হরেকরকম মিন্‌তি

মাহমুদ আলম সৈকত

মঙ্গলবার , ৯ জুলাই, ২০১৯ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ
33

দক্ষিণ আফ্রিকার নামিবিয়ার হিমবা আদিবাসীদের মধ্যে সন্তান জন্মদানের পর্বটি প্রায় মহাকাব্যিক! এই গোত্রে, অনাগত সন্তানের জন্মমুহূর্তটি নির্ধারিত হয়ে যায় একজন নারী যখন সন্তান জন্মদানের কথা ভাবেন তখনই। একটু খোলাসা করে বলি।
গোত্রের কোনো নারী সদস্য যখন সন্তান ধারণ করার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সে একটি গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ায় এবং গাছটিকে জড়িয়ে ধরে। জড়িয়ে থাকে ততক্ষণ, যতক্ষণ না তার অনাগত সন্তানের জন্য নির্ধারিত গানটি তার ভেতর অনুরণন তোলে, অনুভব করতে পারে। গানটি শোনার পর সেই নারী ফিরে আসে গ্রামে তার পছন্দসই পুরুষটির কাছে এবং তাকে মানে হবু বাবাকে ওই গানটি শেখায়। এবং শারীরিক মিলনের সময়ও উভয়ে সেই গানটি গেয়ে থাকে। নারীটি গর্ভবতী হলে সে ঠিক একই গান গ্রামের বৃদ্ধা এবং ধাই মা-দেরও শিখিয়ে দেয়। যাতে করে সন্তান জন্মদানের মুহুর্তটিতে তারা সেই গানটি গাইতে পারে। শিশুটি বেড়ে উঠতে থাকলে, এবার গ্রামবাসীরাও গানটি শিখতে এবং গাইতে শুরু করে। ফলে যখনই শিশুটি পড়ে গিয়ে আঘাত পায় বা অন্য কোনো কারনে ব্যথাক্রান্ত হয় তখনই গ্রামবাসীরা সেই শিশুটির জন্য নির্ধারিত গানটি গাইতে থাকে। আবার সন্তানটির কোনো সাফল্যে বা অবাক করা কান্ডেও গ্রামবাসীরা একই গান গায়। এখানেই শেষ নয়! জীবনে কখনো যদি সেই মানুষটি কোনো অপরাধমূলক কাজ করে তার পাপ মোচনে বা প্রেমে আহ্বান জানাতে, বিয়ের আসরে এমনকি মৃত্যুশয্যায় মৃত্যু যন্ত্রণা লাঘবে সেই একই গান ব্যবহৃত হয়।
যা-ই হোক, কথা হচ্ছিল সন্তান জন্মদানের আচার-অনুষ্ঠান বিষয়ে। এসকল আচার-অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে অনাগত সন্তান এবং গর্ভবতী মায়ের মঙ্গল কামনা। আমাদের দেশে সন্তান ধারণ থেকে শুরু করে সন্তান জন্মদান পর্ব এবং বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় বহু আচার-অনুষ্ঠানের প্রচলন আছে। যার কিছু কল্পিত বা মিথিক্যাল, কিছু কিছু হয়তো ব্যবহারিক কারণে আজও পালিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এমন আচারের প্রচলন ছিলো এবং ক্ষেত্র বিশেষে চালু আছেও। যেসব আচার-অনুষ্ঠানের বেশিরভাগই আমাদের কাছে মনগড়া বা কল্পিত মনে হবে। কিংবা স্রেফ হাস্যরসের খোরাক হবে। কিন্তু এ-র একটিও আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না। কারণ এ-সবই বহু বহু বছরের সামাজিক চর্চার অংশ। পাঠক চলুন তেমনই কিছু রীতির কথা জেনে নিই।
চীনদেশে এ-বিষয়ক প্রচুর মিথ, অসংখ্য অভ্যাস-আচার চালু রয়েছে। গর্ভধারণ প্রক্রিয়া সফল হওয়ার জন্য সন্তান কামনা করা দম্পতিরা একটি অদ্ভূত কাজ করে। গৃহ প্রবেশের দরজায় আগুন জ্বালিয়ে, স্বামীপ্রবরটি স্ত্রীকে কোলে তুলে সেই আগুন অতিক্রম করে ঘরে প্রবেশ করবে। মনে করা হয় এই অগ্নিস্নানে সূচি হয়ে ওঠে গর্ভাশয়। এছাড়াও গর্ভাবস্থায় ভাল ভাল সাহিত্য পড়ার ফলে অনাগত শিশুর উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে মনে করা হয়। অপরদিকে এ-সময় গর্ভবতীকে জোরে জোরে হাসতে বারণ করা হয়। মজার একটি ধারণার কথা বলি। মনে করা হয়, গর্ভবতী মহিলারা যেসকল সবজি খেয়ে থাকেন বা সবচে বেশি যে-পদ টি খান, গর্ভের শিশুর চেহারায়ও নাকী সেটির প্রভাব পড়ে! আবার গর্ভবতী মহিলাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখা হয়, চাই সে যতো আপনজনই হোক না কেন। চীনে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে বাড়িতে গর্ভবতী মহিলা আছে সেটিতে কোন প্রকার নির্মাণকাজ করা উচিৎ নয়। অপরদিকে মন্দ আত্মার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গর্ভবতী নারীর বিছানায় তক্তপোষের নিচে ছুরি রেখে ঘুমানোর রেওয়াজ আছে।
জাপানের লোকেরা বিশ্বাস করে যে একজন গর্ভবতী মহিলা কড়া মসলাযুক্ত বা নোনা খাবার এবং কাঁচা মাছ খাওয়ানো ঠিক নয়। পাশপাশি শিশুর শরীরে জন্মদাগ এড়ানোর জন্য গর্ভাবস্থায় প্রসূতি মা-কে আগুনের দিকে তাকানোর জন্য নিষেধ করা হয়। মঙ্গোলিয়রা বিশ্বাস করে দুজন গর্ভবতী মহিলার মধ্যে সাক্ষাৎ হলেও একে অন্যকে স্পর্শ করা উচিত নয়। তাদের বিশ্বাস এতে করে অনাগত শিশুটির লিঙ্গ পরিবর্তিত হতে পারে! অন্যদিকে মন্দ আত্মাকে বিভ্রান্ত করতে শিশুর তিন মাস বয়েস পর্যন্ত, ক্ষেত্রবিশেষে এক বছর বয়েস পর্যন্ত তার লিঙ্গ পরিচায়ক কোনো শব্দ ব্যবহার করে না মঙ্গোলিয় বাবা-মা। কেনিয়ার আকাম্বা আদিবাসীরা বিশ্বাস করেন গর্ভবতী মহিলাদের মৃতদেহ দেখাটা অমঙ্গলজনক কারণ মৃত মানুষটির অত্মা গর্ভবস্থাকে বিপন্ন করে তুলবে। পাশপাশি গর্ভবস্থায় সঙ্গম করাটা এই গোত্রে অনুমোদিত নয়। তারা মনে করে গর্ভাবস্থায় সঙ্গমে লিপ্ত হলে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম হতে পারে। একসময় রাশিয়ার লোকেরা বিশ্বাস করত যে, গর্ভধারণের পর স্বামী-স্ত্রী তাদের আগের প্রেমিক-প্রেমিকাদের নাম বললেই অনাগত সন্তানের জন্ম প্রক্রিয়া সহজ হবে! মানে বুঝতেই পারছেন স্বামী-স্ত্রী একে অপররের প্রতি সৎ থাকাটা মোটের ওপর ভালই। প্রথমবার মা হচ্ছেন এমন সব গর্ভবতীই চান প্রথম শিশুটির জন্ম সহজ-স্বাভাবিক হোক। আর তাই বিয়ের দিন প্রচুর বৃষ্টিপাতের জন্য প্রার্থনা করেন মাল্টা’র নারীরা। তাদের বিশ্বাস বিয়ের দিন বৃষ্টিপাত হলে শিশুর জন্মদান প্রক্রিয়াটি সহজ হবে। সেজন্য প্রচুর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে বা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে বিয়ের চল আছে মাল্টায়। উত্তর স্কটল্যান্ডের ওরকনি দ্বীপপুঞ্জ অধিবাসীরা মনে করেন, দিগন্তে দেখা দেওয়া রংধনু যদি কারোর বাড়ির ছাদ স্পর্শ করে এবং সেই বাড়িতে যদি গর্ভবতী নারী থাকে তাহলে তার গর্ভের সন্তানটি হবে ছেলে সন্তান। পর্তুগালে আজও একটি বিশ্বাস চালু আছে যে বিড়াল বা কুকুরের মতো পোষা প্রাণীর সংস্পর্শ থেকে গর্ভবতী মহিলাদের দূরে রাখা উচিত। লোমশ শিশুর জন্মদান এড়াতেই এমন ভাবনার উদয়! ফল-ফলাদি বা সবজির আকৃতির সঙ্গে শিশুর লৈঙ্গিক পরিচয়ের সম্পর্ক কি! পর্তুগালের লোকেরা বিশ্বাস করে কোনো নারী যদি চায় যে গর্ভের শিশুটি মেয়ে হোক তাহলে তাকে বেশি বেশি গোলাকার ফল বা সবজি খেতে হবে। আর যদি তিনি ছেলে সন্তান পেতে চান তাহলে গাজর বা শশার মতো লম্বা আকারের সবজি খেতে হবে।

x