হল্যান্ড থেকে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

শনিবার , ২ জুন, ২০১৮ at ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ
83

প্রসঙ্গ : মা, মেমন হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন

A mother is she who can take the place of all others, but whose place no one else can take’ অর্থাৎ মা এমনই একজন যিনি সবার স্থান অধিকার করে নিতে পারেন, কিন্তু তার স্থান কেউ নিতে পারেন না। মায়ের সাথে সন্তানের রয়েছে নাড়ির টান। দশ মাস নিজ গর্ভে ধারণ করে তিল তিল করে বেড়ে উঠা সন্তানকে এক সময় মা জন্ম দেন। ডাক্তার কিংবা মিডওয়াইফ জানেন মায়ের প্রসব যন্ত্রণা কী, জানেন মা নিজে। আমি ডাক্তার নই, কিন্তু সামনে থেকে দেখেছি মায়ের প্রসব যন্ত্রনা কী। আমার দুটি সন্তানের জন্মের সময় সারাক্ষণ উপস্থিত থেকে এক পর্যায়ে নাড়ি কেটেছি। ইউরোপীয় ডাক্তার আমার হাতে কাঁচি ধরিয়ে দিয়েছিলেন আমার দুসন্তানের বেলায়। সেই থেকে আমি আমার বেশ কটি লেখায় লিখেছি সন্তান জন্মের সময় পিতার উপস্থিত থাকা নিতান্ত প্রয়োজন। তাতে তিনি উপলদ্ধি করতে পারবেন তার মা তাকে এই পৃথিবীতে আনতে গিয়ে কী মরণযন্ত্রণা ভোগ করেছেন। লিখেছি এই কারণে তাতে কোন সন্তান তার মাকে যেন কোনদিন অবহেলা করার কথা ভাবনায়ও আনতে না পারে। কত কষ্ট, কত রক্তক্ষরণ, তারপরও মা তার সমস্ত কষ্ট, প্রসব যন্ত্রনা ভুলে যান নবজাতকের কান্না শুনে। পৃথিবীতে এর চাইতে আর মধুর ও ভালো লাগার মুহূর্ত আছে বলে আমার জানা নেই। যে মা তার সন্তানের কান্না শুনতে পারেন তিনি সৌভাগ্যবতী। অনেক মা আছেন যারা সন্তানের কান্না শোনার আগেই নিজে এই পৃথিবী থেকে চলে যান। চিকিৎসার অভাব, ভুল চিকিৎসা, অজ্ঞানতার কারণে মারা যান প্রসবকালীন কিংবা পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতার কারণে। এক সূত্রে জানতে পারি, আমাদের দেশে প্রতিদিন ১৪ জন মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। বর্তমানে যদিও বা আমাদের দেশে প্রসবকালীন সময় মিডওয়াইফদের সাহায্য নেবার সংখ্যা ৪২% ভাগে পৌঁছেছে, তারপরও দেখা যায় ৫৮% শিশুর জন্ম হচ্ছে বাড়িতে কোন প্রকার চিকিৎসা সাহায্য ছাড়া। ফলে ঘটে দুর্ঘটনা।

বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস ২০১৮ উপলক্ষে গত ২৮ মে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মেমন মাতৃসদন হাসপাতাল আয়োজন করেছিল এক চমৎকার অনুষ্ঠান। দিনের শ্লোগান ছিল “কমাতে হবে মৃত্যু হার, মিড্‌ওয়াইফ পাশে থাকা দরকার’’। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। নিজের যোগ্যতায় নয়, সুযোগ্য এক সুহৃদের আমন্ত্রণে। তিনি ড. সেলিম আকতার চৌধুরী, চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের চীফ হেলথ অফিসার, যার অধীনে ১৪০ জন ডাক্তার রয়েছেন। আমার ঘরেও ডাক্তার, . সেলিম সহ আমার জনা কয়েক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডাক্তার। তাদের কেউ কেউ আমার উপর নাখোশ। বাংলাদেশের ডাক্তারদের নিয়ে আমার সাম্প্রতিক লেখায় কিছুটা সমালোচনা করেছিলাম। আমি সৌভাগ্যবান বন্ধুবর ড. সেলিম আমার উপর নাখোশ হননি, হলেও নেহায়েৎ ভালো মানুষ বলে এখনো আগের সম্পর্কটা বজায় রেখেছেন এবং অনেকটা জোর করে গতকালের অনুষ্ঠানে ডেকেছেন। তিনি যখন বললেন, চলে আসুন, আমাদের মেয়র সাহেবও আসবেন, তার সাথে আপনার দেখা হবে, তখন আর ’না’ করিনি। কিছুদিন আগে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন হল্যান্ড গেলে তার সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। তার ছিল এক দিনের সংক্ষিপ্ত সফর। সে কথাটি তিনি নিজেও বললেন গতকাল তার সাথে মেমন হাসপাতালে অনুষ্ঠান শেষে আলাপকালে। মেয়র আ জ ম নাছির এবং বন্ধু ড. সেলিমের কাছে কৃতজ্ঞ, তারা দুজন তাদের বক্তব্যে এই অযোগ্যকে যে সম্মান দেখিয়েছেন তার জন্যে। গতকালের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকলে প্রতিদিনের অনেক বিষয়, অনেক তথ্য অজানা থেকে যেত। আসলেও এই বিশাল পৃথিবীর কী কণা পরিমান আমাদের জ্ঞান। আপনাদের না হলেও আমার, সে অজ্ঞতা স্বীকারে আমার কোন গ্লানি নেই। আমাদের জীবনে, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ‘মিডওয়াইফদের’ যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আমাদের দেশেও আছে সে তেমন করে জানা ছিলনা। জানা ছিল না যে গাইনী এবং নার্সদের মাঝামাঝি তাদের অবস্থান। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডাক্তার আজিজুর রহমান সিদ্দিকী মজার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এই মিডওয়াইফ সম্পর্কে। মিডওয়াইফ এর বাংলা মর্মার্থ ’“অন্তর্বর্তীকালীন স্ত্রী’’। কেন এরা মিডওয়াইফ এবং ওয়াইফ নয় তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, মিড্‌ওয়াইফরা নবজাতককে মায়ের ভালোবাসা দেন বলেই তাদের মিডওয়াইফ বলা হয়। ব্যাখ্যাটা বেশ ভালো লাগলো। ভালো লাগলো জেনে যখন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন গর্বের সাথে দাবী করলেন এই বলে, “চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল কর্পোরেশন বাংলাদেশের একমাত্র পৌর কর্পোরেশন যা তার নাগরিকদের জন্যে চিকিৎসা সেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রেখেছে এবং জনগণের সেবা দিয়ে চলেছে’’। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ম্যানুয়েলের কোথায়ও এর উল্লেখ নেই, কিন্তু আমরা তা দিয়ে আসছি এবং আমাদের প্রতি বছর ভূর্তকি দিতে হয় ৫৬ কোটি টাকা। অথচ মাত্র ১০৫ কোটি টাকা পৌর কর আদায় করতে সক্ষম হয়েছি, এর মধ্যে ৩৫ কোটি টাকা এসেছে বন্দর থেকে। তারপরও তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে অনেকের অভিযোগ, ক্ষোভ।

মেয়রের যে বিষয়ের সাথে আমি সহমত পোষণ করি তা হলো জনগণের দেয়া ট্যাক্স বা কর। মেয়র নাছির যথার্থই বলেছেন, “আমাদের দেশের যে সংখ্যক নাগরিক ট্যাক্স দিয়ে থাকেন তা লজ্জাজনক পর্যায়ে’’। এই ব্যাপারে আমার কাছে সঠিক কোন তথ্য নেই। তবে অনুমান করি আমাদের দেশে কর দেয়া ব্যক্তির সংখ্যা অনেকটা হাতে গোনার পর্যায়ে। হল্যান্ডে প্রতিটি ব্যক্তি তার আয় অনুযারী আয়কর দিয়ে থাকেন, দিয়ে থাকেন পৌরকর। এর থেকে কোন পরিত্রান নেই, নেই বাংলাদেশের মত ‘ম্যানেজ’ করে নেবার বিশেষ ব্যবস্থা। উন্নত দেশে আপনার বাড়ীর প্রতিদিনের বর্জ্য পরিষ্কার করার জন্যে নিয়মিত গাড়ী এসে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে তুলে নেবে, কারো কোন বিন্দুমাত্র ক্ষতি বা বিরক্তি উৎপাদন না করে। পথচারী থেকে যানবাহন এমন কী সাইকেল চালকদের জন্যে রয়েছে পৃথক রাস্তা। সেখানে প্রতিটি নাগরিক নিয়মিত কর দেন, তাই তারা তেমন সেবাও পেয়ে থাকেন। আমরা সেবা চাইবো,কিন্তু সেবাটা নিশ্চিত করার জন্যে যে করের প্রয়োজন তা দেব নাএই ধরণের মন মানসিকতা বা চিন্তাভাবনা সমর্থনযোগ্য নয়। চট্টগ্রাম পৌরবাসী নিয়মিত কর দেননা (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া), সেটি আমার ধারণায় যেমন সত্যি, ঠিক তেমনি কর আদায় করতে গিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকর্মকর্তারাও কতটুকু সৎ সে বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ। লালখানবাজার যেখানে আমার এই ক’দিনের অবস্থান, সেখানে একই ভবনে থাকা এক ব্যবসায়ীকে কেন তারা পৌর কর দেন না এই ব্যাপারে জানতে চাইলে উল্টো প্রশ্ন রাখেন, ’’কেন দেব বলুন, একটি কারণ দেখান যার কারণে আমি কর দেব’’, তার পাল্টা প্রশ্ন। তার অভিযোগ, লালখানবাজার বাগগোনার মোড়ে প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার দিকে বর্জ্য নেবার গাড়ি আসে ময়লা নেবার জন্যে, যখন সবাই ইফতারের জন্যে ব্যস্ত থাকে। এই সময়টা পথচারী, গাড়ির ভীড়, তার উপর ময়লার দুর্গন্ধ। এটি কি বর্জ্য পরিষ্কার করার উপযুক্ত সময়? আসলেও তাই। লক্ষ্য করি, প্রতিদিন বিকেলে এই কর্মটি ঘটে পথচারীদের ভোগান্তি ও বিরক্তি সৃষ্টি করে। আমারও। আশা করি পৌর কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি দেখবেন।

ফিরে আসি মেমন হাসপাতালে। সেই বুদ্ধি বয়স থেকে শুনে আসছি এই হাসপাতালের কথা। অনেকের মত আমার মাঝেও একটা ধারণা ছিল স্বল্প মূল্যে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয় বলে এর সেবার মান তেমন উন্নত নয়। ধারণাটা একেবারে ভ্রান্ত তা নয়। কেননা মেয়র নাছির তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেন, চাটগাঁ শহরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই মাতৃসদন হাসপাতাল প্রসূতিদের সেবা দিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে, অনেকটা নামমাত্র মূল্যে। কিন্তু এর সেবার মান এক সময় নিচে নেমে এসেছিল, যদিও বা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর মান বেড়েছে। তেমনটি দাবি করলেন হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক ড. প্রীতি বড়ুয়া। বন্ধুবৎসল ড. প্রীতি বড়ুয়া শুরু থেকে এই হাসপাতালের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর পেছনে ছিলেন ভূতপূর্ব আলহাজ্ব এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী। আশার কথা শোনালেন তার জামাতা ড. সেলিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম পৌর এলাকায় কোন মা গর্ভ কিংবা প্রসবকালীন সময়ে যাতে মৃত্যুবরণ না করেন তার জন্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি’’। এই অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছুতে হলে উপযুক্ত ডাক্তারের পাশাপাশি দক্ষ মিডওয়াইফ গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম পৌর কর্পোরেশন সেই অভীষ্ঠ লক্ষ্যে আন্তরিক তা তাদের উদ্যোগ এবং কর্মতৎপরতা দেখে বুঝতে পারি। গতকালের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে জেনেছি বাংলাদেশে এই ‘মিড ওয়াইফ কনসেপ্ট’ শুরু হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে। অনেকে কিছুর জন্ম তো এই চট্টগ্রামেই, সেই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন বলুন আর একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন। জয়ুত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জয়তু বাংলাদেশ। (৩০২০১৮)

x