হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ ঝাড়

লিটন কুমার চৌধুরী : সীতাকুণ্ড

সোমবার , ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
60

‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,মাগো আমার শ্লোক বলা কাজলা দিদি কই’ এক সময়ের অপরিহার্য উপকরণ বাঁশ নিয়ে কবি যতীন্দ্র মোহন বাগচির লেখা ‘কাজলা দিদি’ কবিতায় প্রমাণ মেলে এর ব্যবহার ও জনপ্রিয়তার। বাঁশ আমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে একটি অপরিহার্য উপকরণ। বাঁশ নামক এই উদ্ভিদটি আমাদের ইতিহাস,ঐতিহ্য আর জীবন মরণের সাথে সম্পর্কিত। প্রবীণদের মতে বাঁশ ঝাড় ছাড়া গ্রাম কল্পনা করা যায় না। প্রতিটি বাড়ির সামনে পিছনে বাঁশ ঝাড়ে সন্ধ্যাকালীন কাক পক্ষির কুঞ্জনে প্রকাশ পায় স্বর্গীয় অনুভূতি। বাঁশের কারুকার্য্যে তৈরি করা দৃষ্টিনন্দন গ্রামীণ বাড়িঘর বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। এই বাঁশ মানুষের সাথে সম্পর্কিত জীবন মরণের। এছাড়াও প্রবীণদের মতে আদিকালে জন্মকালীন সময় ধাত্রিরা শিশুর নাড় কাটতো বাঁশের পাতলা ধারালো ছিটা দিয়ে। মৃত ব্যক্তিকে সৎকার ও কবর দেয়ার সময় এখনো ব্যবহার করা হয়ে থাকে বাঁশ। মানব সভ্যতার সাথে সম্পর্কিত এই উদ্ভিদটি এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে।
জানা গেছে, আধুনিক সভ্যতার বিবর্তনে গ্রামে এখন বাঁশ ঝাড় নেই। বাঁশের তৈরি বাড়ি ঘর তেমন দেখা যায় না। পাহাড় জঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট যেসব বাঁশ এখন টিকে আছে এখন সেগুলো কেটে ফেলার মহোৎসব চলছে। নতুন করে কোথাও সৃষ্টি হচ্ছে না বাঁশ বাগান। অনেকেই মনে করছেন বাঁশ ঝাড় যেভাবে উজাড় হয়ে যাচ্ছে তা থেকে ধারণা করা যাচ্ছে যুগে যুগে অবজ্ঞা অবহেলার শিকার এই উপকারী উদ্ভিদটি আগামী প্রজন্মের কাছে শুধু টিকে থাকবে গান কবিতা আর বিভিন্ন উপমার উদাহরণ হিসাবে। অথচ আজ থেকে কয়েক যুগ আগেও দেশের প্রায় সব গ্রামগুলোতে বাঁশের ঝাড় দেখা যেত। এখনও আছে,তবে আগের চেয়ে অনেক কম। বৈচিত্র্যময় অনেক বাঁশের প্রজাতি বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে। পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন’শ বাঁশের প্রজাতি থাকলেও বাংলাদেশে প্রায় ৩৩ প্রজাতির বাঁশ দেখা যায়। উল্লেখযোগ্য বাঁশের মধ্যে রয়েছে-মুলিবাঁশ, তল্লা বাঁশ, ওরা বাঁশ, বরাক বাঁশ, ফারুয়া বাঁশ, কালো বাঁশ, ভুদুম বাঁশ ইত্যাদি।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সীতাকুণ্ড কমান্ড আলীম উল্যাহ বলেন, প্রাচীনকাল থেকেই দৈনন্দিন জীবনে অনেক প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বাঁশ থেকেই তৈরি হয়ে আসছে। কম খরচে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করা যায় বলে বাঁশকে বলা হত গরিবের কাঠ। বর্তমানে বাঁশ থেকে তৈরি হচ্ছে নজরকাড়া দ্রব্যসামগ্রী। এসব দ্রব্যসামগ্রী ঘরের শোভা বৃদ্ধি করছে। এছাড়া পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের এখনও খাদ্যের বড় একটা অংশ পায় বাঁশ থেকে। তাই বাঁশঝাড়ের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অধিক বাঁশ ও কোরল আহরণ, জ্বালানির চাহিদা পূরণসহ বাঁশের বহুমাত্রিক ব্যবহারের কারণে বাঁশঝাড়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এতে প্রতিবেশ ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি বাঁশের প্রজাতি বৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, গ্রামীণ জনপদের এক সময়ের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে থাকা বাঁশ নামক উদ্ভিদটি উন্নত গবেষণার মাধ্যমে সংরক্ষণ আজ সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

x