হাঁটু ও হিপ প্রতিস্থাপনে দক্ষ সার্জন গড়ে তোলার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

অ্যাপোলো গ্লেনিগলস হাসপাতাল

রতন বড়ুয়া, কলকাতা ঘুরে এসে

শনিবার , ২৪ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ
72

একজন ষাটোর্ধ মানুষের হাঁটু প্রতিস্থাপনে সার্জারি চলছে। সার্জারি (অপারেশন) টিমে আছেন প্রখ্যাত সার্জনরা। তাঁরা সুনিপুন ভাবে কাঁটাছেড়া করছেন। আর পুরো দৃশ্যটি প্রজেক্টরের মাধ্যমে পর্দায় সরাসরি দেখছেন দেশ-বিদেশের দুই শতাধিক তরুণ চিকিৎসক (অর্থো সার্জারি)। শুধুই দেখা নয়, খুঁটিনাটি নানা প্রশ্নের উত্তরও জেনে নিচ্ছিলেন কৌতুহলী তরুণ চিকিৎসকরা। অপারেশন কক্ষ থেকে প্রখ্যাত সার্জনরাই এসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। যেন থিউরি আর বাস্তবিক প্রয়োগের মাধ্যমে একই সাথে হাতে-কলমে শেখানো। হাঁটু ও হিপ প্রতিস্থাপনে দক্ষ সার্জন গড়ে তুলতে এমনই ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ অ্যাপোলো গ্লেনিগলস হাসপাতালের। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই হাসপাতালটি আয়োজন করে দ্বিতীয় বারের মতো আন্তর্জাতিক অর্থ্রোপ্লাস্টি কোর্সের। গত ২-৪ আগস্ট (তিনদিনের) এই কোর্সে অংশ নিতেই কলকাতার স্বভূমিতে (হাসপাতালের পাশেই) জড়ো হয়েছিলেন দুই শতাধিক তরুণ অর্থো সার্জারি চিকিৎসক। যেখানে ডেলিগেট হিসেবে বাংলাদেশ, নেপালসহ আরো বেশকয়টি দেশের চিকিৎসকরাও ছিলেন। আর ফ্যাকাল্টি হিসেবে ছিলেন ভারত ও সিঙ্গাপুরের প্রখ্যাত সার্জনরা। ভারতের ৫০ জন ও ভিনদেশের ১০ জনসহ মোট ৬০ জন অভিজ্ঞ ও প্রখ্যাত সার্জন ফ্যাকাল্টি হিসেবে অংশ নেন এখানে। তিনদিনের কোর্সে হাঁটু ও হিপ প্রতিস্থাপনে ১০টি অপারেশন (সার্জারি) করেন প্রখ্যাত এসব ফ্যাকাল্টি (সার্জন)। যা সরাসরি (প্রজেক্টরে ভিডিও’র মাধ্যমে প্র্যাকটিক্যালি) দেখার সুযোগ পেয়েছেন কোর্সে অংশ নেয়া দেশ-বিদেশের তরুণ অর্থোপেডিক চিকিৎসকরা। অবশ্য, তিনদিনের এই কোর্সের পাশাপাশি হাঁটু ও হিপ প্রতিস্থাপনে তরুণ চিকিৎসকদের জন্য ৬ মাসের একটি ফেলোশিপ কোর্সের সুযোগও রয়েছে বলে জানান হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।
‘থিউরি, যেটা বইয়ে পাওয়া যায়; এর সাথে প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং অর্থাৎ থিউরির সাথে সাথে সেটার বাস্তবিক প্রয়োগের মাধ্যমে শেখানোটাই তিনদিনের এ কোর্সের অন্যতম বিশেষত্ব’। কোর্স শুরুর প্রাক্কালে প্রথমদিনের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এই বিশেষত্বের কথা তুলে ধরেন আন্তর্জাতিক অর্থ্রোপ্লাস্টি কোর্সের পরিচালক ডা. বুদ্ধ দেব (বিডি) চ্যাটার্জী। তিনি হাসপাতালের অর্থোপেডিকসের পরিচালকও। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন অ্যাপোলো গ্লেনিগলস হাসপাতাল কলকাতার ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন) ডা. জয় বাসু এবং সিইও (প্রশাসন) রানা দাশ গুপ্ত। সংবাদ সম্মেলনের পরপরই মূলত কোর্সের মূল আয়োজন শুরু হয়। লাইভ সার্জারি (অপারেশন), সেমিনার, প্যানেল ডিসকাশন ছাড়াও প্রশ্নোত্তর পর্বের আয়োজন ছিল তিন দিনের কোর্সে।
আয়োজনের এক ফাঁকে ডা. বিডি চ্যাটার্জীর সাথে কথা হয় আজাদীর এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, মানুষের আয়ুস্কাল বেড়েছে। অর্থাৎ মানুষ বেশি বছর ধরে সার্ভাইভ করছে। তাই হাঁটু ও হিপের সমস্যায় আক্রান্তের হারও বাড়ছে। আক্রান্তরা আমাদের কাছে আসছেন। অনেকেই হাঁটু ও হিপ প্রতিস্থাপন করছেন। এই অপারেশন (সার্জারি) এখন সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মাত্র দুই-একটি সেন্টারে এই অপারেশন হয়ে থাকে। যার কারণে সেন্টারগুলোতে এ ধরণের রোগীর ভিড় খুব বেশি দেখা যায়। তাই আমরা চাই, এ চিকিৎসা বা সার্জারির সুবিধা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে যাক। যাতে রোগী সাধারণকে নির্দিষ্ট দুই-একটি সেন্টারে জড়ো হয়ে ভোগান্তি পোহাতে না হয়। তাঁরা (রোগীরা) যাতে নিজেদের ঘরের পাশেই কোন একটি সেন্টারে এই চিকিৎসা বা অপারেশন করার সুবিধাটা পায়। আর এই চিকিৎসা সুবিধা বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে গেলে এর জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত অর্থোপেডিক সার্জন প্রয়োজন জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ সার্জন গড়ে তুলতেই আমাদের এই উদ্যোগ। তিনদিনের এই কোর্সের আয়োজন। যেখানে দেশ-বিদেশের ২ শতাধিক তরুণ অর্থোপেডিক চিকিৎসককে জড়ো করে আমরা প্র্যাকটিক্যালি প্রশিক্ষণ দিয়ে (হাতে-কলমে শিখিয়ে) অভিজ্ঞ সার্জন হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। তাঁরা এখান থেকে বাস্তবিক বা প্র্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষানলব্ধ জ্ঞান নিয়ে খুব সহজেই নিজের এলাকায় এ চিকিৎসা বা সার্জারি/অপারেশন করাতে পারবেন।
মোটা মোটা বই হয়তো আছে। কিন্তু আমরা দেখেছি- বই পড়ে থিউরি জানা আর বাস্তবিক প্রয়োগের মাঝে অনেক পার্থক্য, যোগ করেন ডা. বিডি চ্যাটার্জী।
চট্টগ্রামের জামালখানের বেলভিউ ভবনে রয়েছে অ্যাপোলো গ্লেনিগলস হাসপাতালের ইনফরমেশন সেন্টার (লিঁয়াজো অফিস)। এর ইনচার্জ হিসেবে আছেন রিফাত ফারুক সম্রাট। এই ইনফরমেশন সেন্টারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ থেকে ডেলিগেট হিসেবে তিনদিনের এই অর্থোপ্লাস্টি কোর্সে অংশ নিয়েছেন ডা. খালেদ বিন ইসলাম। তিনি একা নন, ডা. খালেদের এক সহকর্মীও এই কোর্সে অংশ নিয়েছেন। কোর্সের সমাপনী দিনে বাংলাদেশি দুই চিকিৎসকের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এমন কোর্সে অংশ নেয়া একটি অনন্য অভিজ্ঞতা বলে জানালেন বাংলাদেশের তরুণ চিকিৎসক ডা. খালেদ বিন ইসলাম। মুগ্ধতার সাথে তিনি বলছিলেন- নামকরা সার্জনরা চোখের সামনেই সার্জারি করছেন। কাঁটাছেঁড়া করছেন। হাঁড় অপসারণ করছেন। সবই আমরা অপলক চোখে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি। মনে কোন প্রশ্নের উদ্রেক হলে সেটাও জেনে নেয়ার সুযোগ হয়েছে। একই সাথে থিউরি আর বাস্তবিক প্রয়োগ যাকে বলে। এক কথায় অসাধারণ। তিনদিনে অনেক কিছুই শিখতে পেরেছেন জানিয়ে অপর চিকিৎসক বলেন, ‘এই অল্প সময়ে প্র্যাকটিক্যালি অনেক কিছু জেনেছি-শিখেছি। প্রশিক্ষণলব্ধ এই জ্ঞান নিঃসন্দেহে আমাদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করবে।’
কথা হয় অ্যাপোলো গ্লেনিগলস হাসপাতালের সিইও (প্রশাসন) রানা দাশ গুপ্তের সাথেও। তিনি বলছিলেন- প্রথমবার ২০১৮ সালে (গতবছর) এই অর্থোপ্লাস্টি কোর্সের আয়োজন করেছিলেন তাঁরা। তাতে তরুণ চিকিৎসকদের কাছ থেকে বেশ ভালোই সাড়া পেয়েছিলেন। যার কারণে এবার ২য় বারের মতো এই আয়োজন। চিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়াতে ভবিষ্যতেও এ আয়োজন অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন রানা দাশ গুপ্ত। অন্যদিকে, তরুণ অর্থোপেডিক চিকিৎসকদের দক্ষতা উন্নয়নে তিনদিনের এই অর্থোপ্লাস্টি কোর্স একটি দারুণ সুযোগ বলে মনে করেন হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন) ডা. জয় বাসু। তিনদিনের এই কোর্স ছাড়াও আগ্রহী তরুণ চিকিৎসকদের জন্য ৬ মাসের একটি ফেলোশীপ কোর্সের সুযোগও রয়েছে জানিয়ে ডা. জয় বাসু বলেন- যে কোন দেশের আগ্রহী তরুণ চিকিৎসকরা চাইলে এই ফেলোশিপ নিয়ে এখানে হাতে-কলমে প্রশিক্ষন নিতে পারবেন। প্রশিক্ষন নিয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ সার্জন হয়ে নিজের এলাকায় গিয়ে চিকিৎসা সেবা বা সার্জারি সেবা দিতে পারবেন। তরুণ চিকিৎসকদের জন্য এটিও বড় একটি সুযোগ বলে মনে করেন অ্যাপোলো গ্লেনিগলস হাসপাতাল, কলকাতার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জয় বাসু।

x