হল্যান্ড থেকে

অসম্ভবকে সম্ভব করলো কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা এবং নতুন প্রস্তাবিত আইন

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

শনিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৮ at ৪:০৭ পূর্বাহ্ণ
53

যা ছিল অসম্ভব, কল্পনারও বাইরে, সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালো কোমলমতি কিশোরকিশোরীরা। বাংলাদেশের জন্মের কালে কেউ কোনোদিন রাস্তায় সারি বেঁধে রিকশা, বাস, ট্রাক, সিএনজি, প্রাইভেট কার চলাচল করতে দেখেনি, দেখেনি এম্বুলেন্সের জন্যে ইমার্জেন্সি লেইন। সেই দৃশ্য আমাদের দেখিয়েছে রাজনীতির বাইরে থাকা স্কুলকলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। আর সেই দৃশ্য আমরা দেখেছি অবাক বিস্ময়ে। দেখে মুগ্ধ হয়েছি, ছোট ছোট এই সমস্ত ছেলেমেয়েদের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা আপনাতেই নত হয়ে এসেছিল। মনে হয়েছে এ যেন আর এক বাংলাদেশ। মনে মনে বলেছি, ‘সাবাশ বাংলাদেশ অবাক তাকিয়ে রয়, মাথা নোয়াবার নয়। পাশাপাশি তারা আঙ্‌গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দেশে যানবাহন সেক্টরে বিরাজমান সীমাহীন নৈরাজ্য, সংকট ও অরাজকতা। হাতে গোনা কদিন রাজপথে থেকে, বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে, অভুক্ত থেকে তারা দেখিয়ে দিয়েছে তাদের অগ্রজদের ভুল, ব্যর্থতা, আর সীমাহীন দুর্নীতির কথা। তাদের কারণে আমরা দেখেছি মন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারি, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজ ছাড়া, তাদের ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে, উল্টা পথে গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যেতে। সব ভয়কে তুচ্ছ জ্ঞান করে তারা থামিয়ে দিয়েছে এই সব ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের গাড়ি। এমন না যে এতদিন এনারা লাইসেন্স নিয়ে রাস্তায় গাড়ি বের করতেন না। এমনও না যে বিষয়টা জনগণ জানেনা। কিন্তু এই জানাবিষয়গুলো আরো ভালো করে জানান দিয়েছে এই সব কিশোরকিশোরীরা। তারা যা করেছে তা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, একান্ত নিজের তাগিদের বশে, কিছুটা আবেগতাড়িত হয়েও। কারো নেতৃত্বে নয়, কারো নির্দেশেও নয়। রাজপথে নেমে আসা এই সমস্ত ছেলে মেয়েদের কাউকে দেখিনি নেতৃত্ব দিতে, একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে তারা তাদের প্রতিবাদ জানিয়ে গেছে, পাশাপাশি আঙুল দেখিয়ে দিয়েছে সমাজের, রাষ্ট্র যন্ত্রের বিশেষ করে যানবাহন ব্যবস্থায় যে সীমাহীন, লাগামহীন নৈরাজ্য তার ভুলভ্রান্তি, দোষত্রূটি। কিন্তু ভুল শোধরানোর এই কাজটি তাদের না। যাদের করার কথা, যাদের কাজ এটি তারা সঠিকভাবে সম্পাদন করতে ব্যর্থ হওয়াতে এই সমস্ত স্কুলগামী ছেলেমেয়েরা করিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। প্রমাণ করেছেসদিচ্ছা যদি থাকে, উদ্দেশ্য যদি হয় মহৎ তাহলে যে কোন কাজের অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। অন্ততঃ কদিনের জন্যে হলেও তারা একটি অনুকরণীয় উদাহরণ স্থাপন করেছে। সেই উদাহরণ দুর্ভাগা এই দেশে বোধকরি কখনো চিরস্থায়ী হবার নয়। বাস্তবতার কারণেও কিছুটা। সে অবকাঠামো আমাদের দেশে এখনো গড়ে উঠেনি। কেননা রিকশার যে সারিবদ্ধ লাইন দেখেছি, তা এত দীর্ঘ যে নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে অনির্দিষ্টসময় লেগে যাবে। অন্ততঃ দুলাইন হলে কিংবা তার চাইতেও ভালো রিকশা একেবারে উঠিয়ে দিলে, নিদেনপক্ষে প্রধান সড়কে, তাহলেও হয়তো কিছুটা সম্ভব ছিল। আজকাল বোধ করি কোন দেশেই মানুষচালিত বাহন শহরের প্রধান সড়কগুলোতে দেখা যায় না।

আমাদের দেশে সড়ক, নৌপথে যানবাহন ব্যবস্থার অরাজকতার ব্যাপারটি নতুন কোন কিছু নয়। যারা এই দুটি সেক্টরের নিয়ন্ত্রণে, যারা এর হর্তাকরতেবিধাতা তাদের কাছে সাধারণ যাত্রী, জনগণ আক্ষরিক অর্থে জিম্মি। তারা ইচ্ছে করলে রাস্তায় গাড়ি নামান, তারা ইচ্ছে করলে এক একটি অজুহাতে রাস্তা থেকে গাড়ি উঠিয়ে নেন। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ জনগণ। তাদের কেউ ধরার নেই, ধরার সাহস রাখে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তারা সকল জবাবদিহিতারঊর্ধ্বে। জনগণকে জিম্মি করে ফায়দালুটার এই প্রবণতা কেবল যানবাহনে নয়, প্রায় পেশায় দেখা যায়। ফলে বছরের পর বছর সাধারণ যাত্রী ভোগে, যাত্রী হয় চালক ও মালিকের অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার। প্রায়শঃ চালক হয় বেপোরোয়া, প্রচলিত ট্রাফিক নিয়মের কোন তোয়াক্কা করার প্রয়োজন মনে করে না। কেননা যারা তাদের এই সমস্ত স্বেচ্ছাচার, অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করবেন তারা প্রায় ক্ষেত্রে নীরব দর্শক। লেনদেনের বিষয় আছে। ফলে যাত্রী নির্যাতিত হয়, আহত হয়, পঙ্গু হয়, নিহত হয়, মহিলা যাত্রীরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়। মহিলা যাত্রীদের বাসে উঠা ও নামার সময় হেলপারদের আচরণ উন্নত বিশ্বে হলে যৌন হয়রানির পর্যায়ে গিয়ে পড়তো। কখনোসখনো গাড়ি চালক ধরা পড়ে, জরিমানা হয় আইন ভঙ্গ করার অপরাধে। কিন্তু দুএকটি ছাড়া প্রায় সব ঘটনায় অপরাধী ছাড়পেয়ে যায়। আইনের যথার্থ প্রয়োগ নেই বলে আমরা দেখি ১৩ বছরের লাইসেন্সবিহীন বালককে বাস চালাতে। প্রশ্নের উত্তরে তাকে বলতে দেখি, ‘পুলিশে ধরবো না। কারণ পুলিশকে টাকা দেই। ফলে সড়কে রাজীব, দিয়ার মত অগণিত প্রাণের অসময়ে সমাপ্তি ঘটে। এমনি হত্যার পর ঘটে কিছু প্রতিবাদ, চলে কিছু লেখালেখি, সরকার থেকে দেয়া হয় কিছু আশ্বাস, কিছু ক্ষতিপূরণব্যাস তারপর আবার সেই আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া। বিস্মৃতিপরায়ন জাতি আমরা। আমরা সব কিছু সহজে ভুলে যাই। ভুলে যাই বলে এখনো বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অনেকে অস্বীকার করার মতো দুঃসাহস দেখায়। তার ছবি টেনে মাটিতে নামায়, অশ্রদ্ধা জানায়। যাই হোক, বলছিলাম সড়কে অরাজকতার কথা। সাধারণ জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, আর সে কারণে সহপাঠীদের হত্যার (দুর্ঘটনা নয়) কারণে যখন স্কুলকলেজের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ জানিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল তখন আমজনতা তাদের সাথে একাত্মতা বোধ করেন, সহমর্মিতা জানান। ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদ সড়ক দাবিতে ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে রাজধানীর চলাচল ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। সাধারণ জনগণ ভোগান্তিতে পড়ে। কিন্তু লক্ষ্য করার মত যা তা হলো তাদের সমস্ত ভোগান্তি সত্ত্বেও তারা ছেলেমেয়েদের ন্যায্য দাবির প্রতি তাদের সমর্থন জানান। তাদেরকে বলতে দেখা যায়, “সড়কে বেপোরোয়া গাড়ি চালানোর জন্যে আমাদের জীবন অনিশ্চিত। যখনতখন মানুষ মারা যাচ্ছে গাড়ির চাপায়। আমাদের কষ্ট হোক, কিন্তু আমরা চাই নিরাপদ সড়ক। তাদের দাবি ন্যায্য ছিল বলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই তাদের দাবির প্রতি সহনশীল ও সংবেদনশীল ছিলেন। তিনিও তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা প্রকাশ করেন এবং নির্দেশ দেন যাতে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাথে জড়িত কোন ছাত্রছাত্রীর গায়ে কোনো আঁচড় না লাগে। তার এই মায়ের মত, একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদের মত পদক্ষেপ সবার প্রশংসা কুড়ায়। অনেকে চেয়েছিলেন ছাত্রদের এই আন্দোলনকে শুরুতেই শেষ করতে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে গোটা পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। তাকে জানাই সাধুবাদ।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন যখন সাধারণ জনগণের প্রশংসা কুড়াতে শুরু করেছে, যখন সরকার ছাত্রদের দাবি মেনে নিয়েছে বলে ঘোষণা দিলো, সেই মুহূর্তে হঠাৎ আন্দোলন ভিন্ন রূপ পেতে শুরু করলো। সুযোগসন্ধানীরা সব সময় অপেক্ষায় থাকে সুযোগের। তেমনি হঠাৎ করে দেখা গেল শান্তিভাবে পালিত এই আন্দোলনের মধ্যে সন্ত্রাসী কায়দায় আক্রমণ ও ভাঙচুর। গুজব ছড়ানো শুরু হলো ফেইস বুক সহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায়। ছাত্রবেশে আন্দোলনের ভেতর ঢুকে গেল ভিন্ন লক্ষ্যে, ভিন্ন জনেরা। ব্যানারের ভাষা গেল বদলে, বদলে গেল প্রতিবাদের ভাষা, স্লোগান হলো অশ্লীল থেকে অশ্লীলতর কোনো কোন স্থানে, যা কারো কাম্য ছিল না। রাজনীতি অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঢুকে গেল কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে। বইয়ের পরিবর্তে অনেকের ব্যাগের মধ্যে ঠাঁই পেলো চাপাতি আর পাথর। রাজপথে অনেককে দেখা গেলো প্রকাশ্যে সাদা স্কুল ড্রেস পড়ে মিছিলে সামিল হতে। অন্যদিকে দেখা গেল পুলিশের সাথে একদল হ্যালমেটধারী। রাজপথে দেশীয় অস্ত্র উঁচিয়ে দেখা গেল অনেককে, কর্মরত সাংবাদিকদের পুলিশের উপস্থিতিতে আক্রমণের শিকার হতে হলো। এরা কিন্তু কেউ ওই কোমলমতি ছেলেমেয়েরা না। এদের কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের পক্ষ হয়ে তাদের পেশী শক্তির জানান দিয়ে গেল। কেউ বলে সরকার দলের, কেউবা বিএনপি ও জামাত। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, ”যদি কেউ প্রমাণ দেখাতে পারেন যে সাংবাদিকদের কোন ছাত্রলীগ নেতা বা সদস্য আক্রমণ করেছে, তাদের বিচার আমরা করবো, আমাকে নাম দিন। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, ”এই ছবিতে অস্ত্রহাতে যে ছেলে সে ছাত্রদলের। একটা পর্যায়ে ভয় হচ্ছিল এই ভেবে এই ভয়াবহ রূপ আরো ভয়াবহ হবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে মূল আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা সরকার, প্রধানমন্ত্রী সহ অনেকের আবেদননিবেদনের প্রেক্ষিতে ফিরে গেছে তাদের ঘরে, স্কুলে। গত কয়েক দিন রাজধানীর সড়কগুলোতে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়নি, যদিওবা কোন কোন স্থানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে, দেখা গেছে অনেক স্থানে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে। ভয় ছিল কোমলমতিদের ভিন্নখাতে প্রভাবিত করা হবে। সেটি হবার সুযোগ সরকার দেয়নি। আশ্বাস অনুয়ারি সরকার নতুন সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে। নতুন আইন অনুয়ায়ী বেপরোয়াভাবে বা অবহেলা করে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনায় কেউ গুরুতর আহত বা কারো মৃত্যু হলে চালককে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড উভয় দণ্ড দেয়া হবে। আগের আইনে এই শাস্তি ছিল সর্বোচ্চ তিন বছর। এই প্রস্তাবিত আইনের সমালোচনা করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র নায়ক ফারুক বলেন, ”আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছিলাম দশ বছরের। তাছাড়া সর্বনিম্ন কত সেই ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই এতে। তার অর্থ কি এক মাস, এক দিন”? অন্যদিকে যা ভাবা হয়েছিল তাই! এই নতুন আইন অনুমোদনের পর নারায়ণগঞ্জে আন্তঃজেলা ট্রাক শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করে এবং বেশ কটি গাড়ি ভাঙচুর করে। তাদের এমন অন্যায় আবদারে খুনিরা এখন রাস্তায় এসে যদি বলে, আমাদের হাতে যদি কেউ খুন হয় আমাদের কিন্তু ৫ বছরের বেশি শাস্তি দেয়া যাবে না। কেমন হবে?

পুনশ্চ: বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে সামাজিক মাধ্যমে কারো কোন মানহানি হলে সর্বোচ্চ সাজা ১৫ বছরের জেল, সর্বনিম্ন ৭ বছর; লুন্ঠন, অপহরণ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর জেল; হাইওয়েতে রাত্রে ডাকাতি করলে সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ বছরের জেল, ডাকাতি করলে ১০ বছরের জেল অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ডাকাতির প্রস্তুতি ১০ বছরের জেল। আর বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে কারো মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছরের জেল। (সূত্র: ডেইলী স্টার, ৮ আগস্ট ২০১৮)(২০১৮)

x