হরিজন ও শ্রমিকদের স্বল্প আয়ুর জীবন সুরক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে

সোমবার , ২৭ মে, ২০১৯ at ৪:১০ পূর্বাহ্ণ
55

সুরক্ষা উপকরণের অপ্রতুলতা। থাকলেও পরিধানে অনীহা। গ্লাভস, মাস্ক, বুট ছাড়াই নিরন্তর বর্জ্য অপসারণের ফলে সহজেই লিভার, ফুসফুসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) হরিজন সম্প্রদায়ের সেবকেরা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস ও পুষ্টির অভাব অসুস্থতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা না পাওয়ায় অকালেই মারা যাচ্ছেন এ সম্প্রদায়ের মানুষ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সংস্থাপন বিভাগ ও হরিজন সম্প্রদায়ের দেওয়া তথ্যমতে ২০১৬ সালের জুন থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সংস্থায় সেবক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় মারা গেছেন ৪৬ জন। এর মধ্যে ২০জন হরিজন সম্প্রদায়ের। তাদের অধিকাংশই মারা গেছেন চাকরির মেয়াদ পূর্তির আগেই, যাদের গড় বয়স ৪৫ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে মারা যাওয়ার তথ্যও আছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কার্যালয়ের খানিক দূরেই ঝাউতলা হরিজন কলোনি। এ কলোনির জনৈক বাসিন্দা মারা যান গত ১৫ এপ্রিল। লিভারের জটিল রোগে আক্রান্ত এ ব্যক্তির মৃত্যু হয় মাত্র ২৭ বছর বয়সে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ডোর টু-ডোরের অস্থায়ী সেবক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। পত্রিকান্তরে গত ২৪ মে এখবর প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে এবং বাড়ছে। এতে আমাদের তৃপ্তির সীমা নেই। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রও যে আছে সে খবর আমরা ক’জনেই বা রাখি? গত ২৪ মে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত উপরোক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে সেবক হিসেবে কর্মরত হরিজন সম্প্রদায়ের অনেকেই চাকরির মেয়াদ পূর্তির আগেই মারা যাচ্ছেন। যাদের গড় বয়স ৪৫ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন, বর্জ্য অপসারণে সুরক্ষা ব্যবস্থা না নেওয়া ও অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন এর অন্যতম কারণ। কেবল চসিকের হরিজন সেবকরা নয়, জাহাজ ভাঙা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদেরও গড় আয়ু কম। এছাড়াও ট্যানারি, ব্যাটারি কারখানাসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকদের ও গড় আয়ু কম। অধিকাংশ সেবকই গ্লাভস্‌্‌-মাস্ক পরতে চান না। বর্জ্য অপসারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সনাতনী পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। ফলে কর্মরত থাকা অবস্থায় অনেকে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ব্যয়বহুল হওয়ায় বাইরে চিকিৎসা নিতে না পারাই হরিজন সম্প্রদায়ের অনেক সেবক অবসরে যাওয়ার আগেই মারা যাচ্ছেন। চামড়া খাতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কারখানাগুলো যখন ঢাকার হাজারীবাগে ছিল, তখনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, যা দশকের পর দশক শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর ছিল। অথচ এ শিল্পের কারণে নদী দূষণে সবাই ছিল উদ্বিগ্ন এবং নদীকে দূষণ থেকে রক্ষা করতে ২০১৭ সালে যখন এ শিল্প সাভারে নেওয়া হয়, তখনো কারখানার মালিক, সরকার ও কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর কেউ এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি, যাতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়। সাভারেও দেখা গেছে শ্রমিকদের জন্য পানির ব্যবস্থা অন্যান্য জরুরি স্বাস্থ্য সুবিধার ব্যবস্থা অতি নগণ্য। বাংলাদেশের শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এক ক্ষেত্র হলো জাহাজ ভাঙা শিল্প। বাংলাদেশে স্থানীয় বাজারে রড ও ইস্পাতের চাহিদা মেটায় এ শিল্প। ২০১৬ সালে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭০ বছর হলেও জাহাজ ভাঙা শ্রমিকদের আয়ু ৪০-এ এসে দাঁড়িয়েছে। নরওয়েভিত্তিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে।
বাংলাদেশ এখনো কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২২ টি কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, সরকার শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে উদাসীন। অনেক শিল্পেই শ্রমিকরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্রমনিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত শ্রম অধিদপ্তরসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষ চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে যে শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ে, সেদিকেও কারো খেয়াল নেই। শ্রমিকেরা একদিকে চরম নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশে কাজ করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে জীবনধারার জন্য ন্যূনতম মজুরিও তারা পাচ্ছেন না। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা বেশি হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে-এমন কারণগুলো অবিলম্বে চিহ্নিত করে সেগুলো প্রতিরোধের নীতি গ্রহণ করা দরকার। শ্রমিকদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামাদি যেমন হেলমেট, মেটাল হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক, গামবুট, আই প্রটেকশন গ্লাস, ইয়ার প্লাস, ফায়ার জ্যাকেট ইত্যাদি সরবরাহ করতে হবে। কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে তদারকি জোরদার করা আবশ্যক। এছাড়া কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তার জন্য যদি মালিক পক্ষের অবহেলা বা উদাসীনতা প্রমাণিত হয়, তাহলে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

x