হাইকোর্টকে হাইকোর্ট দেখানো

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৮ মে, ২০১৯ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
24

‘বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানো’ প্রবাদ বাক্যটির সাখে সব বাঙালির পরিচয় বহু বছরের। কেউ অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বা অন্যায় কাজ করে নিজের পাতে বড় হিস্যা টানার প্যাঁচ কষলে তাকে লাগাম পরাতে এটা ব্যবহৃত হয়। বাক্যটির ফলাফলও মন্দ না। ত্যাঁদড় সামলানোর মোটামুটি কার্যকর দাওয়াই। তো মাননীয় হাইকোর্ট যখন বলেন ‘হাইকোর্টকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন’! তখন এটা অন্য আঙ্গিকের মাত্রা ও গুরুত্ব পেতে বাধ্য। মানহীন ৫২ খাদ্যপণ্য বাজার থেকে তুলে নেয়ার বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্টের রায়কে নানা অজুহাতে বারবার অবহেলা করায় ২৩ মে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে এই মন্তব্য করেন। আদালত মামলার শুনানিতে মানহীন পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার বা তুলে নিতে সংস্থাটির কার্যক্রমকে আইওয়াশ বলেও মন্তব্য করে এর চেয়ারম্যানকে সশরীরে ১৬ জুন হাইকোর্টে তলব করেছেন।
আদালত এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ মে বিএসটিআই পরীক্ষায় মানহীন বিবেচিত ৫২ টি পণ্য বাজার থেকে তুলে নিয়ে জব্দ করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেন। নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে ওই কর্তা ব্যক্তিদের আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশও দেয়া হয়। ২৩ মে প্রতিবেদন জমার তারিখ ছিল। শুনানিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবীর কিছু বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে মাননীয় আদালত বলেন, আপনাকে পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর আপনি অন্যকে নির্দেশ দিয়েছেন। আইনজীবির কৈফিয়তের জবাবে আদালত বলেন,আপনারা একটি মসলার প্যাকেটও জব্দ করতে পারেননি। ইস্কাটনে আপনাদের অফিস। এর আশপাশে কোন দোকান থেকে ১৭ জন ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশ নিয়ে একটি পণ্যও জব্দ করতে পারলেন না। আপনাদের অফিস রাখার দরকার কী? হাইকোর্ট আদেশ দেয়ার পরও ভয় পাচ্ছেন? বড় বড় ব্যাবসায়ীদের ভয় পেলে চাকরি করার দরকার কী? ঘরে গিয়ে রান্নাবান্নার কাজ শুরু করুন, নতুন চেয়ারম্যানকে ব্যাঙ্কের কেরাণীর চাকরি নেয়ার উপদেশ দিয়ে এক পর্যায়ে আদালত বলেন, হাইকোর্টকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন? নানা অজুহাত দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন? অন্যদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে আদালত বলেন, “আমরা আশা করবো বছরজুড়ে প্রতিষ্ঠানটি এমন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে”।
হাইকোর্টের আদেশ থেকে স্পষ্ট, ভোক্তাদের নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করতে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তারা দায়িত্ব পালনে মোটেই কার্যকর নয়। এর মধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অবশ্য কিছুটা ব্যাতিক্রম। পবিত্র রমজান মাসে রোজাদারদের মানসম্মত বিশুদ্ধ খাবার সরবরাহ করা শুধু সরকারি নয়, প্রতিটি উৎপাদক ও সরবরাহকারী, প্রতিষ্ঠানের ঈমানি দায়িত্বও বটে। পবিত্র ইসলাম ধর্মে কঠোরভাবে এই নির্দেশনা পালনে বারবার তাগিদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায় উল্টোচিত্র। রমজান মাসে কৃচ্ছতার বদলে ভোগ চাহিদা যেমন দ্বিগুণ বেড়ে যায়, তেমনি বাড়তি চাহিদাকে টার্গেট করে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ও ভেজাল খাদ্য সরবরাহের প্রতিযোগিতা জোরদার হয়। ফুটপাতের টং দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত শপিং মল, রেস্তোরাঁ, কর্পোরেট ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সবাই এই প্রতিযোগিতায় নামে। যে ৫২টি পণ্য বাজার থেকে তুলে নেয়ার আদেশ হয়েছে, এগুলোর বেশিরভাগই নামীদামি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের। আবার ৯৭টি পণ্যের মান পরীক্ষা করে ৯৩ কী ৯৪ টি মানহীন বলে চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে কাঁচা বাজার, মাছ-মাংস, ফল-ফলারির দোকানের অবস্থাতো আরো করুণ। ভেজাল খেতে খেতে প্রতিটি পরিবারেই এখন একাধিক ব্যাক্তি, পেপটিক আলসার, ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদরোগ, লিভার, ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে ভুগছে। পাড়া-বেপাড়া থেকে শুরু করে শহর, নগর, গ্রাম সবখানে ভ্রাম্যমাণ ভ্যান ফেরিওয়ালা বা চা দোকানের চেয়েও বেশি বেসরকারি ফার্মেসি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক,হাসপাতাল গড়ে উঠছে। সবখানেই রোগির দীর্ঘ লাইন। মানহীন চিকিৎসা সেবায়ও প্রচুর ভেজাল। ফলে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা চিকিৎসা সেবার জন্য দলে দলে বিদেশ ছুটছে। এমনকী সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে জন প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সবাই। ফলে শুধুমাত্র চিকিৎসা সেবা খাতে প্রতিবছর দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার সম পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে চিকিৎসা খাতে এই অধোগমন পুরো দেশের জন্য একটা নেতিবাচক বিজ্ঞাপন নয় কী? আবার সরকারি দায়িত্বশীলদের চিকিৎসা সেবায় বিদেশ গমনের খবরগুলো ফলাও করে প্রচার করা হয়। এতে জনগণের কাছে আমাদের চিকিৎসা সেবার বিষয়ে নেতিবাচক প্রভাব আরো জোরে চেপে বসছে। এ’ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল সচেতন না হলে ফলাফল আরো নেতিবাচক হতে বাধ্য। যা দেশের উন্নয়ন চিত্রকেও ঝাপসা করে দেবে। জাতীয় নেতৃত্বকে দ্রুত প্রশাসনিক জট ও জটিলতা চিহ্নিত করে দেশবাসীকে বিশুদ্ধ খাদ্য, পানীয়, বাসযোগ্য পরিবেশ ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কেন শক্তিশালী নির্বাহী বিভাগের পাশাপাশি সংসদ সচল থাকা সত্ত্বেও দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উচ্চ আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। আদালতের নির্দেশনাও কেন নানা প্রশ্ন ও জটিলতার খোঁড়া যুক্তি তুলে বারবার থামিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা হয়? নদী ও প্রাকৃতিক জলাধার, সরকারি বনভূমি দখল করে কিছু ক্ষমতাধর ভূমিদস্যু দেশের পরিবেশ বিপজ্জনক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলীসহ অন্যান্য দখলকৃত খাল, জলাধার, পাহাড় দখলমুক্ত করতে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরও মামলাও নানা অজুহাতে আটকে দিচ্ছে শক্তিশালী দখলবাজ সিন্ডিকেট।
কেনইবা ছোটখাটো বিষয়েও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়? এতো বিশাল সরকার, প্রশাসনিক কাঠামো যদি জনগণের কাজে না লাগে, প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় তহবিল খরচ করে এদের পুষে কী লাভ! স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও যদি দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আরোপিত দায়িত্ব পালনে হেলা করে, তাহলে এগুলো সব ঢেলে সাজানো ছাড়াতো কোন বিকল্প নেই। দেশের ১৭ কোটি মানুষকে খাদ্যের যোগান দিয়ে বাংলার কৃষক সারা পৃথিবীর সামনে দেশের উন্নয়নকে নতুন মর্যাদায় তুলে এনেছে। তারা কেন ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে দুঃখ-ক্ষোভে পাকাধানের জমিতে আগুন দিচ্ছে! এরজন্য দায়ী কে বা কারা? সময় এসেছে, দেশের দুর্নীতি, আর্থিক কেলেংকারী,অনিয়ম, জন দুর্ভোগের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ে শাস্তির আওতায় আনার। না হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে বিশ্বের উন্নত দেশের তালিকায় তুলে আনার লক্ষ্য (গোল-২০৪১) অর্জন কখনো সম্ভব হবেনা।

x