হামজা মাস্টার : পাহাড়ে শিক্ষার ফেরিওয়ালা

মাঈনুদ্দিন খালেদ, নাইক্ষ্যংছড়ি

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
33

সুজামে তঞ্চঙ্গা, আহরণ চাকমা ও নীলাচল তঞ্চঙ্গা প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থী। বয়স ৪ বছর তাদের। গাড়ি, বিদ্যুৎ ও খেলার মাঠ তারা দেখেনি কখনও। শ্রেণি পাঠে তাদেরকে পড়িয়েছেন হামজা স্যার। তারা দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম জানেন। জেলার মন্ত্রীর নামও জানেন তারা। একই প্রতিষ্ঠানের পঞ্চম শ্রেণির লাউচিং চাকমা, লাইয়েচিং চাকমা সহ অপর একদল শিক্ষার্থীও অনুরূপ মন্তব্য করে বলেন, তারা পাহাড়ের পাদদেশে থাকেন। তাদের এলাকায় স্কুল বলতে এটাই। কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে আর কোন স্কুল নেই তাদের। তাদের প্রধান শিক্ষক ছৈয়দ হামজা স্যার এ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি তাদের কাছে অনেক প্রিয়।
স্থানীয় পাড়া কারবারী উপেন্দ্র লাল বলেন, উপজেলা সদর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের এ স্কুলটি অনেকটা অভিভাবকহীন। পার্বত্য নাইক্ষ্যংছড়ি আর উপজেলার অতিদুর্গম গ্রাম হলো তার জন্মস্থান ঘুমধুম ইউনিয়নের এ রেজু গর্জনবুনিয়া। এক সময় এখানে গর্জন গাছের বন থাকলেও এখন আর গর্জন গাছ নেই।
এ ছাড়া আশপাশের আরো ৪ গ্রামের অবস্থাও একই। অতি নাজুক। ছিলো না মসজিদ-মন্দির বা স্কুল। সেই নেই আর নেই এর মধ্যে ১৯৯২ সালে রেজু গর্জনবুনিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন পাশ্ববর্তী গ্রামের উদ্যোমী ও পরোপকারী শিক্ষিত যুবক মুহাম্মদ ছৈয়দ হামজা। আজ ২৭ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী এ স্কুল থেকে মাধ্যমিক বা উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করছেন। তখন সরকারি না হলেও এখন সরকারি নথি-পত্রে সরকারি। এছাড়া তার প্রচেষ্টায় স্কুলটি সরকারি হয়েছে অনেক আগে। কিন্তু হামজা মাস্টার সহ কেউ-ই এখনও বেতন পান না। তিনি আরো জানান, হামজা মাস্টারকে এলাকার সবাই শিক্ষার ফেরিওয়ালা বলে ডাকেন।
এই স্কুলের সহকারী শিক্ষক উক্কসাই চাকমা ও পারভিন আক্তার এ প্রতিবেদককে জানান, অত্র স্কুলে বর্তমানে শিক্ষার্থী আছে প্রায় দেড়শত। প্রতি বছর এ স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়ে আসছে অদ্যাবধি। প্রতিটি পিইসি/পিএসসি পরীক্ষার ফলাফল শতভাগ পাশ। তারা বলেন, ছৈয়দ হামজা স্যার মানবতার ফেরিওয়ালা। তিনি এ স্কুলের জন্য সব করেছেন। তার পরিবার আজ অসহায়। পৈত্রিক ৪ কানি সম্পত্তি তিনি এ স্কুলের জন্যে বিক্রি করে দিয়েছেন। এলাকার অন্ধকার দূর করতে সারাটা দিন ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ান এবং সব কিছু দেখভাল করেন। আর পকেট খরচ চালাতে তার হাতে থাকা ব্যাগে নিত্য প্রয়োজননীয় কিছু ওষুধপত্র রাখেন। তারা আরো বলেন, তাদের স্যারের প্রচেষ্টায় এ স্কুল ২০১০ সালে রেজিষ্ট্রার্ড হয়। ২০১৩ সালে এ স্কুল জাতীয়করণ হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালে জাতীয়করণ হয় স্কুলটি। কিন্তু বেতন পান না শিক্ষকরা। বড় বড় অফিসার আসেন-খুশি হয়ে ফিরে যান। কিন্ত ফলাফল শূণ্য। স্কুলটা সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। শুধু ফিরে দেখা। সব আছে-সব নেই। আধুনিকতার সাথে এই ৫ গ্রামের ১০ হাজার মানুষ অপরিচিত।
স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নীলাচল চাকমা বলেন, সেই ২৭ বছরের পুরোনো কথা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১০ জন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে করা স্কুল আজ পরিপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হামজা মাস্টার না- তিনি যেন তাদের অভিভাবক। তার সাথে তারা এ স্কুলের জন্যে অনেক খেটেছেন। সরকারের কোন সুবিধা এ স্কুল পাচ্ছে না কেন তাদের প্রশ্ন। তিনি আরো বলেন, আজ এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা দারুন অসহায়। তারা পড়া-লেখা করতে এসে সরকারের কোন সুবিধাই পাচ্ছেনা। এ স্কুলে নেই কোন পানীয় জলের ব্যবস্থা। শিশু শিক্ষার্থীরা পানির জন্যে এ বাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়ান প্রতিদিন। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও অনুরূপ। সারাদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থী কী অবস্থায় চলেন-ভাবলে অবাক হতে হয়। তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে এ নাজুক অবস্থা মানায় না। তারা এবার জেলা-উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলার মন্ত্রী-এমপিদের কাছে যাবেন, কাজ না হলে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও যেতে পিছ পা হবেন না তারা।
স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ ছৈয়দ হামজা এ প্রতিবেদককে বলেন, জীবনে শখ শিক্ষার আলো জ্বালানোর। স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে তার সন্তানদের অভাব পূরণ করতে সরকারকে বাকী কাজ করতেই হবে। তিনি আরো বলেন, শিক্ষা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এ অধিকারের জন্যে তিনি কাজ করছেন সরকারের নির্দেশে। কেননা তিনিও এ দেশের নাগরিক। কিন্তু সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হলে মাঠের এ সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পেটে আহার দিতে হবে। দিতে হবে সুযোগ সুবিধা। তিনি সব হারালেও মানবতা তার সাথে রয়েছে। এটিই তার সম্বল। সহায় সম্পদ তার কাছে অতীত।

x