হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী ছড়া-ঝর্ণা

বিজয় ধর : রাঙামাটি

সোমবার , ১০ জুন, ২০১৯ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ
52


হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী ছড়া ঝর্ণাগুলো । ছড়াকে কেন্দ্র করেই এক সময় গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট আদিবাসী পাড়াগুলো। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের পাড়াগুলোর নামও ঝিড়ি,ঝর্ণা কিংবা ছড়াকেন্দ্রিক যেমন- চোংড়াছড়ি, বড়ইছড়ি, কুতুকছড়ি, ঘিলাছড়ি, বগাছড়ি ও ঠাকুছড়া ইত্যাদি। একটা সময় ছিলো,যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জীবন আর পাহাড় জুড়ে থাকা শত শত পাহাড়ি ছোট-বড় ঝর্ণা,ছড়া,ঝিড়িগুলো ছিলো একে অপরের সাথে পরিপূরক। এখন সময় বদলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি,অব্যাহত বৃক্ষ নিধনের প্রভাবে ক্রমশঃ শুকোতে শুকোতে বিলীন পাহাড়ের অজস্র ছড়া ঝর্ণা ঝিড়ি। প্রকৃতির বদলের যাওয়ার প্রভাব তাই অনেক বেশি দৃশ্যমান পাহাড়ের আদিবাসী জীবন জীবিকায়।
পাহাড়ে ছড়া ঝর্ণা কমে যাওয়ায় আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাসও বদলে গেছে বলে মন্তব্য করছেন আদিবাসী বিষয়ক গবেষক শাওন ফরিদ। তিনি বলেন- পার্বত্য চট্টগ্রাম চরম জল সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগামী দিনগুলো হবে জলের জন্য যুদ্ধ। শুকিয়েন গেছে ছড়া ঝিরি ঝর্ণা।
আগে শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ের নীচু স্থানে কয়েক হাত বালি মিশ্রিত মাটি খুঁড়লে পরিস্কার ঠাণ্ডা পানি পাওয়া যেতো। সেসব কুয়া খাবার পানির যোগান দিত। এখন আরো গভীর করে কুয়া খুঁড়লেও পানি পাওয়া যায় না,পানি উঠে না।
তিনি বলেন,যতক্ষণ বৃষ্টি পড়ে ততোক্ষণ ঝর্ণা ছড়া প্রাণবন্ত সচল। বৃষ্টি নাই সব কিছুই অচল শুকনা। আগে পা না ভিজিয়ে ছড়ায় ছড়ানো ছিটানো প্রাকৃতিক ছোট বড় পাথরের উপর দিয়ে অনেক দূর হেঁটে যাওয়া যেত। ঝর্ণার বড় বড় পাথরের উপর বসে চড়ুইভাতির রান্নাবান্না, লাফালাফি-দাপাদাপি, সহপাঠীরা একে অপরের গা ঘেঁষে দেওয়া তারপর ঠাণ্ডা জলে অবগাহন বা স্নান। এখন সবকিছু যেন মিছে দুঃস্বপ্ন অতীত। এর জন্য দায়ী কে? আর কে, আমরা লোভী মানুষ!
ছড়া ঝর্ণা গিরি ঝিরির ছোট বড় পাথর ডাকাতি হয়ে গেছে। মৌজা রিজার্ভও এক প্রকার নাই বলা যায়। প্রাকৃতিক বন,সংরক্ষিত বন, জলা বন অবশিষ্ট আছে নামমাত্র।
ছড়া ও খালের দুপারের জারুল হিজল নাম জানা আরো কতো প্রাকৃতিক গাছ এখন চোখে পড়ে না। গাছগুলো বছরের অর্ধেক সময় জলে থাকতো ডুবে।চাপালিশ,কনক,কড়ই, ধারমারা, গোদা,সুরুজ,নাগেশ্বর,বহেড়া,ভাদী, হিজল তমাল বড় বড় মাদার ট্রিগুলোকে অনানুষ্ঠানিকভাবে হত্যা করা হয়। পরিবেশ বান্ধব বৃক্ষের পরিবর্তে রোপণ করা হচ্ছে উৎসাহিত করা হচ্ছে অধিক জল শোষক বৃক্ষ। সব ধরনের ইকো সিস্টেম ভেঙে পরছে। আইন আছে কাগজে, প্রয়োগ নেই, বাস্তবায়ন নেই।
শাওন ফরিদ বলেন, এখনো একেবারে সব শেষ হয়ে যায়নি। সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করলে এখনো প্রকৃতিকে বাঁচানো সম্ভব হবে। স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে। আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তবেই প্রকৃতি রক্ষা পাবে। পাহাড়ের ক্ষত বিক্ষত শরীর ধীরে ধীরে সেরে উঠবে। প্রকৃতি বাঁচলে বাঁচবে মানুষ বাঁচবে প্রাণিকুল।
রাঙামাটি শহর থেকে মাত্র সাত-আট কিলোমিটার দূরের গ্রাম মগবান। এই গ্রামেরই জুমচাষী জ্যাকব চাকমা। তিনি বললেন-জুমের ধান,নানান সবজী আর ঝিড়ি থেকে ধরা নানান ছোট মাছ,কাকড়া,কচ্ছপ’ই ছিলো আমাদের সবচে প্রিয় খাবার। আর ছড়া,ঝর্ণার পানি’ই আমাদের খাবারের পানির একমাত্র উৎস ছিলো। এখন আর আগের মতো ছড়া,ঝর্ণা,ঝিড়ি নেই। এই কারণে কেবল আমরাই না ,বনের পশু পাখীও পানির অভাবে কষ্ট পাচ্ছে। কেবল খাদ্যাভ্যাসই নয়,ঝিরি দিয়ে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পণ্যও পরিবহন করে আদিবাসীরা।
শুধুমাত্র পাড়ার নাম নয় ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলার নাম ও ছড়াকেন্দ্রিক যেমন- মহালছড়ি, মাইচছড়ি, খাগড়াছড়ি, মানিকছড়ি, সিন্দুকছড়ি ইত্যাদি। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ ছড়া, ঝর্ণা ও নদী মৃতপ্রায়। রাঙামাটি হতে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে ঘাগড়া আর্মি ক্যাম্পের সামনে ছড়াটি, কাপ্তাই যাওয়ার পথে তংচঞ্চ্যা পাড়ার সামনে দেবতাছড়া, সাপছড়ি ছড়া, বান্দরবান থেকে রুমা যাওয়ার পথে প্রায় ২৯টি ছোট বড় ছড়া ও ঝর্ণা, রুমা উপজেলায় লুংঝিড়ি, খাগড়াছড়ি জেলায় ঠাকুর ছড়া আলুটিলা সহ এমন অনেক ছড়া পাওয়া যাবে যা বর্তমানে মৃত। আবার রাঙামাটি থেকে মহালছড়ি যাওয়ার পথে বগাছড়ি, কুতুকছড়ি, মানিকছড়ি, মহালছড়ি উপজেলায় চোংড়াছড়ি, সিন্দুকছড়ি, মাইচছড়ি ও মুবাছড়ি ছড়া, রুমা উপজেলায় রুমা খাল, রোয়াংছড়ি উপজেলার দুলুঝিড়ি, মানিকছড়ি উপজেলায় মানিকছড়ি ছড়া, এবং রামগড় উপজেলায় সোনাইছড়ি ছড়াটিও শুকিয়ে যাচ্ছে। খাগড়াছড়ি জেলায় চেংগী নদী, মাইনী নদী, বান্দরবান জেলায় মাতামুহুরী, সাংগু নদী ও সুয়ালক নদীতে আশঙ্কাজনকভাবে পানির প্রবাহ কমে গেছে ।

কেবলমাত্র ছোট ছোট ছড়া ঝর্ণাই নয়,ক্রমশঃ শুকিয়ে আসছে পার্বত্যাঞ্চলের বিখ্যাত সুভলং ঝর্ণা,আলুটিলা ঝর্ণা,মানিকছড়ি ঝর্ণা,রিজুক ঝর্ণাও। একসময় সুভলং যাওয়ার পথে যে অজস্র ছোট বড় ঝর্ণা দেখা যেতো তা এখন কেবলই স্মৃতি। এবিষয়ে আদিবাসী গবেষক ঞ্যোহলা মং বলেন- এইসব ছড়া,ঝিড়ি, ঝর্ণা হারিয়ে গেলে তার সাথে সাথে আমাদের আদিবাসী জীবনের অনেক গল্প, লোককাহিনী সব হারিয়ে যাবে। ডুলুঝিড়ি ঝর্ণাকে কেন্দ্র করে অনেক কাহিনী রয়েছে। আলুটিলার সুড়ঙ্গ, মহালছড়ির ধুমনিঘাড়া, পংখীমুড়া, মাতাইপুখরী, বগালেক সবই আমাদের অজস্র গল্প, কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু। গুহা, পুকুর, ছড়া ও ঝর্ণা সব না থাকলে মা তার শিশুকে কি দেখিয়ে গল্প শুনাবে । তিনি বলেন এইসব ছড়া ঝর্ণা বাঁচাতে হলে বনায়নের নামে একক প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ রোধ, পার্বত্য ভূমির জন্য ক্ষতিকর এমন বৃক্ষ রোপণ থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যে ক্ষতিকর বৃক্ষসমূহের তালিকা প্রণয়ন ও জনসাধারনকে জানানো, ছড়া ও ঝর্ণা সমূহের সংরক্ষণের লক্ষ্যে স্থানীয় আদিবাসীদের উপর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণ, অবাধে কাঠ, বাঁশসহ সকল প্রাকৃতিক সম্পদের পাঁচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ, পাঠ্য পুস্তকে অন্তর্ভূক্তি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ছড়া- ঝর্ণা সংরক্ষণ নিয়ে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় এনজিও কর্তৃক প্রকল্প গ্রহণ এবং এই বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা ও প্রকাশনার উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। তিনি বলেন, ছড়া ঝর্ণাগুলোকে বাঁচাতে হলে যারা স্থানীয় বসতি রয়েছে তাদেরও মনোযোগ দিতে হবে।তিনি বলেন,বান্দরবানে এখনও কিছু ঝিরি ঝর্ণা আছে । ঝর্ণা বাঁচাতে হলে বনকে বাঁচাতে হবে। এখানে ভিসিএফ (ভিলেজ কমন ফরেষ্ট) এগুলোকে প্রমোট করতে হবে। এগুলোকে যদি বাঁচিয়ে রাখা যায় তাহলে ভবিষ্যতে খাবার পানির বড় একটা উৎস হতে পারে এইসব ঝিড়ি ঝর্ণা থেকে। তিনি আরো বলেন, ছড়া ঝর্ণা ঠিক থাকলে আমরা ঐখান থেকে প্রচুর খাবার পাব। এসব ঝিড়ি থেকে এখনও কাঁকড়া, নানা প্রজাতির ছোট ছোট মাছও পাওয়া যায় যেগুলো লেকে পাওয়া যায় না। আবার এইসব ছড়া ঝর্ণা যদি না থাকে তাহলে পশু-পাখিরা পানি খাবে কোত্থেকে।
এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম এর উন্নয়ন কর্মী অম্লান চাকমা বলেন- ‘জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি বন উজাড়,জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, তামাক চাষ, রাবার,সেগুন বাগান বেড়ে যাওয়ার কারণে পাহাড়ের পানির প্রাকৃতিক উৎস সমূহ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই পাহাড়ের ছড়া ঝর্ণাগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর থেকে মুক্তির পথ এখনো খোলা আছে। তবে এখনই এর জন্য সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে এমন অনেক দুর্গম জায়গা এখনো আছে, যেখানে ন্যূনতম সরকারি সুযোগ সুবিধাই পৌঁছায়না। নিরাপদ খাবার পানি বা খাদ্য সাহায্যের কল্পনা তো দূর অন্ত। তাই পাহাড়ের প্রান্তিক মানুষের জীবন এবং জীবিকার নিরবচ্ছিন্নতার স্বার্থেই এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরসবুজ বন ও জীববৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই এইসব ছড়া-ঝিড়ি-ঝর্ণা বাঁচিয়ে রাখা জরুরি বলে মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম এর সচেতন মহল।

x