হল্যান্ড থেকে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

শনিবার , ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
43

আফ্রিকার মারাকাশ থেকে ফিরে:
জিএফএমডি – ৩

যে কারণে মারাকাশ আসা সেই বিষয়টা একটু তুলে ধরা দরকার। আগেই উল্লেখ করেছিলাম যে অভিবাসন ইস্যুকে ঘিরে ফি বছর এক একটি দেশে গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট বা সংক্ষেপে জি এফ এম ডি নামে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ২০০৭ সাল থেকে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস থেকে এর শুরু। এর পর থেকে যে সমস্ত দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে তা হলো-ফিলিপাইনস, গ্রিস, মেক্সিকো, সুইজারল্যান্ড, মরিশাস (আফ্রিকা), সুইডেন, তুরস্ক, বাংলাদেশ এবং জার্মানি। এর প্রতিটি সম্মেলনে যে সংস্থার সাথে সম্পৃক্ত অর্থাৎ ‘বাসুগ’ তাতে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ হয়েছে আমার। তাতে সম্মেলনের পাশাপাশি নতুন নতুন দেশে যাওয়া হয়েছে ঠিকই কিন্তু দেশ দেখার সুযোগ মিলেছে কম। অনেক ক্ষেত্রে এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল, হোটেল থেকে সম্মেলন কেন্দ্র এবং ব্যাক টু দ্য স্টেডিয়াম – দেশ আর দেখার সুযোগ হয়নি। মনে পড়ে ২০১২ সালে মরিশাস জি এফ এম ডি সম্মেলনে যোগ দিতে যাবো শুনে অফিসে কলিগরা বলে উঠে, ‘ইউ আর সো লাকি’। চমৎকার দেশ, ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপ রাষ্ট্র। ১৫৯৮ সালে ডাচরা সর্ব প্রথম এই দেশটির সন্ধান পেয়েছিল ও নিজেদের দখলে নিয়েছিল। সাগর আর পাহাড়ে ঘেরা। যে হোটেলে উঠেছিলাম সেটি ছিল একেবারে ভারত মহাসাগরের গা-লাগোয়া। এত কাছে যে জোয়ার এলে সমুদ্রের জল ছুঁয়ে যেত রেস্টুরেন্টে যেখানে আয়োজন করা হতো দিনের ব্রেকফাস্ট আর ডিনার। যেন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারি সাগরের জল। কিন্তু ওই তক। দেখাতেই শেষ, ছোঁয়া আর হয়ে উঠেনি। জীবনের অনেক ইচ্ছেই তো ‘ইচ্ছেতে’ থেকে যায়। তাই নয় কি? তারপরও ভাগ্যবান বলতেই হয়। নানা দেশে যাবার এই সুযোগই বা ক’জনার জোটে।
মারাকাশ সম্মেলন ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত দশটি সম্মেলন থেকে ছিল ভিন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ- বিষয় ও আঙ্গিকে। এর আগের সম্মেলনগুলোতে সরকার ও সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিরা অভিবাসন বা মাইগ্রেশনের ভালো-মন্দ দিকগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ আলোচনা করেছেন, করেছেন বিতর্ক। সম্মেলনগুলিতে নেয়া অনেক প্রস্তাব অনেক দেশ, বিশেষ করে অভিবাসন রিসিভিং দেশগুলি মেনে নেয়নি। প্রথম দিকে তো সরকার পক্ষ সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিদের সাথে অর্থাৎ আমাদের সাথে কোন আলোচনায়ই বসতে রাজী ছিলনা। এর জন্যে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। দুদিনের সিভিল সোসাইটি সম্মেলন এবং পরবর্তী দুদিন সরকারি প্রতিনিধিদের সম্মেলন। প্রথম দিকে সরকার পক্ষ কেবল সিভিল সোসাইটির দুজন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে তাদের (সরকারি) সম্মেলনে অংশ গ্রহণের অধিকার দিয়েছিল, যেখানে এই দুজনের একজন সিভিল সোসাইটি সম্মেলনে কী কী সুপারিশমালা গৃহীত হয়েছে তা তুলে ধরবেন। সরকারি সম্মেলনে আমরা আরো অংশীদারিত্ব চাই, দাবী জানাই- আমাদের সকল বেসরকারি বা সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিদের সরকারি আলোচনায় বসার সুযোগ করে দেয়া হোক। এরপর কেবল অর্ধ দিন সরকারি অধিবেশনে বসার সুযোগ করে দেয়া হলো। তারপর পুরো একদিন। এভাবে আমরা অর্থাৎ সিভিল সোসাইটির সকল প্রতিনিধিরা সরকারি প্রতিনিধিদের সাথে সরাসরি আলাপ-আলোচনার সুযোগ পেলাম। এই সমস্ত বিষয় এই কারণে তুলে ধরা- যারা জিএফএমডি-র প্রথমদিককার বিষয়গুলি জানেন না তাদের জানা দরকার। তাই অনেকে যারা বলেন গত দশ বছরে জিএফএমডি তেমন কোন অগ্রগতি সাধন করেনি, তারা যে ভুল বলছেন এই অগ্রগতিতে তার প্রমাণ মেলে। এর মাঝে অনেক সরকার, বিশেষ করে পশ্চিমা সরকার, অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে তেমন কোন কথা শুনতে রাজী বা প্রস্তুত নয়। অনেকে বিরোধিতা করেছে শুরুতে। তাদেরকে দলে ভিড়াতে এই সম্মেলনের আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়োজিত মাইগ্রেশন সম্পর্কিত প্রি-জিএফএমডি গোলবৈঠক, আলোচনা, ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার কোন-কোনটাতে যোগ দেয়ার সুযোগ হয়েছে আলোচক হিসাবে। সবশেষে ঠিক হলো ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মারাকাশ জিএফএমডি সম্মেলনে ‘গ্লোবাল কম্প্যাক্ট অন মাইগ্রেশন’ (সংক্ষেপে জিসিএম) শীর্ষক একটি চুক্তি গৃহীত হবে যাতে সম্মতি দেবে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র। যেমনটি ধারণা করা হয়েছিল, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ‘জেহাদ’ ঘোষণাকারী যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তির বিরোধিতা করেন। তার সাথে সুর মেলায় ইউরোপের বেশ কটি দেশ। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইতালী, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরী, পোল্যান্ড, লাতভিয়া, চেক রিপাবলিক, স্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া ও অস্ট্রিয়া। এছাড়া যে সমস্ত রাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে নিজেদের দূরে রাখে তা হলো, ইসরায়েল ও ডোমিনিকান রিপাবলিক। বিগত ১৮ মাস ধরে চলে এই চুক্তি নিয়ে দর-কষাকষি। এর পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয় জার্মানী। মারাকাশ সম্মেলনে এর পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখে চ্যান্সেলর মের্কেল যখন নিজের আসনে ফিরে আসতে থাকেন, তখন পুরো হল জুড়ে ছিল তুমুল করতালি। নিজ আসনে না বসা তক সেই করতালির শব্দ গোটা হলকে মাতিয়ে রেখেছিল উপস্থিত অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরা, যারা এই চুক্তির স্বপক্ষে ছিলেন। জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৬৪ রাষ্ট্র এই চুক্তি গ্রহণ করে তুমুল করতালির মধ্যে দিয়ে। শেষ হয় মারাকাশ গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট বা জিএফএমডি ২০১৮। পরবর্তী জিএফ্ল্লএমডি অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ, ইকোয়াডরে, চলতি বছরের ডিসেম্বরে।
এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন- চুক্তি হলেই কী মাইগ্রেশনের সব সমস্যা সমাধান হয়ে গেল? না, বলা চলে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। মাইগ্রেশন কী করে সবার মঙ্গল বয়ে আনতে পারে, কীভাবে একে কার্যকরভাবে ‘ম্যানেজ’ করা যেতে পারে, কী করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা, বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে থাকা অভিবাসীদের পরিস্থিতি ও অবস্থানের উন্নতি হতে পারে তার জন্যে এই চুক্তিতে উল্লেখিত, গৃহীত সুপারিশমালা বাস্তবায়িত করতে হবে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। আর তার জন্যে প্রত্যেকটি দেশকে, সরকারকে আন্তরিক হতে হবে, বিভিন্ন ‘স্টেইকহোল্ডারদের’ সাথে মিলিত ভাবে কাজ করতে হবে, তবেই এর বাস্তবায়ন সম্ভব। তার আগে নয়। বাংলাদেশ সরকার এই ব্যাপারে আন্তরিক তাতে কোন সন্দেহ নেই। জিএফএমডি-র ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার অনেক আগ থেকেই বেশ সক্রিয়। মারাকাশে এই বিশাল যজ্ঞ আয়োজনে যে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয় তাতে যে কটি হাতে-গোনা দেশ আর্থিক অনুদান দিয়েছিল তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রতিটি সম্মেলনে উপস্থিত থাকেন উচ্চ পর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিরাও। মারাকাশে বাংলাদেশ সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে একজনের সাথে দেখা ও পরিচয় হয় অল্প সময়ের জন্যে, মাইগ্রেশন ল্যাবরেটরির সাইড ইভেন্টে। বিশ্বের ১৮টি দেশ থেকে মাইগ্রেশন নিয়ে কাজ করেন তেমন ৩৩ জনকে নিয়ে এই ল্যাবরেটরি গঠন করা হয় ২০১৭ সালে। জার্মান সরকার ও জার্মান উন্নয়ন সংস্থা, জি আই জেড এই ল্যাবরেটরির উদ্যোক্তা। এর অন্যতম সদস্য হিসাবে এই সাইড ইভেন্টে আমারও ভূমিকা ছিল। সেখানেই পরিচয় সালেহীন সাহেবের সাথে। পুরো নাম আহমদ মুনির সালেহীন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এডিশনাল সেক্রেটারী। তিনি ছিলেন এই সাইড ইভেন্টে। আমরা যখন বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে গেলাম তখন তিনি বসেছিলেন আমার পাশে। ল্যাবরেটরির প্রতিটি সদস্যকে ইভেন্টে চার অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে ছোট্ট দলে ভাগ হয়ে ল্যাবরেটরির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল। তখনই তার সাথে পরিচয়। ইভেন্ট আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি তার মতামত রেখেছিলেন। বিজনেস কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, দেশে গেলে যোগাযোগ করবেন। সরকারি দলে বাংলাদেশ থেকে আরো জনা কয়েক উপস্থিত ছিলেন মারাকাশ সম্মেলনে। তাদের কারো সাথে পরিচয় ঘটেনি। বাংলাদেশ থেকে আসা সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলির কয়েক প্রতিনিধিকে দেখলাম তাদের পিছু পিছু দৃষ্টিকটু ভাবে ঘুরঘুর করছেন। তা দেখে আর এক বেসরকারি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মন্তব্য করেন, ‘দেশে তো থাকেন না, পরিস্থিতি জানেন না। কাজ করতে গেলে এদের গুডবুকে রাখা প্রয়োজন’। দাঁড়িয়ে লাঞ্চ সারছি। উঁচু আকারের টেবিলে খাবারের প্লেট। পাশের ভদ্রলোককে দেখে মনে হলো বাংলাদেশের। ইংরেজিতে জানতে চাই বাংলাদেশী কিনা। নিশ্চিত হলে শুরু আলাপচারিতা। আলাপের আগে নাম। জানালেন মোহাম্মদ ওয়াসিম উদ্দীন ভূঁইয়া। মাইগ্রেশন তার সাবজেক্ট অব এরিয়া। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘নিউ এইজের’ স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট। ইতিমধ্যে তার অনেকগুলি লেখা পড়লাম নিউ এইজের অন লাইন পোর্ট্রলে। বেশ ভালো লেখেন অপেক্ষাকৃত এই তরুণ সাংবাদিক। জানালেন প্রথমবারের মত জিএফএমডিতে আসা এবং আগামীগুলিতেও যোগ দেবার ইচ্ছে, কেননা তার রিপোর্টিং স্পেশালাইজেশন হচ্ছে মাইগ্রেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট। তার সাথে আবারো দেখা দেশে ফেরার পথে। খুব ভোরে মারাকাশ থেকে কাসাব্লাঙ্কা ফিরতি ফ্লাইট। তার আগের দিন রাতে দেরীতে শুতে গিয়েছিলাম। ভোর পাঁচটায় উঠতে হয়েছে। ট্যাক্সি আগ বাড়িয়ে ঠিক করা ছিল। চেক ইন করে ভেতরে অপেক্ষা করছি। শরীর ক্লান্ত। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বেশ কিছুক্ষণ চোখ বুঁজে ছিলাম। চোখ খুলতেই দেখি ওয়াসিম উদ্দীন ভূঁইয়া। পাশে বসে। বললেন, ”কতক্ষণ হলো এসেছি। আপনাকে বিরক্ত করিনি”। এর পর দীর্ঘ আলাপ। তার স্ত্রী সরকারি কর্মকর্তা, কাজ করেন ঢাকায় তথ্য মন্ত্রণালয়ে। কথা প্রসঙ্গে বন্ধু রণজিৎ বিশ্বাসের কথা উঠলো। তথ্য মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারী হয়ে অবসরে গিয়েছিল। অকালেই মারা গেল। রণজিতের প্রশংসা করে ওয়াসিম ভূঁইয়া বলেন, ‘তার মত এতো পড়াশোনা করা সরকারি আমলা কম হয়। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি আমাকে মুগ্ধ করেছিলেন”। দেশে ফিরে ওয়াসিম ভূঁইয়ার বেশ কটি প্রতিবেদন দেখলাম। বেশ ভালো লাগলো। আমাদের সময় অর্থাৎ আমি যখন ঢাকায় বাংলাদেশ টাইমসসে স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে কাজ করতাম, তখন এই ‘স্পেসিয়ালাইজেশন’ ব্যাপারগুলি ছিলনা। যে রাজনীতি নিয়ে রিপোর্ট করছে, সেই অর্থনীতি বিষয়ে সেমিনার-মিটিং কভার করছে। ফলে একটা বিশেষ বিষয়ে ‘এক্সপার্ট’ হয়ে উঠা আমাদের সময় তেমনটি হয়নি। আমাদের সময় ব্যতিক্রম ছিল কেবল স্পোর্টসের বেলায়। স্পোর্টস রিপোর্টাররা দেখতাম কেবল স্পোর্টস নিয়ে রিপোর্ট করছে। সময় ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে অনেক কিছুই এগিয়ে গেছে। সাংবাদিকতাও। তারপরও অনেক সময় মনে হয় আগেকার দিনের সেই ‘সাহসী ও বলিষ্ঠ সাংবাদিকতা’ বর্তমান বাংলাদেশে করুণভাবে অনুপস্থিত। চলবে (১০-১-২০১৯)।

- Advertistment -