের সর্বক্ষেত্রের প্রতি তিনি নিবিষ্ট।
মুক্তিযুদ্ধকালীন শত্রু কবলিত দেশের ছবি আঁকতে গিয়ে যখন হাসান লেখেন, ‘লক্ষ লক্ষ করোটি কঙ্কাল, চোখ বাঁধা হাত বাঁধা। / লাশ থেকে প্রত্যয় প্রেরণা। অধিকৃত দেশ মাটি/ ক্রন্দনে বিশ্বাসী নয়,’ তখন স্বদেশ ও স্বদেশবাসীর অপার শক্তির প্রতি আমাদের আস্থার নবায়ন ঘটে না কি?
হাসান হাফিজ কবি হিসেবে দীর্ঘ পথ পরিক্রমণ করেছেন। কবিতার সঙ্গে তার বসবাস সেই ছাত্রাবস্থায় শুরু। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এখন যৌবন যার’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮২ সালে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তাঁর রচনার পরিমাণ বিপুল। সমকালীন কবি-সহযাত্রীদের তুলনায় প্রচুর। গ্রন্থ সংখ্যা বেশি, বিষয়ের বৈচিত্র্যও তাই বহুমাত্রিক।
অনেকটা সময় কেটে গেছে। শারীরিকভাবে, মনের দিক থেকে অনেক পরিণত হয়েছেন কবি। তার কবিতা আরো সংহত হয়েছে। কবিতার বিষয়ে এসেছে বৈচিত্র্য, প্রকাশে বেড়েছে প্রত্যয়। কবির বিশ্বাস হয়েছে দৃঢ়তর। সবচেয়ে বড় কথা, কবি হিসেবে হাসান হাফিজ নিজের প্রতি নিজেই আস্থাশীল এবং কবিতা যে তাঁর অন্বিষ্ট, এই বিশ্বাস থেকে তিনি কবিতা লিখে চলেছেন এবং কবিতার অন্তর্নিহিত শক্তিকে বলীয়ান করেছেন কবিতাকে কোনো ভাবেই উচ্চকিত না করে।
মোমের আলোর মত স্নিগ্ধ তাঁর কবিতার ভুবন । আগামী ১৫ অক্টোবর ২০১৯ কবি হাসান হাফিজের ৬৪তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে জানাই শুভেচ্ছা।

x