হল্যান্ড থেকে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

শনিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৪:৩৩ পূর্বাহ্ণ
49

জেনেভার চিঠি: ইউরোপে এন্টিমাইগ্রেন্ট হাওয়া,

সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘে আলোচনা

শেষ দিয়ে শুরু করেছিলাম গত সপ্তাহের লেখা। এবার শুরু করা যাক শুরু থেকে। কিন্তু কোন শুরুর মুহূর্ত থেকে শুরু করবো সেটি ভাবতেই ভাবতেই কেটে গেল শুরুর কয়েকটা মুহূর্ত। জাতিসংঘের মূল ভবনে সময়মত যাতে উপস্থিত থাকি তার জন্যে বেশ কয়েকবার ইমেইল ও ফোনে তাগাদা দেয় জার্মান উন্নয়ন সংস্থা, ‘জি আই জেডেরকর্মকর্তা, ম্যাক্সিম রোসকিন। তরুণ এই জার্মান অনুরোধ জানিয়েছিল প্লেনের টিকেট ও হোটেল বুকিং যেন আগেভাগে করে রাখি। হোটেলের কয়েকটা লিঙ্কসও পাঠিয়েছিল। এই বলে মনে করিয়ে দিতে ভুললো না, হোটেলের জন্যে বাজেট বরাদ্দ প্রতিরাত ১৮৪ ইউরো (১৮ হাজার টাকা)। তাকে নিশ্চিত করি এই বলে, ‘ডোন্ট ওরি। এর মধ্যেই হোটেল পেয়ে যাবো। জেনেভায় থাকেন বন্ধুসম, খলিলুর রহমান। তার কথা আগের সংখ্যায় উল্লেখ করেছিলাম। তিনি বুকিং দিলেন হোটেল ইবিসে। প্রতি রাত ১৬৪ ইউরো। একই হোটেল হল্যান্ড কিংবা জার্মানীতে হলে ১০০ ইউরোর মধ্যে পাওয়া যেত। গ্লোবাল সিটি হিসাবে পরিচিত জেনেভায় হোটেল পাওয়া, এই দামে দুরূহ ব্যাপার, বিশেষ করে যখন জাতিসংঘে কোন অনুষ্ঠান থাকে। আর জাতিসংঘে তো বছরের গোটা সময় ধরে একটা না একটা ইস্যু নিয়ে নানা প্রোগ্রাম হয়ে থাকে। আসে পৃথিবীর তাবৎ দেশ থেকে প্রতিনিধি। তার উপর আছে ট্যুরিস্ট। হোটেল ঠিক হলে পর ম্যাক্সিমকে ইমেইল পাঠিয়ে বলি, ‘তোমার জন্যে সুখবর আছে, তোমার নির্ধারিত রেইটের চাইতে কম দামে হোটেল পেয়েছি। একই হোটেলে চলতি বছরের শুরুর দিকে তিন দিন ছিলাম। জায়গাটা, তার আশপাশ, হোটেলটা চেনা। তাই খলিলুর রহমান সাহেব যখন জানতে চাইলেন এই হোটেলে বুকিং দেবেন কিনা, তখন আর নাকরিনি। কেননা জেনেভা জাতিসংঘ দফতর এই হোটেল থেকে খুব একটা দূরে নয়। হোটেলের সামনেই বাস স্টেশন, ট্রামও। আমার এবারও জেনেভা যাওয়া জাতিসংঘে আয়োজিত ভিন্ন একটি সম্মেলনে যোগ দেয়া। তবে এবার প্যানেল সদস্য হিসাবে। গত ৪ সেপ্টেম্বর ছিল গ্লোবাল কম্প্যাক্ট অন মাইগ্রেশন বাস্তবায়নের উপর দিনব্যাপী জিএফএমডি ডায়লগ। ২০১৭ সালে জার্মানী ও মরক্কো জিএফএমডির যৌথ চেয়ারম্যানশীপের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে যে সমস্ত সম্মেলন ও আলোচনার আয়োজন করা হয়েছিল নানা দেশে তারই ধারাবাহিকতায় জেনেভায় এই ডায়লগের আয়োজন। সাধারণ পাঠকের সহজ করে বুঝার জন্যে এখানে একটু ব্যাখ্যা দেয়া দরকার। প্রতি বছর বিশ্বের এক একটি দেশে জিএফএমডি (গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট) সম্মেলন হয়ে থাকে। তাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সরকারিবেসরকারী প্রতিনিধি মিলিয়ে প্রায় ৭০০ প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন। ফিবছর এক একটি দেশে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এক একটি দেশ তার দায়িত্ব নেয়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে এর আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসাবে যোগ দেন এবং বক্তব্য রাখেন। ঢাকায় এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এমন একটা সময় যখন বাংলাদেশ ধর্মীয় উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের আক্রমণে গোটা বিশ্বে বড় সংবাদ। এর মাস কয়েক আগে হলি আর্টিজেন বেকারীতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ধর্মের নামে অমানবিক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। গোটা বিশ্ব থেকে প্রায় ৭০০ উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি আসবেন, তাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠে আসে সে সময়। সম্মেলন এক পর্যায়ে বাতিল হবার দশা। বাংলাদেশ সরকার দৃঢ়ভাবে বললো, তারা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেবে। সোনারগাঁও থেকে শুরু করে গুলশান, বনানীর বড় বড় হোটেল রিজার্ভ করা হলো, স্থানীয় ও অন্যান্য সব বুকিং বাতিল করা হলো, নিরাপত্তার কারণে। গুলশানের যে হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাতে হোটেলের বাইরে, পুলিশ, র‌্যাব ছিল সার্বক্ষণিক, এমন কী লবিতেও। বিশাল এই যজ্ঞ বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শেষ করেছিল, যা সবার প্রশংসা কুড়িয়েছিল। অনুষ্ঠানের শেষ দিন প্রতিনিধিদের জন্যে আয়োজন করা হয়েছিল চমৎকার সম্বর্ধনা। মূল আয়োজক পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন অভ্যাগতের স্বাগত জানাতে। দেখা হতে বললাম, ‘সবই আপনার কারণে। সবাই বাংলাদেশের প্রশংসা করছেন এই বলে এমন চমৎকার জিএফএমডি বিগত ৮ বার কোনো দেশ আয়োজন করতে পারেনি। হেসে বললেন, ‘আপনারা সবাই আসাতে সুন্দর ও সফল হয়েছে। অভিবাসন নিয়ে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের শুরু ২০০৭ সালে ব্রাসেলস থেকে। এর পর থেকে অনুষ্ঠিত হয়েছে ম্যানিলা (২০০৮), এথেন্স (২০০৯), ম্যাঙিকো (২০১০), জেনেভা (২০১১), মরিশাস (২০১২), স্টকহোম (২০১৩১৪), ইস্তানবুল (২০১৪১৫), ঢাকা (২০১৬), বার্লিন (২০১৭) এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হবে মারাকাশ (মরক্কো) ১১তম সম্মেলন। আমার সৌভাগ্য একমাত্র জেনেভা ছাড়া বাকি সব কটিতে যোগ দেয়ার সুযোগ হয়েছিল। সে সময় দেশে ছিলাম বিধায় যোগ দিতে পারিনি।

জেনেভার জাতিসংঘ দফতরে ৪ সেপ্টেম্বর যে অনুষ্ঠান তা চলিত বছর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনকে ঘিরে। ইউরোপসহ গোটা বিশ্বে চলছে এন্টিমাইগ্রেশন বাতাস। বাতাস না বলে বলা উচিত ঝড়। বিদেশী ঠেকাও ক্যাম্পেইন চলছে সর্বত্র। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতায় অংশীদার হচ্ছে এন্টিইমিগ্রেন্ট রাজনৈতিক দলগুলি। সবশেষে কদিন আগে সুইডেনে যে নির্বাচন হয়ে গেল তাতে এন্টিমাইগ্রেন্টস দল হিসাবে পরিচিত, সুইডেন ডেমোক্র্যাটস দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে। একই পরিস্থিতি হল্যান্ডে। আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার এই ব্যাপারে কী করছে সে আমরা সবাই জানি।

বর্ডার বন্ধ করা ছাড়াও ট্রাম্প সরকার অমানবিকভাবে অবৈধপথে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীদের কাছ থেকে তাদের সন্তানদের আলাদা করে নেয়ার মত অমানবিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা দেশবাইরে নিন্দিত ও ধিকৃত হয়েছে। প্রচণ্ড চাপ ও সমালোচনার মুখে ট্রাম্প সরকার এই পদক্ষেপ থেকে সরে এলেও এখনো কয়েক শত শিশুকিশোরকে তাদের মাবাবার সাথে মিলিত হবার সুযোগ করে দেয়নি। গোটা বিশ্বব্যাপী মাইগ্রেশনকে ঘিরে যখন এই দশা, তখন তার থেকে উত্তরণের জন্যে জেনেভার জাতিসংঘ দফতরে উচ্চ পর্যায়ের জি এফ এম ডি ডায়লগের আয়োজন। জেনেভা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সরকারিবেসরকারি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। বিশ্বের অনেক দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের হলেও দেখলাম বাংলাদেশ থেকে যাকে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করতে পাঠানো হয়েছে তিনি জুনিয়র কূটনৈতিক। লাঞ্চের পর তার সাথে পরিচয় হলে জানতে চাই তিনি কোন পদে আছেন। বললেন, দ্বিতীয় সচিব। গোটা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সরকারী তরফ থেকে কোন শব্দ শোনা যায়নি, যদিও বা অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূতরা অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের মতামত রেখেছিলেন, করেছিলেন আলোচনাকে অর্থবহ। উদ্বোধনী সেশনে আমাকে প্রতিনিধিত্ব করতে হয়েছিল মাইগ্রেশন ল্যাবরেটরিকে। ভাবছেন এটা আবার কি? একটু খোলাসা করে বলি। জার্মান সরকার গেল বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে বিশ্বের ১৮ টি দেশ থেকে মোট ৩৩ জন তাদের ভাষায় থট লিডার্সবা চিন্তাবিদনির্বাচিত করে এই ল্যাবরেটরির সদস্য হিসাবে। এই ৩৩ জন গত ১৮ মাসে বার্লিন, রাবাত এবং কিটো নগরীতে মিলিত হয়ে অভিবাসন কীভাবে সবার জন্যে মঙ্গল বয়ে আনতে পারেএই নিয়ে বিস্তারিত ও দীর্ঘ আলোচনা করেন এবং শেষে মোট ৮টি প্রস্তাবনা নিয়ে হাজির হন। এই সমস্ত প্রস্তাব আসন্ন মারাকাশ জিএমএমডি সম্মেলনে পেশ করা হবে। ল্যাবরেটরি কোন প্রক্রিয়া কাজ করেছে, কি ফলাফল বেরিয়ে এসেছে এবং ল্যাবরেটরি সম্পর্কে সিভিল সোসাইটির সদস্য হিসাবে আমার অভিজ্ঞতা জানানোর জন্যে আমার এই বিশেষ আমন্ত্রণ।

আমার ভেতরে কিছুটা উত্তেজনা যে কাজ করছিল না তা নয়। কিন্তু আমার চাইতে লক্ষ্য করি ম্যাঙ্মি আরো বেশি টেনশনে। কেননা সেইমাইগ্রেশন ল্যাবরেটরিরদায়িত্বে। জাতিসংঘ দফতরের কাছে প্রায় পৌঁছেছি। সাথে সুমনা। এমন সময় ম্যাক্সিমের ফোন, জানতে চায় কদ্দুর? বলে, আমরা গেটে অপেক্ষা করছি। তাকে বলি, ‘তোমরা ভেতরে চলে যাও। আমার সিকিউরিটি পাস লাগবে না। কেননা নিউইয়র্কসহ জাতিসংঘের যে কোন সদর দফতরে প্রবেশের জন্যে আমার আছে বাৎসরিক গ্রাউন্ড পাস। বাসুগের কর্ণধার হিসাবে এই সুবিধা। কেবল তাই নয় যেহেতু বাসুগেরজাতিসংঘের স্পেশাল কন্সালটেটিভ স্টেটাস আছে, সেই কারণে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসাবে আরো পাঁচ সদস্যকে প্রবেশাধিকার দেয়ার জন্যে কয়েক মাসের জন্যে টেম্পোরারি পাস ইস্যু করার অনুরোধ করতে পারি। এর ফলে আর সিকিউরিটি গেইটে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় না, যেতে হয় না স্ক্যানিং মেশিনের মধ্যে দিয়ে। ম্যাক্সিম এবং তার সাথে থাকা জার্মান ইকনোমিক কোঅপারেশন এন্ড ডেভলপমেন্টের মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান ইলসে হ্যানকে অপেক্ষা করতে হয় এই চেকের জন্যে। কোন চেক ছাড়াই পার হয়ে যাওয়াতে ম্যাঙ্মি বলে, তোমার কি প্রায়শঃ এখানে আসা হয়? বলি, প্রায় সময় না, তবে বেশ আসা হয়। ্ল্ল্লদশটায় অনুষ্ঠান শুরু। কথা ছিল অনুষ্ঠান শুরুর আগে আমরা যারা প্যানেল সদস্য তাদের সাথে মডারেটর শলাপরামর্শ করবেন, কীভাবে আমাদের আলোচনাকে গৎবাঁধা মনোলগেনা গিয়ে প্রাণবন্ত করা যায়। মডারেটর প্রফেসর জিব্রিল ফাল, আফ্রিকীয়, স্থায়ী আবাস যুক্তরাজ্য।জিব্রিলকে ঘিরে আমরা প্রথম অধিবেশনের বক্তারা। রাষ্ট্রদূত এডুয়ার্ড জেনেসা, জার্মান ইকনোমিক কোঅপারেশন এন্ড ডেভলপমেন্টের মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান ইলসে হ্যান ও উঁচুচওড়া চুকু চিকেজি। তিনিও আফ্রিকীয়, মাইগ্রেশন বিষয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কন্সালটেন্সি সেবা দেয়া ছাড়াও নিজস্ব প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অত্যন্ত বিজ্ঞ ও চমৎকার বক্তা। চুকুর সাথে অনেক বছর ধরে জানাশোনা। এই মাইগ্রেশন ইস্যু নিয়ে বিভিন্ন দেশে তার সাথে দেখা, কখনো একই মঞ্চেও। তবে বিষয়ের গভীরতায় তার কাছে আমি অতি তুচ্ছ। আমাদের আলোচনা এগিয়ে চলে। অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক ফিলিপাইনি তরুণী, এস্ট্রেলা এ

সে তাগাদা দেয়, বলে, সময় প্রায় শেষ, অনুষ্ঠান শুরুর দিকে। আমরা উঠে পড়ি। জাতিসংঘ ভবনের তিন তলার বার নম্বর হলে হবে অনুষ্ঠান। এগিয়ে যেতে যেতে সেরি লিওনের নাগরিক (স্থায়ী আবাস যুক্তরাজ্য) চুকু বলেন, ‘কেমন আছেন তোমাদের দুই নারী নেত্রী? একজন তো জেলে, অন্যদিকে নির্বাচন

(আগামীতে সমাপ্য) ১৪২০১৮

x