হল্যান্ড থেকে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

শনিবার , ২৪ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
50

নিউইয়র্ক থেকে ফিরে এসে : আমেরিকা তুমি কার
নিউইয়র্ককে ঘিরে অনেক প্রচলিত প্রবাদ আছে। তার মধ্যে সব চাইতে বহুল ব্যবহৃত হলো: ‘New York never sleeps but dreams always’ অর্থাৎ ”নিউইয়র্ক কখনো ঘুমায়না, সব সময় স্বপ্ন দেখে”। কে কী স্বপ্ন দেখে সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে একটু বলে নেই, ক্ষণিক-দেখা অভিজ্ঞতায় আমারও মনে হয়েছে নিউইয়র্ক কখনো ঘুমায় না। সে কেবল স্বপ্ন দেখায়। সুন্দর আগামীর স্বপ্ন, ডলারের স্বপ্ন। অনেকে বলে থাকেন নিউইয়র্ক নগরীতে ডলার ওড়ে। কথাটা একেবারে উড়িয়ে দেবার মত নয়। সে প্রসঙ্গেও আসছি একটু পর। এখন আসি কেন বলা হয় এই নগরীটি ‘কখনো ঘুমায় না’ সে প্রসঙ্গে। সপ্তাহ খানেক অবস্থানে অনেক রাতে হোটেল ফেরার সময় দেখেছি মাটির নিচে ‘সাব-ওয়েতে’ যাত্রীর ভিড়। অসুরের মত প্রচণ্ড শব্দে অনেক কম্পার্টমেন্ট নিয়ে বিশালাকার ট্রেনগুলো এসে থামছে ময়লা, নোংরা স্টেশনে। ট্রেন থামতেই এক গাদা যাত্রী নেমে যে যার গন্তব্যস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকে স্টেশনে-আসা ওই ট্রেনে উঠছে। আগেই বলেছি আমেরিকার সব কিছুর সাইজ বিশাল। এমন কী এই যে প্রতিটি ট্রেন, তা কতটা দীর্ঘ ভাবতে অবাক হতে হয়। হল্যান্ডে বড়জোর (প্রায় ক্ষেত্রে) দশ-বারটা কম্পার্টমেন্ট। নিউইয়র্কের সাবওয়েতে চলা এই ট্রেনগুলোর শেষ কম্পার্টমেন্ট দেখতে চেয়েছি নিজের কৌতূহল মেটাতে। পারিনি। এত লম্বা ট্রেন যে শেষ কম্পার্টমেন্ট শুরুর দিক থেকে দেখা যায় না। তার অর্থ এই নয়, ট্রেনে ভিড় নেই। অফিস-আওয়ারে তো ভেতরে দাঁড়ানোই সমস্যা। নিউইয়র্ক নগরীতে রাতের যে সময়টায় ট্যুরিস্ট কিংবা স্থানীয়দের জমজমাট, আনাগোনা, সে সময়টায় হল্যান্ডে দেখবেন সুনসান নীরবতা, যেন মৃত নগরী।
সে অর্থে নিউইয়র্ক প্রাণের নগরী, যেন উচ্ছল কিশোরী কিংবা উদ্দাম তরুণী। হোক না নিউইয়র্ক হেগ কিংবা স্টকহোমের মত ঝকঝকে, তকতকে নয়। কিন্তু যে প্রাণের ছোঁয়া নিউইয়র্কে দেখেছি তার দেখা মেলে না হেগ কিংবা স্টকহোমসহ অনেক ইউরোপীয় শহরে, প্যারিসের কথা আলাদা। নিউইয়র্কের ‘সাবওয়ে’ বা পাতাল ট্রেন দিনের চব্বিশ ঘন্টা চলে, চলে বছরের ৩৬৫ দিন। খাবারের দোকান, মিনি সুপারমার্কেট, স্টোর, রেস্টুরেন্ট নগরীর অনেক স্থানে, মোড়ে খোলা পাবেন দিনের চব্বিশ ঘণ্টা। যে কোন সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আপনি টেক্সি পাবেন।
হল্যান্ডের মত টেক্সি স্ট্যান্ড কিংবা টেক্সি সেন্ট্রালে ফোন করে টেক্সি পাঠাতে বলতে হয় না। রাস্তায় বেরোলেই পাওয়া যায় প্রায় ক্ষেত্রে। রাস্তায় বিশেষ করে বাণিজ্যিক ও দর্শনীয় এলাকাগুলোতে সব সময় হয় ট্যুরিস্ট নয়তো স্থানীয় আমেরিকানদের দেখা পাবেনই, সে যত রাতই হোক না কেন। গভীর রাতে গলা ভেজাতে চান? কিংবা বডি ‘শ্যাক’ করতে চান? নো প্রবলেম। বার, ক্লাব সবই উন্মুক্ত আপনাকে আহবান জানাতে। ব্রিটিশ লেখক গীতিকার ড্যানিয়েল রেডক্লিফ নিউইয়র্ককে এইভাবে বর্ণনা করেছেন- ‘ইংল্যান্ড আমার ঘর, লন্ডন আমার ঘর। নিউইয়র্কে বছর খানেক থাকলে মনে হবে এটি একটি চমৎকার শহর। কিন্তু তারপরও আমি নিশ্চিত আমি ফিরে যাব আমার ঘরে’। ড্যানিয়েলের সাথে আমি একমত। তবে তিনি এক বছরের কথা বলেছেন। আমার বোধকরি সপ্তাহ দুয়েকের পর ঘরে ফিরে যেতে মন চাইবে।
নিউইয়র্ক পৌঁছার দিন আমাদের আর ঘোরা হলো না। মেঙিকান রেস্তোরাঁ থেকে রাতের খাবার খেয়ে হেঁটে হোটেলে ফিরি। শরীরকে একটু বিশ্রামও দেয়া দরকার। কেননা পরদিন সকাল থেকে শুরু হবে ঘোরাঘুরি, বিশ্রামহীন। কন্যা সপ্তর্ষি এবং পুত্র অতীশ যে পরিকল্পনা সাজিয়েছে হল্যান্ড থেকে তাতে বুঝতে পারি, দিনের অনেকটা সময় একটানা বাইরে থাকতে হবে, হাঁটতে হবে। ঠিক হলো পরদিন নিউইয়র্কের প্রাণভোমরা ‘ম্যানহাট্টান’ যাব। সংস্কৃতি, এন্টারটেইনমেন্ট, ফিল্ম, অর্থনীতি, মিডিয়া – সব কিছুর জন্যে ম্যানহাট্টান জগৎখ্যাত। ওয়াল স্ট্রিট, নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ, বিখ্যাত টাইমস স্কয়ার, টুইন টাওয়ার (বর্তমানে নাইন এলাভেন মিউজিয়াম) সব স্ব স্ব গৌরব আর ইতিহাস নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই ম্যানহাট্টানে। ১৭৮৫ থেকে ১৭৯০ সাল তক ম্যানহাট্টান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী। স্বাভাবিকভাবেই এখানকার ঘরবাড়ির মূল্য আকাশচুম্বী। ম্যানহাট্টানের ‘রিয়েল স্টেটের’ মূল্য বিশ্বের কটি দামী এলাকার অন্যতম, প্রতি স্কয়ার ফুট অফিস ভাড়ার দাম তিন হাজার ডলার। অথচ মজার ব্যাপার হলো ১৬২৬ সালে জনৈক ডাচ ব্যবসায়ী/নাবিক নেটিভ আমেরিকানদের কাছ থেকে গোটা ম্যানহাট্টান মাত্র ৬০ গিল্ডার দিয়ে কিনে নিয়েছিলেন যার বর্তমান মূল্য ১০৩৮ মার্কিন ডলার। ম্যানহাট্টানের রয়েছে মজার ইতিহাস।
কেনার পর ডাচরা এর নতুন নামকরণ করেন ‘নিউ আমস্টারডাম’। কিন্তু ১৬৬৪ সালে ম্যানহাট্টান এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকা ইংরেজদের দখলে এলে ইংরেজ রাজা চার্লস দ্বিতীয় এলাকাটি তার ভাই ডিউক অফ ইয়র্ককে দিয়ে দেন এবং নিউ আমস্টারডামের নতুন নামকরণ করা হয় ‘নিউইয়র্ক’ হিসাবে। আমরা উঠেছি ব্রুকলিন এলাকায়। ম্যানহাট্টান যেতে আমাদের ক্রস করতে হবে হাডসন নদী। জাহাজে নয়, ফেরিতেও না। ব্রুকলিন এবং ম্যানহাট্টানকে ভাগ করে রেখেছে এই শান্ত নদীটি, হাডসন যার নাম। নদীর উপর বিশালাকৃতি ব্রিজ। নিচ দিয়ে চলে গেছে গাড়ি রাস্তা, উপরে সাধারণের হেঁটে চলাচলের জন্যে, পাশাপাশি সাইকেলের লেইন। এই ব্রিজটি পরিণত হয়েছে দর্শনীয় স্থান হিসাবে। নানা দেশ থেকে নিউইয়র্কে বেড়াতে আসা অগণিত ট্যুরিস্ট এই ব্রিজের উপর দিয়ে হেঁটে না গেলে নিউইয়র্ক দর্শনই হয় না বলে অনেকের ধারণা। বিদেশ থেকে আসা ট্যুরিস্টদের পাশাপাশি আছে স্থানীয়রাও। আমাদের দলের দুই তরুণ গাইড, সপ্তর্ষি ও অতীশ আগ থেকেই ঠিক করে রেখেছিল এই ব্রিজ হেঁটে পার হয়ে ম্যানহাট্টান যাবে, ঘুরে বেড়াবে হাডসন নদীর ওপারের দিকটা, বলা চলে নিউইয়র্কের মূল নগরীটা। সকালে আমার স্বাভাবিক নিয়মে (স্ত্রী, সন্তানদ্বয়ের কাছে যা অস্বাভাবিক) দেরিতে ঘুম থেকে উঠা। সকালের ঘুমটা আমার কাছে মনে হয় পৃথিবীর সব চাইতে আরামপ্রিয় একটি ব্যাপার। সেটা আমি বুঝি, কিন্তু কোনকালে বুঝেননি আমার জন্মদাতা বাবা এবং তার এই অযোগ্য সন্তানের স্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চাকরি করার সময়ও বিনে পয়সায় যখন বাবার হোটেলে দিন কেটেছে তখনও সকালের ঘুম ভেঙেছে, না আল্লাহ-খোদার নাম নিয়ে নয়, বাবার ‘ইতে কোনদিন মানুষ নইবো’ এই মধুর বাণী শুনে। বাবা গত হয়েছেন অনেক বছর আগে। ভেবেছিলাম বেঁচে গেছি। কিন্তু না, এই দুর্ভাগার কপালে উইক এন্ডেও কখনো-সখনো ওই জাতীয় বাণী যেমন, ‘এতক্ষণ মানুষ কী করে ঘুমাতে পারে, বুঝি না’ জাতীয় কথা ছুঁড়ে দেয়া হয় ঘুম-কাতুরে এই নিরীহ প্রাণীটির দিকে। তখন ইচ্ছে হয় গায়ের চাদরটা জড়িয়ে নিজেকে দেখিয়ে, ‘এই ভাবে ঘুমায়’ বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু বলি না।
এমন পরিস্থিতিতে যত কম কথা বলা যায় তত ভালো। যাই হোক- টের পাই পাশের কামরায় ওরা সবাই প্রস্তুত, অপেক্ষা করছে আমার উঠার। অগত্যা উঠতে হলো, বিশেষ করে ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে। সপ্তর্ষির খুব ইচ্ছে তার ছোট ভাইটিকে নিউইয়র্কের দর্শনীয় সব স্থান দেখিয়ে চমক দেবে। চমক দেবে আমাদেরও। সে এর আগেও নিউইয়র্ক এসেছে, চষে বেড়িয়েছে গোটা নিউইয়র্ক। আজকালকার ছেলেমেয়েদের নতুন দেশ বা নতুন শহর ঘোরা মানে সেই দেশ কিংবা শহরটাকে ভালো করে জানা।
যেমন নিউইয়র্কের সব চাইতে বড় পার্ক যেটি সেন্ট্রাল পার্ক হিসাবে পরিচিত, তা আয়তনে এত বড় যে হেঁটে দেখা সম্ভব না। (দৃষ্টিনন্দন এই পার্কটিতে হিন্দি ছায়াছবি, ‘কাল হো না হো’-র একটি জনপ্রিয় গান, ”হার ঘড়ি বদল রাহি, হয় রূপ জিন্দেগী” গানটি চিত্রায়িত হয়েছিল)। সে জন্য পর্যটকরা চাইলে সাইকেল ভাড়া করতে পারেন, অন লাইনে কিংবা পার্কে গিয়ে। অতীশ-সপ্তর্ষি আগ বাড়িয়ে হল্যান্ড ত্যাগ করার আগেই জন প্রতি ৩৬ ডলার দিয়ে দুই ঘন্টার জন্যে ভাড়া করেছিল দুটো সাইকেল।
তাই বলি নতুনকে দেখার মাঝে ওদের যে প্রশংসনীয় ঔৎসুক্য, আমার মাঝে অনেকের মত তা নেই। যাই হোক-সাবওয়ে ধরে আমরা এক সময় ব্রুকলিন ব্রিজের কাছে পৌঁছলাম। অগণিত ট্যুরিস্ট, নানা বর্ণের, নানা আকারের, নানা ভাষার পর্যটক, লোকজন টু-ওয়ে হাঁটার রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। অনেকে সাইকেলে। কেউ ব্রুকলিনের দিকে, কেউবা ম্যানহাটানের দিকে। আমাদের গন্তব্যও সেদিকে। হাডসন নদীর উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্রিজ পার হয়েছি বার কয়েক, এর আগে। সতীর্থ সাংবাদিক বন্ধু, মঈনুদ্দিন নাসেরের গাড়িতে, ২০০৬ সালে এবং তার পরে আরো একবার। মনে হচ্ছিল নাসেরের গাড়ি উড়ছে। তখন ছিল অনেক রাত। দিনের আলোয় যেভাবে হেঁটে হাডসন নদীর দু’পাড়ের আকাশ ছোঁয়া ভবন আর সুন্দর নগরীকে দেখেছি সেটি দেখা হয়নি রাতের আঁধারে। চলবে। (২২-৮-২০১৯)

x