হজ্বের ছয় ওয়াজিব

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বুধবার , ১১ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ
80

হজ্বের তিন ফরজ ও ছয় ওয়াজিব। ফরজ সমূহ হল () এহরাম পরা () ৯ জিলহজ্ব আরাফাতে অবস্থান () ১০ থেকে ১২ জিলহজ্বের মধ্যে কাবা শরীফ তাওয়াফ করা। হজ্বের ছয় ওয়াজিব হল () মুজদালিফায় অবস্থান করা () মিনায় জামারা সমূহের (শয়তান) প্রতি রমি বা পাথর নিক্ষেপ করা () হজ্বে কেরান ও হজ্বে তামত্তোকারীর জন্য দমে শুকরিয়া বা হজ্বের কোরবাণী করা()এহরাম মুক্ত হতে মাথার চুল কাটা বা মুন্ডানো()সাফামারওয়া সায়ী করা () বহিরাগতদের জন্য তাওয়াফে বিদা বা বিদায় তাওয়াফ করা।

কোন কোন বইতে হজ্বের ওয়াজিব ৩৫ টি পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সেগুলো সরাসরি হজ্বের ওয়াজিব নহে। বরং হজ্বের আহকাম সমূহের শাখা ওয়াজিব। যেমন এহরামের আহকামে ওয়াজিব তাওয়াফের আহকামে ওয়াজিব,হজ্ব সংশ্লিষ্ট ওমরার আহকামের ওয়াজিব ইত্যাদি। মূলত হজ্বের সরাসরি ওয়াজিব ছয়টি। এসব ওয়াজিব সমূহের মধ্যে কোন একটি ওয়াজিব বাদ পড়ে যায় তবুও হজ্ব হয়ে যায়। চাই ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ুক বা ভুলক্রমে বাদ পড়ুক। তবে দম দেওয়ার মাধ্যমে তার ক্ষতি পূরণ করা ওয়াজিব হবে। ওয়াজিব সমূহের বিবরণ :

() মুজদালিফায় অবস্থান করা : ৯ জিলহজ্ব আরাফাতে অবস্থান করে সূর্যাস্তের পর আরাফাতে মাগরিব না পড়ে মুজদালিফা রওনা হয়ে এশার ওয়াক্তে মাগরিব এশা পর পর মুজাদলিফায় পড়তে হবে এবং রাত্রে মুজদালিফা অবস্থান করে ফজরের নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ অকুফ অবস্থান করা ওয়াজিব। তারপর মিনার দিকে রওনা হওয়া।

আরাফাত থেকে মুজদালিফায় পৌঁছে জবলে কোজাহ বা মাশআরুল হারম পাহাড়ে বা এ পাহাড়ের যত নিকটে পারা যায় অকুফ বা অবস্থান করা উত্তম। তবে যেহেতু মুজদালিফায় রাত্রে পৌঁছে কাজেই হজ্বযাত্রীরা গাড়ির চালক মুজদালিফা মাঠের যে স্থানে নামিয়ে দেয় সে স্থান থেকে বেশি নড়াচড়া করতে চায় না। মাশআরুল হারামের কথা আল্লাহপাক কুরআন মজিদেও উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর হাবীব এ ছোট পাহাড়ে অকুফ করেছিলেন। বর্তমানে এ পাহাড়ে একটি সুন্দর মসজিদ নির্মিত রয়েছে। সাথে রয়েছে সুউচ্চ মিনার যা দূর থেকে দেখা যায়। এ মুজদালিফা থেকে মিনার দিকে আল্লাহর গজবের জায়গা আছে। যা মুজদালিফা ও মিনার মধ্যখানে। বর্তমানে মোহাচ্ছেব নামক এ জায়গায় দৈর্ঘ্য ৮১৭ ফিট। এ স্থানে যাতে মুজদালিফায় আপনার অকুফ না হয় মত খেয়াল রাখবেন এবং সকালে মিনা রওনা হতে এ স্থান দিয়ে দ্রুত অগ্রসর হবেন। এ স্থানে ৫৭০ খ্রিঃ আবরাহা বাদশাহ খানায়ে কাবা ধ্বংস করতে এসে লোক লস্কর ও হাতির দল সহ আল্লাহর গজবে আবাবিল পাখির পাথরাঘাতে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল।

() মিনায় জামারা সমূহের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করা : মিনায় তিন দিনে তিন শয়তানের প্রতি ৪৯ টি পাথর বা কংকর নিক্ষেপ করতে হয় যা ওয়াজিব। এ পাথরগুলি মুজদালিফা থেকে সংগ্রহ করে নেবেন। আল্লাহ পাকের মহিমা! প্রতি বছর প্রায় বিশ লাখ হজ্বযাত্রী যদি প্রতি জনে ৪৯টি করে পাথর নিয়ে থাকে তবে কম করে হলেও কয়েক ‘শ’ কি.মি এরিয়ায় মুজদালিফার ময়দান থেকে কোটি কোটি পাথর বা কংকর হজ্বযাত্রীগণ সংগ্রহ করে থাকেন। আশ্চর্য্যের বিষয় তারপরও আপনার থেকে ৪৯টি পাথর সংগ্রহ করতে ২/৩ ফুটের বেশী জায়গায় মাটিতে হাত দিতে হবে না। আপনি অনায়াসে আপনার চাহিদা ও সাইজ মত পাথর পেয়ে যাবেন। হজ্বের কার্যক্রমে এরকম আল্লাহপাকের অনেক বাস্তব কুদরত আপনি পেতে থাকবেন। যেমন তিন শয়তানের প্রতি তিন দিন ব্যাপী হজ্বযাত্রীগণ মুজদালিফা থেকে নেয়া প্রায় কোটি কোটি পাথর বা কংকর নিক্ষেপ করে থাকেন। এ তিন দিন সৌদি সরকার বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা শয়তানের স্তম্ভের চারপাশ থেকে পাথর সরান না। কাজেই শয়তানের স্তম্ভের চারপাশে পাথর বা কংকরের পাহাড় হয়ে যাবার কথা। কিন্তু না তেমনত দেখা যায় না। এতে অনায়াসে বুঝা যায় আল্লাহপাক যাদের হজ্ব কবুল করেন তাদের পাথরগুলো তুলে নেন।

প্রথম দিন ১০ জ্বিলহজ্ব বড় শয়তানের প্রতি ৭টি পাথর নিক্ষেপ করবেন। সময় সূর্য উদয় হতে অস্ত পর্যন্ত। আর মাকরূহ ওয়াক্ত সূর্য অস্ত হতে সুবেহ সাদেক পর্যন্ত। ১১ জ্বিলহজ্ব ৩ শয়তানের প্রতি ৭টি করে ২১ টি পাথর নিক্ষেপ করবেন। প্রথমে ছোট শয়তান তারপর মেঝ শয়তান তারপর বড় শয়তান। ওয়াক্ত সূর্য পশ্চিমাংশে ঢলে পড়া থেকে অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। মাকরূহ ওয়াক্ত ঐ দিবাগত সূর্য অস্ত যাওয়া থেকে সুবেহ সাদেক পর্যন্ত। ১২ জিলহজ্ব ৩ শয়তানের প্রতি ৭টি করে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করবেন। প্রথমে ছোট শয়তান তারপর মেঝ শয়তান তারপর বড় শয়তান। ওয়াক্ত সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া থেকে অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। মাকরূহ ওয়াক্ত ঐ দিবাগত সূর্যাস্ত যাওয়া থেকে সুবেহ সাদেক পর্যন্ত। তবে আজকাল হজ্বযাত্রীগণ ১২ জ্বিলহজ্ব শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করে মক্কা মোকাররমায় চলে যান। অতএব, ১২ জ্বিলহজ্ব সূর্য অস্তের আগেই শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করে মিনার সীমানা ত্যাগ করতে হবে। নতুবা ১৩ জ্বিলহজ্ব পুনঃ ৩ শয়তানের প্রতি আরও ২১টি পাথর মারতে হবে। ১৩ জ্বিলহজ্ব ৩ শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করে মিনা ত্যাগ করা সুন্নত। যেহেতু ১২ জ্বিলহজ্ব ৩ শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করে মিনা ত্যাগ করা শরীয়ত মতে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত। অতএব হজ্বযাত্রীগণ ১২ জ্বিলহজ্ব মিনা ত্যাগ করা প্রচলন হয়ে গেছে। ১০ থেকে ১২ জ্বিলহজ্বের মধ্যে সময় ও সুযোগ বুঝে মক্কা মোকাররমা গিয়ে ফরজ তাওয়াফ ও ওয়াজিব সায়ী সমাধা করে পুনঃ মিনায় ফিরে আসবেন।

() কেরান ও তামত্তো হাজ্বীগণের দমে শুকরিয়া : কেরাণ ও তামত্তো হাজ্বীগণের ক্ষেত্রে এহরাম মুক্ত হতে দমে শুকরিয়া তথা হজ্বের কোরবাণী করা ওয়াজিব। এফরাদ হজ্বীগণের ক্ষেত্রে মুস্তাহাব। এ দম কাফফরার দম নহে;শুকরিয়ার দম। অতএব, কোরবাণীর মাংসের মত এ মাংস খাওয়া জায়েজ তথা খেতে পারাটা উত্তম। তবে মিনায় রান্না করাটা ঝামেলা। আজকাল ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা জমা করেও কোরবাণী করে থাকে। অথবা কাফেলা/এজেন্সীর মাধ্যমেও করা যায়।

() চুল কাটা বা মাথা মুন্ডানো : প্রত্যেক হজ্বযাত্রীকে চুল কাটতে বা মাথা মুন্ডাতে হবে। পুরুষের ক্ষেত্রে মাথা মুন্ডানো উত্তম। চুল ছোট করাও জায়েজ আছে। মহিলাগণের ক্ষেত্রে চুলের অগ্রভাগ থেকে ইঞ্চি পরিমাণ এহরাম মুক্ত কোন মোহরম দ্বারা কাটাবেন।

() সাফামারওয়া সায়ী : সাফামারওয়া সায়ী করা ওয়াজিব। মক্কা মোকাররমা পৌঁছে ওমরার তাওয়াফের সাথে সায়ী ওমরার আহকাম। হজ্বের জন্য পুনঃ সায়ী করা ওয়াজিব। তামত্তো হজ্বযাত্রীগণ ফরজ তাওয়াফের পর পর করবেন। কেরাণ ও এফরাদ হজ্বযাত্রীগণের হজ্বের আগে সুন্নত তাওয়াফ তাওয়াফ কুদুম করতে হয়। কাজেই এ তাওয়াফের পর পর সায়ী করে নিলে ফরজ তাওয়াফের পর আবার পুনঃ সায়ী করতে হবে না। যেহেতু হজ্বের জন্য একবারই সায়ী করা ওয়াজিব। তামত্তো হজ্বযাত্রীগণ ৮ জ্বিলহজ্ব মিনা রওনা হবার আগে হজ্বের উদ্দেশ্য এহরাম পরতে হবে। এ হজ্বের এহরাম পরে যদি কেহ ভাল মনে করেন নফল তাওয়াফ করে পর পর সায়ী করে নিলে তবে ফরজ তাওয়াফের পর আর সায়ী করতে হবে না।

() তাওয়াফে বিদাঃ বহিরাগত হজ্বযাত্রীগণের ক্ষেত্রে এ তাওয়াফ ওয়াজিব। মক্কা মোকাররমা থেকে চলে আসার প্রাক্কালে বিদায়ী তাওয়াফ করে নিতে হবে। এ তাওয়াফের পর সায়ী নেই। অতএব, তাওয়াফে রমল বা এজতেবার প্রশ্ন আসে না। যদি হজ্বের পর মদিনা মুনাওয়ারা যান তবে সাধারণতঃ রাত্রে মুয়াল্লেমের বাস মক্কা মোকাররমা থেকে মদিনা মুনাওয়ারার উদ্দেশ্য রওনা হয়ে থাকে। অতএব, সকালবেলা বা আসরের পর তাওয়াফ করে মাগরিবের পর পর ওয়াজিবুত তাওয়াফ নামাজ পড়তে পারেন। যেহেতু তাওয়াফ যে কোন সময় করা যায় কিন্তু তাওয়াফের পর ২য় রাকাত ওয়াজিব নামাজ মকরূহ ওয়াক্ত না পড়া চাই। আর বিদায় তাওয়াফের পর পরও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কাবা শরীফে গিয়ে নামাজ পড়া জায়েজ আছে। আল্লাহপাক হজ্বযাত্রীগণের হজ্ব কবুল করুন। আমিন।

x