হরিশংকর জলদাসের অন্তরঙ্গকথা

মহি মুহাম্মদ

শুক্রবার , ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৪৮ পূর্বাহ্ণ
360

বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এক জেলেপল্লি। চট্টগ্রামের উত্তর পতেংগা। এখানেই ১৯৫৫ সালের ১২ অক্টোবর হরিশংকর জলদাস জন্মগ্রহণ করেন। নিজের ভাগ্যকে গড়তে তিনি এই গ্রাম থেকেই পথ চলতে শুরু করেন। শত বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে তিনি একটু একটু করে এগিয়ে গিয়েছেন। জেলেসমাজের অন্ধকার ঘুপচিতে আলোর চাষাবাদ করেছেন। লোকসমাজের নানা অবজ্ঞা সহ্য করে নিজেকে তুলে এনেছেন আলোকিত মানুষের কাতারে। নিজেকে সমুদ্রগামী জেলে হিসেবে দেখতে চাননি তিনি। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-জলে ভিজে তিনি পরশপাথর খুঁজে বেড়িয়েছেন। শিক্ষকতা পেশা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চেয়েছেন। নানা অপমানে জর্জরিত হয়েও তিনি থেমে যাননি। তাঁর পথচলা থেমে যায়নি। তিনি নিজের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। বর্ণীয় সমাজের প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে তিনি খরস্রোতা নদীর উল্টো স্রোতে দাঁড় বেয়েছেন। নিজের যোগ্য আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন।
এ সমাজের অসংগতি তাঁর সাহিত্যে উঠে এসেছে। সমাজের ভদ্রলোকনামধারী ভণ্ডদের মুখোশ তিনি উন্মোচন করেছেন। সাতচল্লিশ বছর বয়সে তিনি লিখতে শুরু করেন। তিপ্পান্ন বছর বয়সে এসে লিখলেন প্রথম উপন্যাস জলপুত্র। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রথম উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৬) লিখেছিলেন বাইশ বছর বয়সে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস একটি নদীর নাম লিখেছেন তেতাল্লিশ বছর বয়সে।
প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে। প্রবন্ধ দিয়ে শুরু করেছিলেন। তারপর গল্প ও উপন্যাসে হাতেখড়ি। প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। পারিবারিক অভাবের কারণে কিশোর বয়সে বাবার সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা শুরু করেছেন হরিশংকর। স্বল্পশিক্ষিত বাবা যুধিষ্ঠির জলদাস পড়াশোনা করার আগ্রহটি জাগিয়ে রেখেছিলেন। মূলত তিনি বাবা আর ঠাকুরমা পরানেশ্বরী দেবীর অনুপ্রেরণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকাতে পেরেছিলেন। যুবক বয়সেও তিনি সমুদ্রে মাছ ধরেছেন। টেনেছেন নৌকার দাঁড়। সরকারি কলেজে অধ্যাপনার সুযোগে বাংলা সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর সমস্ত ভাবনাজুড়ে ছিল নদী-জল-মাটি আর সমুদ্রকূলের ওই কৈবর্তসমাজ। তাই কৈবর্ত নামক ব্রাত্য প্রান্তজনদের জীবনচর্যা, তাদের বিকাশ-বিদ্রোহ, তাদের হাহাকার-প্রাপ্তির ইতিহাস লিখে যাচ্ছেন তিনি। জেলেদের উৎপত্তি, বিকাশ ও পরিণতি নিয়ে একটি অভিসন্দর্ভও রচনা করেন। ‘নদীভিত্তিক বাংলা উপন্যাস ও কৈবর্তজনজীবন’। বিষয়টি তাঁর পিএইচডির অভিসন্দর্ভ। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় জুন, ২০০৮ সালে।
দলিত প্রান্তজনের জীবনচিত্র হরিশংকরের কথাসাহিত্যের প্রধান অনুষঙ্গ। বিষয়ভেদে তাঁর উপন্যাসের ভাষা ও চারিত্র্য পাল্টে যায়। তিনি তাঁর উপন্যাসে শুধু কাহিনি লেখেন না, সমাজকেও লেখেন। শুধুমাত্র জেলেজীবন নয়, তাঁর গল্পের চরিত্ররা নানা পেশা থেকে উঠে এসেছে। কখনো তারা সমাজের নিচু স্তরের জেলে, চাষী, আবার কখনো শিক্ষক, গৃহিণী, দোকানদার, শিক্ষিতজন, কিংবা সমাজের মান্যগণ্য কেউ। তাদের মনের সংগুপ্ত কিংবা তাদের প্রাত্যহিক আচার-আচরণের নিটোল বর্ণনা তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর গল্পে। হরিশংকর আমাদের আটপৌঢ়ে জীবনের গল্প শুনিয়েছেন। তাঁর গল্প খেটে-খাওয়া মানুষের স্বপ্ন ভাঙার ইতিহাস। তাঁর গল্প বঞ্চিতজনের সংগ্রামের ইতিহাস। তাই হরিশংকর জলদাসের গল্পগুলো আমাদের ভাবায়। মনে দাগ কাটে, আমাদের অনুভূতিশীল মনকে জাগ্রত করে। তাঁর গল্প আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় নদ-নদী,সমুদ্রের উপকূলে বসবাসকারী মানুষের জীবনব্যাখ্যান ও তাদের প্রাত্যহিক জীবনের টানাপড়েনের নানা ঘটনার সঙ্গে। সেই ঘটনার অন্তরালে মানবিক-অমানবিক ঘটনায় জর্জরিত পাত্র-পাত্রীদের জন্য আমাদের মনে জেগে ওঠে মমতা, জন্ম নেয় দুর্মর ভালো লাগা। শুধু তাই নয় – জাগে ঘৃণা কিংবা বিবমিষাও। তারই ভেতর থেকে কখনো কখনো জেগে ওঠে সমবেদনা। সেই বেদনার রং কখনো শাদা, কখনো বা কালো। প্রান্তিক মানুষের জীবনশিল্পী হরিশংকর গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তুলে এনেছেন সমাজের এবং সমাজমানুষের ছবির পর ছবি। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো হল – জলদাসীর গল্প (২০১১), লুচ্চা (২০১২), হরকিশোরবাবু (২০১৪), কোনো এক চন্দ্রাবতী (২০১৫), মাকাল লতা (২০১৫), চিত্তরঞ্জন অথবা যযাতির বৃত্তান্ত (২০১৬), কাঙাল (২০১৬)। এছাড়াও তার মোট ৩৯ টি গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে – গল্পসমগ্র-১ (২০১৬)
বিষয়ভিত্তিক উপন্যাস রচনায় খ্যাতি লাভ করেছেন হরিশংকর জলদাস। তাঁর উপন্যাসগুলো নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। প্রথম উপন্যাস জলপুত্র প্রকাশিত হবার পর পরই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ঔপন্যাসিক।
উপন্যাস হরিশংকর জলদাসকে এনে দিয়েছে যশ ও পুরস্কার। আগেই বলেছি হরিশংকর জন্মেছেন জেলেপল্লিতে। জেলেজীবন দেখেছেন, দেখেছেন সেই সমাজকে। বহদ্দারদের শোষণ দেখেছেন, দাদনদারদের নিষ্পেষণ দেখেছেন। দেখেছেন জাতপাতের ভেদাভেদ। তাই তাঁর হাতে বিষয়ভিত্তিক উপন্যাসসমূহ এক বিশেষ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। দলিত সমাজের প্রতিনিধি হয়ে তিনি অংকন করেছেন দলিত সমাজের সেইসব ভাঙাচোরা মানুষগুলোর জীবনচিত্র। তাদের চিত্র আঁকতে গিয়ে তিনি এঁকেছেন সেই সব মানুষের না-বলা কষ্টের নোনাজল-মিশ্রিত ব্যথাময় দীর্ঘশ্বাসকে। তাঁর উপন্যাসগুলো তাই সাধারণ মানুষের আখ্যানে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত তাঁর উপন্যাসগুলোর প্রতিটি পাঁচেরও অধিক মুদ্রণ হয়েছে। দিন দিন তাঁর উপন্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাঠকের মনের কথাটি লেখেন বলেই পাঠক তাঁর রচিত আখ্যানের বিপুল অনুরাগী।
তাঁর উপন্যাসগুলো হল – জলপুত্র(২০০৮), দহনকাল (২০০৯), কসবি (২০১১), রামগোলাম (২০১২), মোহনা (২০১৩), হৃদয়নদী (২০১৩) আমি মৃণালিনী নই (২০১৪) প্রতিদ্বন্দ্বী (২০১৪) এখন তুমি কেমন আছ, (২০১৫) সেই আমি নই আমি (২০১৬) একলব্য (২০১৬), অর্ক (২০১৭), রঙ্গশালা (২০১৭) ও ইরাবতী (২০১৭)।

তাঁর রচিত উপন্যাসসমূহকে আমরা দুইভাগে ভাগ করতে পারি। বিষয়ভিত্তিক উপন্যাস ও মধ্যবিত্ত জীবনের আখ্যানভিত্তিক উপন্যাস।
বিষয়ভিত্তিক উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে-জলপুত্র, দহনকাল, কসবি, রামগোলাম, মোহনা, আমি মৃণালিনী নই, সেই আমি নই আমি, একলব্য, রঙ্গশালা । আর মধ্যবিত্ত জীবনের আখ্যান হল – হৃদয়নদী, প্রতিদ্বন্দ্বী , এখন তুমি কেমন আছ, ইরাবতী ও অর্ক।
তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ হল – কবিতা এবং ধীবর জীবনকথা (২০০১), কবি অদ্বৈত মল্লবর্মণ এবং (২০০২), বিনয়বাঁশী (২০০৪), ‘জীবনানন্দ ও তাঁর কাল’ (২০০৫), কৈবর্তকথা (২০০৯), নিজের সঙ্গে দেখা (২০১২), বাংলা সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গ (২০১১), আমার কর্ণফুলী (২০১৬) ও জলগদ্য (২০১৭)।
কথাসাহিত্যে ব্যতিক্রমী হাওয়া নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন তিনি। এ পর্যন্ত তিনি সাহিত্যে যেসব পুরস্কার পেয়েছেন, তা হল – ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’ (২০১৩) জলপুত্র, ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার’ (২০১০) দহনকাল, ‘সিটি আনন্দ আলো পুরস্কার’ (২০১২), ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন সম্মাননা পদক’ (২০১২) রামগোলাম, ‘ব্র্যাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কার’(২০১৪) প্রতিদ্বন্দ্বী, বিশালবাংলা প্রকাশন সাহিত্য পুরস্কার (২০১৬) একলব্য। কথাসাহিত্যে সার্বিক অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘অবসর সাহিত্য পুরস্কার’ (২০১১), ‘ড. রশীদ আল ফারুকী সাহিত্য পুরস্কার’ (২০১১)।
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ২০১২ সালে। আর ২০১৯-এ এসে ভাষা ও সাহিত্যে পেলেন একুশে পদক।
পাঠকদের জন্য ‘হরিশংকর জলদাসের অন্তরঙ্গকথা’ গ্রন্থ থেকে কয়েকটি প্রশ্নোত্তর।
মহি মুহাম্মদ: শুরুতেই জানতে চাইছি, আপনার জন্ম সাল কোনটি?
হরিশংহর জলদাস : এতদিন জানতাম – ১৯৫৫ সালের ১২-ই অক্টোবর আমি জন্মেছি। কিন্তু বছর খানেক আগে আমার স্ত্রী আমার জন্মসালটা পাল্টে দিল। শুনতে আপনার অবাক লাগছে হয়তো – স্ত্রী আবার স্বামীর জন্মসাল পাল্টে দেয় কী করে? তাহলে কাহিনিটা বলতে হয় আপনাকে। জন্মের পর বাবা যুধিষ্ঠির তার ছেলেদের কুষ্ঠি তৈরি করিয়ে রাখত গণকঠাকুরকে দিয়ে। আমার জন্মের আগে যুধিষ্ঠির-শুকতারা দম্পতির দু’দুটো সন্তান মারা যায়। বাবা তাদের জন্মকুষ্ঠি করিয়েছিলেন কিনা জানি না। কিন্তু আমারটা করিয়েছিল। কুষ্ঠি হল লম্বাটে সেই কাগজ যেখানে নানা দেবদেবীর ছবি আঁকা থাকে, রাশি-নক্ষত্রের অবস্থানের নানা আঁকিবুকি থাকে। আর থাকে নবজাতকের জন্মতারিখ ও জন্মমুহূর্তের বিবরণ। জাতক মোটামুটি কবছর বাঁচবে, বিয়ে কয়টি করবে, সন্তানাদি কতজন হবে -এসবেরও বিবরণ থাকে। তো সেরকম আমারও একটা কুষ্ঠি ছিল। জেলেপরিবার, এসব কাগজের গোছগাছের তেমন ঠিক ঠিকানা নেই। বাবা জমির দলিল দস্তাবেজ আর সন্তানের কুষ্ঠির কাগজ গুেেলা দরামোচড়া করে রাখত। স্যাঁতস্যাঁতে পাড়া আমাদের। কথায় বন্যা – জলোচ্ছ্বাস। এসবের মধ্যে পড়ে আমার কুষ্ঠিটি কোথায় হারিয়ে গেল। হাইস্কুলের হেডমাস্টার নাইনের রেজিস্ট্রশনের সময় যা লিখলেন, তাই আমার জন্ম তারিখ হল। এই কিছুদিন আগে ঢাঁই করা অনেক কাগজের মধ্যে আমার স্ত্রী সুনীতা আমার জন্মকুষ্ঠিটি খুঁজে পেল। তাতে দেখা গেল আমার এ কৃতজন্ম তারিখ ৪ মে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ।
মহি মুহাম্মদ : সমুদ্রভিত্তিক জেলেদের নিয়ে উপন্যাস জলপুত্র প্রকাশিত হবার পর ঠিক একই সমান্তরালের আরেকটি দহনকাল নামের উপন্যাস লেখার প্রয়োজন অনুভব করলেন কেন?
হরিশংকর জলদাস: জলপুত্র আর দহনকালের কাহিনি সমান্তরাল নয়, জলপুত্রের পরবর্তী কাহিনি হল দহনকালের কাহিনি। আসলে একটা ট্রিলজি লেখবার পরিকল্পনা আছে আমার। জলপুত্র আর দহনকাল নামের দুটো অংশ লেখা হল। শেষটার প্রস্তুতি নিচ্ছি আমি। জলপুত্রে জেলেদের স্বপ্নবিভোরতার কথা আছে। গঙ্গাপদের মাধ্যমে সে-স্বপ্ন অবয়ব পেতে যাচ্ছিল। সে অবয়বকে ভেঙেচুরে একাকার করে দিয়েছে। হত্যা করা হয়েছে গঙ্গাপদকে। কিন্তু উপন্যাসের স্বপ্ন সেখানে থেমে যায় নি। বনমালীকে দিয়ে অধিকার পূরণের আর আত্মবিস্তারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে জেলেরা। সেই স্বপ্নেরই বিস্তার লক্ষ্য করা যায় দহনকালে। বনমালীই যেন হরিদাস হয়ে উত্তর পতেংগার জেলেসমাজে ফিরে এসেছে। গঙ্গাপদরা উঠে এসেছে জলভাগ থেকে স্থলভাগে। স্থলভাগে জেলেদের অন্যরকম সংগ্রাম। জলের সংগ্রামের চেয়ে স্থলের সংগ্রাম আরো কঠিন, আরো রূঢ়। হরিদাস এবং তার সমাজের মধ্যে সংগ্রামময় রূঢ়তাকে অতিক্রমের প্রবল ইচ্ছাকে স্পষ্ট করা হয়েছে দহনকালে। তাই বলছিলাম জলপুত্র ও দহনকালের কাহিনির সমান্তরাল নয়, বরং বলা যায় – দহনকাল, জলপুত্রের পরবর্তী কাহিনি।
মহি মুহাম্মদ : জেলেপল্লির মাটি কালো, মানুষগুলোও কালো। এতে করে তাদের সমাজের ওপর কোনো মনস্তাত্ত্বিক চাপ আছে কিনা -আপনি কী মনে করেন?
হরিশংকর জলদাস : জেলেপল্লির মাটি কালো হবার একটা কারণ তো আছে। সমাজে এরা ব্রাত্য। অপাঙ্‌ক্তেয় জীবন তাদের। সেই আদিকাল থেকে, সমাজ যখন বর্ণবাদী মানুষের শাসনের অধীনে চলে এল, বসবাসের জায়গাটাও সমাজপতিরা ঠিক করে দিল। উচ্চবর্গীয়দের জন্য নির্ধারিত হল গ্রামের উঁচু পরিচ্ছন্ন জায়গাগুলো। আর মেথর, মুচি, ধোপা, জেলে এদের ঠেলে দেওয়া হল কর্দমাক্ত, ময়লাছয়লা নিচু ভূমিগুলোতে। জেলেদের বলা হল, তোরা তো মাছ ধরিস, তোরা ওই সমুদ্র বা নদী পাড়ে থাক গিয়া। জাল নিয়ে জলে যেতে সুবিধে হবে। তাদের থাকতে দেওয়া হল জঙ্গলাকীর্ণ, স্যাঁতস্যাঁতে ভূমিগুলোতে। এই ভূমিতে ঈশ্বর যেমন যান না, সূর্যও কার্পণ্য করেন আলো দিতে। নিচু জলা ভূমির কারণে জেলেপল্লির মাটি স্বভাবতই কালো হয়।
আর জেলেমানুষরা কেন কালো! তারও একটা ব্যাখ্যা আছে। জেলেরা দ্রাবিড় শ্রেণির। দ্রাবিড়রা আদি অধিবাসী এদেশের। দ্রাবিড়দের মাথা বড়, বৃহৎ স্কন্ধ, মাঝারি হাইট, চওড়া বুক, পেশিবহুল শরীর আর গায়ের রং কালো। আদি পুরুষ দ্রাবিড়দের শারীরিক গঠন ও রং বহন করছে জেলেরা। অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিয়েরও কড়াকড়ি জেলেদের মধ্যে। সুতরাং শারীরিক শ্রীযুক্ত কোনো সমপ্রদায়ের সঙ্গে তাদের কোনো বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপিত হয় না। এই কারণেই জেলেরা আবহমান কাল থেকে কালো থেকে গেছে।
মহি মুহাম্মদ : রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীকে নিয়ে আপনার একটা উপন্যাস আছে – আমি মৃণালিনী নই । উপন্যাস কি ভেবে লিখলেন?
হরিশংকর জলদাস : রবীন্দ্রনাথকে তেমন করে পড়া হয়নি, পড়েছি বিএ, এমএ পাস করার জন্য। ছিন্নপত্রাবলী পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে মৃণালিনী দেবী কই। কতজনের কথা আছে, তেমন করে ভবতারিণীর কথা নেই কেন? খোঁজ নিয়ে জানলাম – ভবতারিণীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠির সংখ্যাও খুব অল্প। তাহলে রবীন্দ্রনাথের কাছে মৃণালিনী অবহেলিত? এই প্রশ্ন থেকে নতুন করে রবীন্দ্রনাথকে পড়া শুরু। একটা সময়ে আমার মনে হল – মৃণালিনীকে নিয়ে একটা উপন্যাস লেখা যায়। যে মেয়েটি দাম্পত্যজীবনের প্রারম্ভে পিতৃদত্ত নাম হারিয়ে ফেললেন, যে নামটি স্বামী দিলেন, তারও কোনো মূল্যায়ন হল না, তাঁকে নিয়ে তো উপন্যাস লেখা যায়। আত্মজীবনী ঢঙে উপন্যাসটা লিখলাম। পাঠকরা সাগ্রহে বইটা নিলেন। এখন বাজারে পঞ্চম কী ষষ্ঠ মুদ্রণ। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন – সত্যিই কি ভবতারিণী তার আত্মজীবনীটি লিখে গিয়েছিলেন? কোত্থেকে খুঁজে পেয়েছেন আমি মৃণালিনী নই-এর পাণ্ডুলিপিটি?
মহি মুহাম্মদ : আমি মৃণালিনী নই – এই সাহসী উচ্চারণের ভেতর দিয়ে আপনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন?
হরিশংকর জলদাস : মৃণালিনীর পিতৃদত্ত নাম ভবতারিণী। বিয়ের পরপরই রবীন্দ্রনাথ তার স্ত্রীর নাম পাল্টে দিলেন। নতুন নাম রাখলেন মৃণালিনী। কিন্তু গোটা বৈবাহিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ ভবতারিণীকে মৃণালিনী নামে সম্বোধন করেননি, কখনো। অন্তত চিঠিপত্রে। ছোটবউ, ছুটি ইত্যাদি সম্বোধন করে চিঠি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রীকে। এজন্য এবং আরও অন্যান্য কারণে ভবতারিণীর মধ্যে একটা ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। সৃষ্টি হয়েছিলও। এই ক্ষোভ বা বেদনার ব্যাপারটি মনে রেখে মৃণালিনী সম্পর্কে যখন লিখতে বসলাম এ রকম নামই পছন্দ হল আমার। গ্রন্থনামের মধ্যে একটা দ্রোহ আছে।
মহি মুহাম্মদ : লেখায় আপনি কোন বিষয়টিকে সবচাইতে গুরুত্ব দেন, অর্থাৎ বিষয়, কাহিনি নাকি প্রকরণ?
হরিশংকর জলদাস : কাহিনিকে বেশি প্রাধান্য দিই আমি। মানুষ গল্প বা উপন্যাস পড়ে কাহিনি জানার জন্য। সিনেমা বা নাটক দেখে কাহিনি দেখবার জন্য। সুতরাং কাহিনিই গল্প-উপন্যাসের প্রাণ বলে আমি মনে করি। এজন্যে প্রকরণের চেয়ে কাহিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে। আর বিষয় তো একটা উপন্যাসের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। বিষয়কে অবলম্বন করে কাহিনি বিস্তার লাভ করতে থাকে। বিষয় ও কাহিনি জড়াজড়ি করে থাকে উপন্যাসে। আর অনেক কথাকার তাদের লেখায় প্রকরণকে নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। আমি এখনো প্রকরণের ব্যাপারে মনোনিবেশ করিনি।
মহি মুহাম্মদ : আগে নিজের ভিত রচনা না করে অনেক তরুণ কমলকুমার মজুমদার হতে চায়। সহজ বাংলায় বলা চলে কমলকুমারের গদ্যে তারা প্রভাবিত হয়ে নিজেদের গদ্যের বারোটা বাজায়- এ প্রসঙ্গে আপনার অভিমত কী?
হরিশংকর জলদাস : কিছু সাহিত্যিক আছেন অনুকরণীয় আর কিছু সাহিত্যিক আছেন অননুকরণীয়। গাছের ডাব আর চাঁদ যেমন। ডাব হস্তগতযোগ্য। কিন্তু চাঁদ দূরের বস্তু। তার আলোতে শুধু বিমুগ্ধ হওয়া যায়। কমলকুমার চাঁদ যেমন, চাঁদের আলো যেমন। কমলকুমারকে পাঠ করা শ্রমসাধ্য – একথা বরণীয় অনেক সাহিত্যিক বলে গেছেন। কিন্তু কমলকুমারের সাহিত্য যে উপভোগের সে কথা বলতে ভোলেননি তাঁরা।
কমলকুমার হতে চাইলেই বিপদ। নিষ্ফলতা সেখানে শতভাগ। কেউ কেউ কমলকুমারের মতো করে সাহিত্য রচনা করতে চান বটে, কিন্তু হতে পারেন কতটুকু সে প্রমাণ তো পাঠকের হাতে হাতে। প্রত্যেক মানুষের আলাদা সত্তা। লেখকদের তা-ই। কোনো লেখক কেন আর একজন লেখকের মধ্যে নিজসত্তাকে বিলিয়ে দেবেন? দেওয়া উচিত নয়।

মহি মুহাম্মদ : অনেক তরুণ লেখকের গল্পের চাইতে, গদ্যের দিকে ঝোঁক বেশি। যার মানে গদ্যের আড়ালে বিষয়টা চাপা পড়ে। আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে এটাকে বিচার করুন।
হরিশংকর জলদাস : একটি গল্পের প্রধান শর্ত হল-সেখানে গল্প থাকতে হবে। গল্পকে বিস্তার করতে হলে চা-ই গদ্য। কারো কারো গল্পে গল্প থাকে না, থাকে গদ্য। পাঠক গদ্য চায় না, গল্প চায়। আমি বলি – গদ্যের ভঙ্গি কাঠামো – এগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র হল প্রবন্ধ। কথাসাহিত্য নয়। কথাসাহিত্যে থাকবে সহজ সরল গদ্য, যা পাঠক পড়ে আরাম পাবেন। স্বস্তি পাবেন। গদ্যের ভঙ্গিটাই যদি গল্প রসকে খেয়ে বসে, তাহলে পাঠক বঞ্চিত হন।

[নির্বাচিত অংশ, হরিশংকর জলদাসের অন্তরঙ্গকথা, মহি মুহাম্মদ, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা]

x