হালদার চরে সমবায়ীদের মৎস্য বিপ্লব

মীর আসলাম : রাউজান

সোমবার , ২৯ জুলাই, ২০১৯ at ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ
81

হালদায় জেগে উঠা পরিত্যাক্ত চরে এখন ফলানো হচ্ছে রূপালী সম্পদ। চরের জায়গা থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে সমবায়ী পদ্ধতিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এখানে করা হচ্ছে মাছ চাষ, সৃষ্টি করা হচ্ছে ফলের বাগান। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সুফল ভোগী সমবায়ীদের অর্থ সহায়তা দিয়েছে ৩২ লাখ টাকা ।
রূপালী সম্পদের খনি খ্যাত হালদা নদী রাউজান ও হাটহাজারীর বুক ছিড়ে বয়ে গেছে। এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকৃতি মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। প্রতিবছর এই নদীতে মা মাছ ডিম দেয়। এই ডিম মৎস্যজীবিরা আহরণ করে পোনায় রূপান্তরের পর এগুলো বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই হালদার পোনার বিশেষ কদর রয়েছে সারা দেশে।
দেশের অন্যান্য নদীর মত এই নদীতেও রয়েছে ভাঙ্গাগড়ার খেলা। আধিকাল থেকে এই নদীর উপরও চলে আসছে মানুষের নির্যাতন, নিপীড়ন। ভাঙ্গন থেকে রক্ষার চেষ্টায় যুগে যুগে মানুষ নদীর গতি পরিবর্তন করেছে। একাধিকস্থানে কেটেছে হালদার বাঁক। ফলে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতি হারিয়ে নদীর ভাঙ্গন চলছে এপার ওপারে। ভাঙ্গাগড়ার এই খেলায় উভয় পাড়ের মানুষ প্রতিবছর বাপদাদার ভিটামাটি হারিয়ে যাযাবর হয়েছে। নদীর ভাঙ্গাগড়ার খেলায় একদিকে ভেঙ্গে বিপরীতে জেগে উঠছে নতুন নতুন চর। জেগে উঠা চরের দখলদারিত্ব নিচ্ছে এলাকার প্রভাবশালীরা। অভিযোগ রয়েছে যেসব পরিবার নদীর গর্ভে ভিটেমাটি হারিয়ে যাযাবর হয়েছে, তাদের যেতে দেয়া হয় না জেগে উঠা নতুন চরে চাষাবাদে। জেগে উঠা এরকম কোনো কোনো চর আগাছায় ভরপুর হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলেও এ গুলোতে কতিপয় প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্ব বজায় আছে।
সরকারি রেকর্ড পত্রে নদীর জেগে উঠা চর থাকে খাস খতিয়ানভুক্ত। মালিকানায় থাকে সরকার। সচেতন মহলের মতে এসব চরের জায়গা পরিকল্পিত ভাবে চাষাবাদের আওতায় আনা হলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়। চাষাবাদের জন্য স্থানীয় জনসাধারণকে সহজ শর্তে ইজারা দিলে আসে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।
এবার মৎস্য সেবা সপ্তাহের সমাপনী দিবসে মৎস্যচাষের উদ্যোক্তা হিসাবে রাউজান উপজেলায় পদক গ্রহণকারী বিনাজুরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুকুমার বড়ুয়া বলেছেন, কয়েক যুগ আগে তার ইউনিয়নের পশ্চিম বিনাজুরী গ্রামটি হালদার গর্ভে তলিয়ে গিয়েছিল এখানে একটি বাঁক কেটে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়ার কারণে। নদীর গতি পরিবর্তনের প্রভাবে চর জাগে হাটহাজারী অংশের গড়দুয়ারা গ্রামের দিকে। দ্বীপ আকারে সৃষ্ট চরটি নদীর পুরানো ও নতুন গতিপথের মধ্যখানে। তিনি জানান, এই চর জবরদখল করে আছে হাটহাজারী এলাকার কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। অন্তত এক’শ একর জায়গা জুড়ে থাকা এই চরের জায়গার দাবিদার রাউজানের ভিটেমাটি হারা মানুষ হলেও অবৈধ দখলদারদের কারণে দীর্ঘকাল রাউজানের মানুষ সেখানে চাষাবাদে যেতে পারেনি। সর্বশেষ রাউজানের সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে প্রশাসনিক সহযোগিতায় চরের কিছু উদ্ধার করেছেন। অবশিষ্ট জায়গাও রাউজানের আওতায় আনার চেষ্টা করছেন। তিনি এখন সেখানে পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ ও বিভিন্ন ধরণের ফলের চাষে এলাকাবাসীকে উদ্বুদ্ধ করছেন। ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন মৎস্য সম্প্রসারণ বিভাগের প্রকল্প পরিচালক। সরকারি এই প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৩২ লাখ টাকা অর্থ সহায়তা দিয়েছে। এখানে ১৫ একর জমির উপর ছয়টি বড় পুকুর খনন করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে ২০ কেজি মাছের পোনা। প্রকল্প এলাকায় লাগানো হয়েছে তিনটি স্যোলার লাইট। পুকুর পাড়ে রোপণ করা হয়েছে দেশি বিদেশি ফলের চারা। জানা যায় এই প্রকল্পের ১৭ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। যারা সকলেই নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের মধ্যে একজন আধা সামরিক বাহিনী অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রঞ্জিত বড়ুয়া। তিনি জানান পশ্চিম বিনাজুরীর মানুষ এই প্রকল্পটি একটি কৃষি বিপ্লব হিসাবে গ্রহণ করেছে। তার আশা এই প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক বসুমিত্র বড়ুয়া বলেছেন অবৈধদখলদারিত্বে থাকা চরের বাকি অংশটুকু উদ্ধার করে প্রকল্পের আওতাভূক্ত করার কাজ চলছে। পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকা এই জায়গা উৎপাদনমুখি করতে রাউজানের সাংসদ ফজলে করিম চৌধুরী কাজ করছেন।

x