সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ-সংস্কারে অদূরদর্শিতা সওজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করুন

বৃহস্পতিবার , ৪ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ
42

হঠাৎ করেই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করা হয়। আবার কাটছাঁটও করা হয় দ্রুত। কোথাও প্রকল্পের পরিসর বাড়ানো হয় পরিকল্পনা ছাড়াই। কোন ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়াই যথেচ্ছভাবে শেষ করা হয় নির্মাণ কাজ। ফলে যে সড়কের আয়ুষ্কাল হওয়ার কথা ২০ বছর তা শেষ হয়ে যায় এক বছরেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক বিভাগের এ যথেচ্ছাচারিতায় দেশের কোনো সড়কই আন্তর্জাতিকমানের হিসেবে গড়ে উঠছে না। কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতেও পারছে না এসব সড়ক। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই উন্নয়ন কাজ করা সড়কগুলোর একটি কুয়াকাটা-বরিশাল-নোয়াখালি সড়ক। প্রশস্তকরণের কাজ সদ্যই শেষ হয়েছে সড়কটির। এরপর প্রকল্প কর্মকর্তাদের মনে হয়েছে সড়কটি চার লেন করা যুক্তিযুক্ত ছিল। দুই লেনের সড়কটির নির্মাণ শেষ হতে না হতেই তোড়জোড় চলছে চারলেনে উন্নীত করার আরেকটি প্রকল্পের। সড়কটি সম্পর্কে আইএমইডি’র মূল্যায়ন বলছে, যথাযথ পরিকল্পনা না করেই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা করা হয়েছে।
সওজ অধিদপ্তর জোনভিত্তিক আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়নের কাজ করছে। খুলনা জোনের উন্নয়ন কাজ করতে গিয়ে দেখছে কোথাও সড়কের দৈর্ঘ্য বাড়ানো প্রয়োজন। কোথাও আবার কমানো দরকার। প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা জোনেও। ঢাকা জোনের অন্তর্ভুক্ত আড়াই হাজার-নরসিংদি-নয়াপাড়া সড়কে কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কাজ শুরুর পর দেখা গেছে, কালভার্ট দিয়ে কাজ হবে না সেতু প্রয়োজন। সওজ অধিদপ্তরের নিজস্ব পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে সড়ক নির্মাণে এসব অসঙ্গতি। নির্মাণ করা সড়কগুলোর একটি গোপালগঞ্জ-কোটালিপাড়া-রাজৈর। ২০১০ সালে সড়কটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আটটি সেতু, নয়টি কালভার্ট ও আনুষাঙ্গিক কাজসহ ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১২ সালে। যদিও সময় লেগেছে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। বাস্তবে সড়ক উন্নয়ন হয়েছে ২৯ কিলোমিটারের বেশি। আটটি সেতু ও নয়টি কালভার্টের স্থলে নির্মিত হয়েছে ছয়টি করে। বাকি সেতু কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তাই বোধ করেন নি সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়ন বলছে, সড়কটি নির্মাণে সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষাই করা হয়নি। পত্রিকান্তরে গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক খবরে এসব তথ্য পরিবেশিত হয়। খবরে আরো বলা হয়, ভুল নকশা, সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করা, অদূরদর্শী ও ভুল পরিকল্পনা, ডিপিপি প্রণয়নে দুর্বলতার কারণে দফায় দফায় সড়কের নির্মাণ ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ছে। বড় অংকের অর্থ ব্যয়ে নির্মাণ করা সড়কগুলো টেকসইও হচ্ছে না। সওজ অধিদপ্তরের রোড পেভমেন্ট ডিজাইন গাইড-২০০৫ এ মহাসড়কের পেভমেন্ট আয়ুষ্কাল ২০ বছর ধরা হলেও অনেক সড়ক আছে যেগুলোর পেভমেন্ট এক বছরের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অদূরদর্শী পরিকল্পনার পাশাপাশি নির্মাণ কাজে গাফেলতি ও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারও এ জন্য দায়ী। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট কিছু সূত্র থাকে। থাকে দূরদর্শিতা। বিশ্বের প্রতিটি দেশই অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১০০ বছরের লক্ষ্য সামনে রেখে অগ্রসর হয়। এতে ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও উপযোগ বৃদ্ধি পায়। প্রায়শ বলা হচ্ছে, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তাঁর উল্টোটাই দেখা যায়। প্রকল্প গ্রহণ থেকে তার বাস্তবায়ন, প্রতিটি স্তরেই দুর্বল পরিকল্পনা ও দক্ষতার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কমিশন ভাগাভাগিতে বেশি দৃষ্টি দেয়ায় মানসম্পন্ন ও যুগোপযোগী প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হতে না হতেই সেটি ব্যবহারের উপযোগিতা শূন্য হয়ে পড়ছে, নতুন প্রকল্প প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে দুই লেনের কিন্তু বাস্তবায়ন এত দেরিতে হয়েছে যে, বর্তমানে সেটি চার লেনে উন্নীত না করলে তা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি জনদুর্ভোগও বাড়ছে, অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত উপযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ জন্যই প্রকল্প গ্রহণের আগে ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের এখানে পরিকল্পনা উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় পর্যায়ে কী ধরনের প্রকল্প নিলে জনগণ ও অর্থনীতি উপকৃত হতে পারে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপেক্ষিতই থাকে। এ জন্য খুব কম প্রকল্প থেকে সর্বোচ্চ উপযোগ আসে। উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া বা অর্থ হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে প্রকল্প নেয়ায় সেটি টেকসই হচ্ছে না। কিন্তু কারো বিরুদ্ধেই কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। জবাবদিহিতাও নেই। ভুল নকশা, সঠিকভাবে সম্ভাবনা সমীক্ষা না করা, অদূরদর্শী ও ভুল পরিকল্পনা, ডিপিপি প্রণয়নে দুর্বলতায় দফায় দফায় বাড়ছে সড়কের নির্মাণ ব্যয় ও মেয়াদ। বড় অংকের অর্থ ব্যয়ে নির্মাণ করা সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না। নির্মাণ কাজে গাফেলতি ও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারও এ জন্য দায়ী। অর্থাৎ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। কিন্তু যেসব নতুন সড়ক তৈরি হচ্ছে সেগুলো সবই মানহীন। মানহীন এসব সড়কের ভারবাহী ক্ষমতা (এক্সেল লোড) দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। এশিয়ান হাইওয়েভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোর ভারবাহী ক্ষমতা অর্ধেক। তারপরও কর্তৃপক্ষের হুঁশ হচ্ছে না। ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের সাথে সাথে মহাসড়কগুলোর সীমানাপ্রাচীর ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না। তাছাড়া দেশের অধিকাংশ মহাসড়কে রয়েছে বড় বড় বাঁক। এতে দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। অবকাঠামোকে একটি দেশের উন্নয়নের মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। এর সঙ্গে বিনিয়োগসহ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রশ্ন জড়িত। কাজেই এ বিষয়টিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
প্রতিবছরই দেশের সড়ক, মহাসড়ক সংস্কারে প্রকল্প ও অর্থ বরাদ্দ থাকে। সে অর্থ যথারীতি খরচও হয়। কিন্তু রাস্তা মেরামত হয় না বা সেগুলোর মান উন্নত হয় না। এর কারণ অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহিতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে মানহীন মহাসড়কের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এগুলোকে কিভাবে দ্রুত আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা যায়, তার কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে যথাশীঘ্র সম্ভব কাজে নেমে পড়তে হবে। অর্থ সংকট বা ভূমি জটিলতার অজুহাত খাড়া করে এ প্রক্রিয়া আটকে রাখা হলে দুর্ঘটনা ও সম্পদের অপচয় বাড়তে থাকবেই। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি।

x