হঠাৎ নাক থেকে রক্তপড়া

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১৫ জুন, ২০১৯ at ৭:০১ পূর্বাহ্ণ
273

হঠাৎ শিশুর নাক থেকে রক্ত পড়তে শুরু করলে শিশু এবং মা-বাবা দু’জনেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কী করবেন ভেবে পান না। তাছাড়া শিশুর কোন সিরিয়াস অসুখ হয়েছে না কি তা নিয়ে দুশ্চিন্তা হওয়াটাও তো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু জানলে আশ্বস্ত হবেন, ন্যাজাল ব্লিডিং এমন একটা সমস্যা যেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুব গুরুতর কোনও অসুখের লক্ষণ নয়। সুতরাং কয়েকটা নিয়ম মেনে চললে এই সমস্যা সহজেই সামলানো যায়। নাক দিয়ে রক্ত পড়ার ইংরেজি নাম এপিসট্যাক্সিস। কখনো এক নাক, কখনো দুই নাক দিয়ে রক্তস্রাব হয়। তবে সচরাচর এক নাক দিয়েই অধিকাংশস্থলে রক্তস্রাব হয়।

নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণ : সাধারণত নিম্নলিখিত কারণে নাসিকা দিয়ে রক্তস্রাব হয়-

* স্কার্ভি নামক এক প্রকার দূষিত মুখক্ষতে এবং কালাজ্বরে, ম্যালেরিয়া জ্বরে, প্লীহা জ্বরে এবং অনেক সময় টাইফয়েড জ্বরেও নাসিকা দিয়ে রক্তস্রাব হয়।

* ব্লাড প্রেসার বৃদ্ধি হলে অনেক সময় নাসিকা দিয়ে রক্তস্রাব হয়ে মস্তিষ্কের কনজেসসন হ্রাস হয়।

* সিরোসিস-অফ-দি লিভারের (ইহাতে লিভার প্রথমে খুব বড় হয়ে শেষে ক্ষুদ্র হয়ে আসে) এবং গ্র্যানুলার কিডনি ও হার্ট ডিজিজে নাক দিয়ে রক্তস্রাব হয়।

* মাথায় আঘাত লেগে নাক দিয়ে রক্তস্রাব হয়।

* বৃদ্ধ ব্যক্তিদেরও বহুদিন কোন পীড়ায় ভুগার পর রক্তহীন ও জীর্ণ শীর্ণ হলে নাক দিয়ে রক্তস্রাব হয়।

* যৌবনের পূর্বে বালিকাদের নাকের ভিতর মিউকাস-মেম্ব্রেনের কনজেসেসন হয়ে রক্তস্রাব হয়।

* অনেক সময় কাহারো কারো বিনা কারণে নাক দিয়ে রক্তস্রাব হয় (রক্তস্রাব প্রবণ ধাতুর ব্যক্তি)।

* মাথার খুলির ফ্যাক্‌চার হয়ে নাসিকা দিয়ে রক্তস্রাব হয়।

* নাসিকার ভিতর ক্ষত-নাসা (টিউমার), ম্যালিগন্যান্ট গ্রোথ, ফাইব্রাস (সূতোর মত টিস্যু সমূহ দ্ধারা গঠিত অর্ব্বুদ, এডিনয়েড (গ্ল্যান্ড), এঞ্জিওমা-অফ-দি-সেপ্টম (নাসিকার অস্থির শিরা ধমনি আদির পীড়া) প্রভৃতিতে নাসিকা দিয়ে রক্তস্রাব হয়।

* ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে নাসিকা দিয়ে রক্তস্রাব হয়।
নাক থেকে রক্তপড়ার লক্ষণ

অনেক সময় রক্তস্রাবের পূর্বে মুখমণ্ডলে রক্তাধিক্য, শিরঃপীড়া উত্তাপ, নাসিকার মধ্যে সুড়সুড়ে করা প্রভৃতি লক্ষণ প্রকাশ পায়। আবার অনেক সময় পূর্বে কোন লক্ষণই প্রকাশ পায় না। সহসাই রক্তস্রাব হয়। এমনকি নিদ্রিতাবস্থায় রাত্রিতে রক্তস্রাব নাসারন্দ্র দিয়ে গলকোষে পতিত হয়। রোগী জাগ্রত হলে রক্তবমন হয়। কখনো কখনো রক্ত নাসাপথে না এসে স্বরনালী বা গলকোষ কিংবা উদরে এসে পড়ে। প্রায়ই শিঃপীড়া, শিরোঘূর্ণন, হস্তপদ ঠান্ডা, গলদেশে ধমনীর স্পন্দন, জ্বর প্রভৃতি হয়ে রক্তপাত হবার পর এর শাস্তি হয়।

* রক্তস্রাব মৃদুপ্রকারের হলে নাক হতে কালো রক্ত ফোঁটা ফোঁটা পড়ে। প্রচুর রক্তস্রাব ক্ষত বা অনিষ্টকর অর্ব্বুদ প্রভৃতির ক্রমবৃদ্ধির জন্য ঘটে। অল্প সময়ের জন্য রক্তপাত হলে ততো মারাত্মক হয় না। রক্তস্রাব যদি বেশি দিন স্থায়ী হয় তবে অবসাদ, অচৈতন্যাবস্থা বা মৃত্যু পর্যন্ত হয়।

* স্ত্রীলোকদের ঋতু সংক্রান্ত রক্তস্রাবে স্তনবৃদ্ধি ও স্পর্শাহিষ্ণুতা ঘটে।
পরিণতি

রক্তাল্পতা রোগে হাম, বসন্ত প্রভৃতি, হৃৎপিন্ড, ফুসফুস ও প্লীহার পীড়ায় নাসিকা হতে রক্তস্রাব হলে তা অশুভ।
নাক থেকে রক্ত পড়লে কি করা উচিত

মস্তিষ্কে রক্তাধিক্যের কারণে নাসাস্রাব হলে তা মস্তিষ্কের রক্তাধিক্য হ্রাস করে বিপদজনক অবস্থার আশু প্রশমন করে, এজন্য তা হঠাৎ দমন করা অনুচিত। যে কোন কারণে নাসাস্রাব হোক না কেন রোগীকে উচ্চ বালিশে মাথা রেখে স্থিরভাবে শয়ন করে রাখতে হবে এবং মাথায় ও নাকের উপরে বরফ ও পায়ে সেঁক দিতে হবে।

* আপনি প্যানিক করলে শিশুও প্যানিক করবে আর শিশু ভয় পেয়ে কান্নাকাটি করার ফলে সমস্যা বাড়বে। শিশুর নাক থেকে রক্ত পড়লে প্রথমেই ওকে বসিয়ে রাখুন। খেয়াল রাখবেন, শিশুর মাথাটা যেন অবশ্যই সামনের দিকে ঝোঁকানো থাকে। এই অবস্থায় কখনওই শিশুকে শুয়ে রাখবেন না বা পিছন দিকে হেলে বসতে বলবেন না। কারণ এর ফলে রক্ত গলায় বা মাথায় ঢুকে বিপত্তি বাড়তে পারে। এবার যে নাসারন্ধ্র থেকে রক্ত পড়েছে, সেটিকে পরিস্কার রুমাল বা টিস্যু দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ অন্তত মিনিট পনেরো চেপে ধরে থাকুন। শিশুকে অন্য নারারন্ধ্র দিয়ে শ্বাস নিতে বলুন। অসুবিধে হলে ওকে বলুন মুখ খুলে নিঃশ্বাস নিতে। নাকে কোনও ইনজুরির ফলে রক্তপাত হলে তবেই বরফ দেওয়া যেতে পারে, না হলে দরকার নেই। এই সময় নাক ঝাড়া, খোঁচাখুচি করা বা ঘষা একেবারেই বারণ। সাধারণত এই রকম অবস্থায় কিছুক্ষণ থাকার পর রক্তপড়া আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যায়।
জরুরি কিছু পরামর্শ

নাক দিয়ে যদি ঘন ঘন রক্ত পড়ে তাহলে দেরি না করে ডাক্তার দেখানো উচিত। মাথায় আঘাত লেগে ব্রেনের বেস ক্ষতিগ্রস্থ হলেও ন্যাজাল ব্লিডিং হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেরি না করে অবশ্যই হাসপাতাল ভর্তি বা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে স্ক্যান করানো দরকার। তাছাড়া, শিশুর নাকে খেলনার পার্টস, পুঁতি বা পিন জাতীয় ফরেন বডি ঢুকে গেলে ডাক্তার/হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। বারে বারে নাক থেকে রক্ত পড়াটা কোনো গুরুতর অসুখের লক্ষণ। লিউকিমিয়া, আইটিপি, নাকের টিউমার, হিমোফিলিয়ার মতো অসুখের ক্ষেত্রেও নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো সমস্যা দেখা যায়। ছোট্ট শিশুদের ন্যাজাল ব্লিডিং হলে বুঝতে হবে তাদের কোনো সিরিয়াস অসুখ হয়েছে।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান

ন্যাজাল ব্লিডিং নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে ফলদায়ক ওষুধ আছে। লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রয়োগে এই রোগ আরোগ্য লাভ করে। যথা- ১. আর্নিকা ২. হ্যামামেলিস ৩. ক্রোকাস ৪. ক্রোটেলাস ৫. মার্কুরিয়াস ৬. সিকেলী ৭. পালসেটিলা ৮. প্ল্যাটিনা ৯. ল্যাকেসিস ১০. বেলেডোনা ১১. ব্রায়োনিয়া ১২. চায়না ১৩. ফসফরিক এসিড ১৪. ফসফরাস ১৫. এসেটিক এসিড ১৬. ব্যারাইট কার্ব ১৭. বোরাক্স ১৮. কোনিয়াম ১৯. সিপিয়া ২০. ন্যাট্রাম সালফ ২১. সালফার ২২. নাক্সভূমিকা সহ আরো অনেক ওষুধ আছে। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x