হল্যান্ড থেকে

সড়ক দুর্ঘটনা, না হত্যা-সামনে  যাই থাকুক গাড়ি চলবে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

শনিবার , ৫ মে, ২০১৮ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
87

সুবচন যেমন গেছে নির্বাসনে, ঠিক তেমনি অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সৎ, নির্ভিক ও প্রতিবাদী মানুষ গেছে নির্বাসনেস্বেচ্ছায় কিংবা পরিস্থিতির কারণে। চোখের সামনে অন্যায় আচরণ, অন্যায় ব্যবহার হলেও কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখিনা। দেখি ’নাদেখার’ ভান করে পাশ কেটে যেতে, সভয়ে। কী না কী ঝামেলায় পড়ি এই ভয়ে। একটা সময় ছিল যখন পাড়ার ছেলেরা মন্দ কিছু করলে মুরুব্বীরা ডেকে ধমক দিতেন, এমন কী কেবল মুখেই শাসন করতেন না, কানমলা জাতীয় শাস্তিও দিতেন। এখন সেদিন আর নেই, যেমন নেই আমাদের অনেক কিছুই। নেই সহমর্মিতা, নেই মমত্ববোধ কিংবা অন্যের বিপদে এগিয়ে আসার মানসিকতা। আর যখন এগিয়ে আসি, তখন এগিয়ে এসে তামাশা দেখি, কিছু করিনা। কথাগুলি মনে এলো এই কারণে কয়েক মাস ধরে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনা নামে একটার পর একটা ’হত্যাকান্ড’ ঘটে চলেছে, অথচ তাতে কাউকে তেমন প্রতিবাদ করতে দেখিনা। কেমন যেন গাসওয়া হয়ে গেছে। পত্রপত্রিকা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় এ নিয়ে দিন কয়েক কিছু কথাবার্তা হয় বটে, ব্যাস ওই পর্যন্ত। গত কিছুদিন ধরে যেন অনেকটা প্রতিযোগিতা লাগিয়ে ট্রাক, লেগুনা ড্রাইভাররা যেভাবে একের পর পথচারী, যাত্রীকে ‘হত্যা’ করে চলেছে তাতে যাদের সোচ্চার হবার কথা, যাদের এই হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেবার কথা, তারা অনেকটা নির্জীব। উল্টো তারা তাদের (হত্যাকারী চালকদের) পক্ষাবলম্বন করছেন। তাদের কথাদুর্ঘটনা তো ঘটবেই। দুর্ঘটনা ঘটবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে সড়ক পথেদূরপাল্লার কথা বাদই দিলাম, সেখানে তো প্রতিদিন ঘটছেনগরীর ভেতর যে হারে মানুষ গাড়ী চাপা পড়ছে এবং তার ফলশ্রূতিস্বরূপ কেউ হাত হারাচ্ছে, পা হারাচ্ছে এবং অবশেষে প্রাণটি, তাতে কাউকে দেখিনা এগিয়ে আসতে, আঙ্‌গুল দিয়ে এর পেছনে নেপথ্যেকারী, কারা প্রকৃত দোষী বা কাদের পরো সমর্থনের কারণে এই ধরণের স্বেচ্ছাচারিতা চলছে তার প্রতিবাদ করতে। ওই যে বললাম, জানিয়ে আবার কোন ঝামেলায় পড়ি। তাই চুপ করে থাকাই শ্রেয় জেনে চুপ করে থাকি।

তবে এই নীরবতা সরবে সম্প্রতি ভঙ্গ করলেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, “দুর্ঘটনা কী পরিমাণে বেড়েছে ! কারও হাত চলে যাচ্ছে, পা চলে যাচ্ছে, মাথা চলে যাচ্ছে। এভাবে কোনো সভ্য দেশ চলতে পারে না’’। তার অর্থ কী? আমরা একটি অসভ্য দেশে বসবাস করছি? আমাদের দেশ গরীবি তকমা ছেড়ে ’মধ্যম আয়ের’ দেশে পরিণত হয়েছে দাবী করে আমরা প্রতিদিন গলা ফাঁটিয়ে ফেলছি। কিন্তু আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য শুনলে মনে হয় আমাদের এই দাবী কতটা ঠুনকো ও ফাঁকা। যে দেশে ৭৭% ভাগ চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই সে দেশে আইন যে শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কিছু নয়, তা বললে কি এতটুকু বাড়িয়ে বলা হবে? এই সংখ্যা (৭৭%) আঁতকে উঠার মত। লাইসেন্সহীন একটি লোক চালকের আসনে বসে একগাদা যাত্রী নিয়ে যেন ‘মরণ যাত্রা’ পথে এগিয়ে চলেছে। প্রতিটি সড়কে। আইনের সামান্যতম প্রয়োগ থাকলে কি এমনটি সম্ভব হতো? হতো না। হতে পারার কথা নয়। কোন সভ্য দেশে এটি কি কল্পনায়ও ভাবা যায়? এটি অচিন্তনীয় ব্যাপার। যে দেশে ৭০% ভাগ লাইসেন্সহীন ড্রাইভার গাড়ী চালায়, সে দেশে হরহামেশা সড়ক দুর্ঘটনা হবে, পথচারী মারা যাবে, রাজীব, হৃদয় হাত হারাবে, প্রাণ হারাবে কিংবা রোজিনা আক্তার পা হারাবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এতে আর হাহুতাশ করার কি আছে? বরঞ্চ লাখো শুকরিয়া উপরওয়ালাকে যে, দুর্ভাগা এদেশে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত সড়কদুর্ঘটনায় আরো অনেক যাত্রী, পথচারী আহত বা নিহত হচ্ছে না।

উপরের এই তথ্য অর্থাৎ ৭০% ড্রাইভার লাইসেন্সহীন’ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তাদের এই তথ্য প্রকাশ। সমিতির সেক্রেটারী জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক চৌধুরী আমার মনের কথাটাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, “এই যে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, তাকে আমরা ’হত্যা’ বলে অভিহিত করতে চাই, কেননা উপযুক্ত ম্যানেজমেন্ট ও আইনের অভাবের কারণে আমরা এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হচ্ছি চলাচল করতে’’। অন্যদিকে, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ট্রাফিক আইন পরিবর্তন করার উপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, দুর্ঘটনা রোধে দরকার আইন পরিবর্তন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। তিনি বলেন, শাস্তি বাড়িয়ে হবে না, আইন প্রয়োগের প্রয়োজন, প্রয়োজন মনোভাব পরিবর্তনেরও। তিনি অনেকটা হতাশ কণ্ঠে বলেন, “লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৪ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৪০০ টাকা জরিমানা। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে যদি এ অবস্থা হয়, তা হলে কেউ লাইসেন্স নেওয়ার তেমন গরজ বোধ করবে না’’। দুর্ভাগ্য, যারা আইনপ্রণেতা, যারা সংসদে বসে এই হত্যাকান্ড বন্ধ করার জন্যে আইন প্রণয়ন করবেন তাদেরই একজন উল্টো সুরে বললেন, “সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে যারা চালকদের শাস্তির (মৃত্যুদন্ড) পক্ষে তাদের সাথে আমি সহমত পোষণ করিনা। একজন খুনীর শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কিন্তু এই শাস্তি কি হত্যা প্রতিরোধ করতে পারে”? কী উদ্ভট যুক্তি! বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী প্রেসিডেন্ট তিনি, যিনি এই বক্তব্য রাখেন, তিনি আর কেউ নন, মন্ত্রী শাহজাহান খান, অতি ক্ষমতাধর মন্ত্রী, শিপিং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। তার ইশারায় চলে সড়ক পথের যানবাহনের শ্রমিকেরা। তিনি যখন এই ধরণের কথাবার্তা বলেন তখন ড্রাইভাররা তো আরো বেপরোয়া হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। এর অর্থ কি? খুনীর জন্যে মৃত্যুদন্ড থাকবে না? খুনী খুনের পর সাজা ভোগ না করে মাস কয়েক পর জেল থেকে বেরিয়ে আসবে? একমাত্র বাংলাদেশেই বুঝি এই ধরণের অস্বাভাবিক, যৌক্তিকহীন কথাবার্তা বলে পার পাওয়া সম্ভব। অন্য কোন দেশে, বিশেষ করে সভ্য দেশে হলে তাকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হতো অনেক আগেই। বাংলাদেশে তেমনটি ঘটেনা, আর ঘটেনা বলেই এমন ধরণের উচ্চারণ ধ্বনিত হয় ক্ষমতাবানদের কণ্ঠে, হরহামেশা। মন্ত্রীর এমনতর কথাবার্তা সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর জন্যে উৎসাহিত করবে সেটাই তো স্বাভাবিক। চালকরা ভালো করেই জানে, তাদের শক্তিতে মন্ত্রী শাজাহান খান শক্তিমান, আর সে কারণে তিনি (মন্ত্রী) তাদের পক্ষালম্বন করবেন। অতএব, চালাও গাড়ী যেভাবে খুশী। সামনে যাই থাকুক গাড়ী চলবে।

এই শাহ্‌জাহান খানকে লক্ষ্য করে সরাসরি অভিযোগ এনেছেন এক সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, কামাল লোহানী। লোহানী ভাইয়ের সাথে তিন বছর একই চাঁদের নীচে কাজ করেছি। আশি দশকের শুরুতে। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে। অফিসের গাড়ী, সুজুকি মিনি মাইক্রোবাসে একসাথে বাসা থেকে অফিস যেতাম এবং অফিস শেষে বাসা। তিনি থাকতেন মতিঝিল এলাকায়, সরকারি ফ্ল্যাটে, আমি সবুজবাগ। মে দিবস উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রবীণ এই সাংবাদিক ও লেখক (৮৩) মন্ত্রী শাহজাহান খানের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘মন্ত্রী শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলেন, অথচ তিনি একজন মন্ত্রী। প্রশ্ন সেটি কী করে সম্ভব”? যখন অনেকে সড়ক দুর্ঘটনায় দোষী চালকের মৃত্যুদন্ড দাবী করছে, সে সময় এই মন্ত্রী তাদের (শ্রমিক) পক্ষ নিয়েছেন’’। দেশ জুড়ে চালকরা গাড়ি চালাচ্ছে বেপরোয়াভাবে। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অনুসন্ধান মতে, ৬১ শতাংশ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেই দায়ী থাকে গাড়িচালক। কামাল লোহানী বলেন, একজন মন্ত্রী এবং পাশাপাশি তিনিই শ্রমিক পরিবহন নেতা এই দুটি সাংঘর্ষিক। কামাল লোহানী আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেন, “তার মত সৌজন্যবিহীন ব্যক্তি কী করে ক্যাবিনেট মন্ত্রী হতে পারেন যখন আমরা স্বাধীনতার আলোকে একটি বাংলাদেশ গড়ার জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ’’। একই অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট নাট্যকার মামুনুর রশিদ, শাহজাহান খানের সমালোচনা করে সরকারের প্রতি আহবান জানান তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার জন্যে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত মুক্তিযোদ্ধা (কামাল লোহানী) অভিযোগ আনেন আর এক বহুল আলোচিত, বিতর্কিত, সমালোচিত রাজনীতিবিদ, নারায়ণগঞ্জের এম পি শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, “শামীম ওসমান বাস ড্রাইভার এবং পরিবহন শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেন এবং তা ব্যয় করেন তার নিজস্ব বাহিনীর জন্যে’’।

জনগণ জানেন কারা কী করছে, কারা কোন অপরাধের সাথে, কোন ঘটনার সাথে জড়িত, কিন্তু সবাই মুখে যেন কুলুপ এঁটেছেন। পাছে ‘কিছু’ হবে ভেবে। দেশে পরিবহন ক্ষেত্রে অনেক দিন ধরে নৈরাজ্য চলছে। সড়কপথে, নৌপথে ইচ্ছেমত চলছে বাস, ট্রাক, লঞ্চ। এদের কাছে সাধারণ যাত্রীরা জিম্মি হয়ে আছে বছরের পর বছর। প্রতি ঈদে আমরা দেখি কী অমানবিক ভোগান্তিই না হয় ঘরমুখো যাত্রীদের। প্রতি ঈদে লঞ্চ ডুববে, প্রাণহানি হবে, সড়ক পথে ঘটবে দুর্ঘটনা, হবে প্রাণহানি, কিন্তু কী চমৎকার আইনি ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োগ। অপরাধী চালক, কিংবা বাস বা লঞ্চ মালিক থেকে যাবেন আইনের বাইরে। চালক যদিও বা জেলে গেল, কদিন বাদে বেরিয়ে আসবে জেল থেকে। তাকে আটকিয়ে রাখে সে শক্তি কার? তার মালিক যে তার চাইতে শক্তিমান। ফলে চালক হয় বেপরোয়া। ঘটে মৃত্যু।

এক প্রতিবেদনে জানা যায়, রাজধানীতে ৬০ শতাংশ মালিক চালকের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে বাস চালায়। বিশ বছরের পুরনো বাসগুলোর বড় অংশই চুক্তিতে চলায় গাড়ি বেপরোয়া চলল কি না তা খেয়াল রাখেন না মালিকরা। মালিকের টার্গেট দিনের বা সপ্তাহের পাওনাটা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মতে, “পুরো সড়ক পরিবহন খাতে প্রশিক্ষণহীন, লাইসেন্সবিহীন চালকের আধিপত্য বাড়ছে। তাদের পেছনে আছেন শীর্ষ পরিবহন নেতারা। চাঁদা আদায়ের জন্য চালকদের ব্যবহার করে পরিবহন নেতা ও মালিকরা মুনাফা লুটে নিচ্ছেন। শ্রম আইনে চালকদের আট ঘণ্টা খাটানোর কথা থাকলেও দ্বিগুণ সময় পর্যন্ত খাটানো হচ্ছে, যাতে বেশি ট্রিপ দিয়ে বেশি লাভ ওঠে। এ জন্য চালকদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। কারণ নিয়োগপত্র থাকলে ন্যায্য অধিকার না পেলে চালকরা আদালতে যেতে পারবে, মালিক বা পরিবহন নেতাদের প্রভাব কমে যাবে’’। দেশের সড়কগুলোতে প্রাণহানি ও অঙ্গহানি বাড়ছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সর্বশেষ প্রতিবেদন মতে, গত ১ জানুয়ারি থেকে গেল সপ্তাহ পর্যন্ত চার মাসে এক হাজার ৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় দুই হাজার ১২৩ জন নিহত এবং পাঁচ হাজার ৫৫৮ জন আহত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালের একই সময়ে দুর্ঘটনা ১.০৬ শতাংশ, নিহত ১.৪৪ শতাংশ, আহত ৮.৩১ শতাংশ বেড়েছে। এই সংখ্যা আগামী দিনগুলোতে যে আরো ঊর্ধ্বমুখী হবে তা বলা বাহুল্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে কবে এই অরাজকতা রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেবে তা একমাত্র তারাই জানেন। আদৌ নেবে কি? (২০১৮)

x