সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় প্রতিবন্ধক

বৃহস্পতিবার , ৩ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৪৭ পূর্বাহ্ণ
44

সড়ক ভালো থাকলে পণ্য পরিবহনে একটি বড় ট্রাকের পরিচালন খরচ হয় প্রতি কিলোমিটার ৪৬ থেকে ৫০ টাকা। খারাপ সড়কে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় কিলোমিটার প্রতি সর্বোচ্চ ৬৯ টাকা। অর্থাৎ ভাঙাচোরা সড়কে পরিবহন মালিককে ট্রাক প্রতি পরিচালন ব্যয় বাবদ কিলোমিটার প্রতি সর্বোচ্চ ১৮ টাকা ৯ পয়সা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়। ভালো সড়কে দূরপাল্লার একটি বাস পরিচালনায় কিলোমিটার প্রতি খরচ হয় ৩৫ থেকে ৩৯ টাকা। ভাঙাচোরা সড়কে এ ব্যয় কিলোমিটার প্রতি সর্বোচ্চ ৫৯ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এ হিসাবে ভাঙাচোরা সড়কে বাস পরিচালনায় কিলোমিটার প্রতি সর্বোচ্চ ১৮ টাকা ৪২ পয়সা অতিরিক্ত ব্যয় মালিকদের। সারাদেশে ভাঙাচোরা সড়ক রয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দেশের মোট সড়কের যা ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটারের বেশি। ভাঙাচোরা এ সড়কে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে সব ধরনের মোটরযানের। বাংলাদেশ সড়ক গবেষণাগারের প্রতিবেদন মতে, সব ধরনের যানবাহন প্রতি কিলোমিটারে অতিরিক্ত এ ব্যয়ের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১১টাকা ৯ পয়সা। পত্রিকান্তরে গত ১৯ ডিসেম্বর এ খবর প্রকাশিত হয়।
খবরে আরো বলা হয়,-পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাঙাচোরা সড়ক প্রধানত দু’ভাবে যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। প্রথমত, ভাঙাচোরা সড়ক যানবাহনের কারিগরি ক্ষতি করে। এতে মেরামত খরচ বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, খারাপ সড়কে গাড়ির গতি কমে আসে। ভাঙা অংশ পার হতে ইঞ্জিনে বাড়তি চাপ পড়ে। তখন জ্বালানি খরচও বেড়ে যায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের পরিচালকের মতে, সড়ক ভালো থাকলে রোড ইউজার কস্ট সহনশীল পর্যায়ে থাকে। কিন্তু খারাপ হলে যানবাহনের ট্রিপের সময় বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বেড়ে যায় ভ্যালু অব ট্রাভেল টাইম। একইভাবে বেড়ে যায় যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও। বাড়তি জ্বালানির প্রয়োজন হয়। ভালো সড়কে একটি গাড়ি ঘণ্টায় যে পথ পাড়ি দেবে, খারাপ সড়কে একই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে তার দেড় দুই গুণ। এ পুরোটা সময়ই কিন্তু গাড়ির ইঞ্জিন চালু থাকে। ফলে জ্বালানি ব্যয় বাড়ে। ভাঙাচোরা সড়কে যানবাহন পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ার কথা বলছেন পরিবহন মালিক ও চালকেরাও। অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানান, খারাপ সড়ক যানবাহনের গতি কমিয়ে দেয়। এতে ট্রিপের সংখ্যা কমে যায় এটাকেও আর্থিক ক্ষতি হিসেবে দেখছেন তারা। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মহাসড়ক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) তথ্য বলছে, দেশের এক-চতুর্থাংশ সড়ক-মহাসড়ক খারাপ অবস্থায় রয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নেটওয়ার্কভুক্ত সড়কের পরিমাণ ২১ হাজার ৪৮১ কিলোমিটার। সরকারি হিসাবেই বর্তমানে দেশে সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার সড়ক ভাঙাচোরা দশায় রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল রাফনেস ইনডেক্স বা আইআরআই সূচক অনুযায়ী সারাদেশে প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার সড়কে জরিপ করে ভাঙাচোরা সড়ক পরিমাপ করেছে এইচডিএম।
দেখা যাচ্ছে সারাদেশে ভাঙাচোরা সড়ক রয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার, যা দেশের মোট সড়কের ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে এক হাজার ৮০০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক। ভাঙাচোরা এ সড়কে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে সব ধরনের মোটরযানের। বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারের প্রতিবেদন মতে, সব ধরনের যানবাহন প্রতি কিলোমিটারে অতিরিক্ত এ ব্যয়ের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১১ টাকা ৯ পয়সা। এই যদি অবস্থা হয়, তা হলে বলতে হবে, বাস্তবিক অর্থেই বেহাল অবস্থা দেশের সড়ক-মহাসড়কের। খানাখন্দে ভরা সড়ক-মহাসড়ক দিয়ে চলতে গিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। স্বল্প দূরত্বের রাস্তা পার হতে লাগছে দীর্ঘসময়। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের জেলা ও বিভাগীয় শহরের যোগাযোগ রক্ষাকারী মহাসড়কগুলোর প্রায় প্রতিটির দশাই এখন করুণ। ভাঙাচোরা সড়কের ট্রাকের ভাড়া প্রায় অর্ধেক বাড়িয়ে দিয়েছে মালিকেরা। বর্ধিত ভাড়ার প্রভাব পড়েছে চালসহ তরিতরকারি ও নিত্যপণ্যে। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে একদিকে দুর্ভোগ, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের চড়াদামের খেসারত দিচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ।
দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর এহেন অবস্থার মূলে যেনতেনভাবে সংস্কার এবং অতিবৃষ্টি। দেশে এমন কিছু সড়ক মহাসড়ক রয়েছে যেগুলো বৃষ্টি ও বন্যার কারণে প্রতিবছরই মেরামত করতে হয়। এভাবে বছর বছর যদি একই সড়ক বারবার মেরামত করা হয়, তবে সড়ক সংস্কার রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু হচ্ছে বলে মনে হওয়ার কারণ নেই। অথচ এসব কাজের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকদারদের পকেট ভারি হয়। টেকসই সমাধানের উদ্যোগ না নেওয়ার কারণেই দেশের রাস্তাঘাট দ্রুত বিধ্বস্ত হচ্ছে। আর এতে পরিবহন ব্যয়সহ ব্যবসার অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাংকের ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচকে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১৯০টি দেশের মধ্যে ব্যবসা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬। উচ্চ পরিবহন ব্যয়ই এর কারণ ও বড় প্রতিবন্ধক। এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং জনভোগান্তি নিরসনের জন্য সড়ক-মহাসড়কগুলোর সংস্কারের উদ্যোগ এখনই নেওয়া উচিত। তবে সংস্কার কাজটি হতে হবে স্বচ্ছ এবং টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত। নিয়ম হলো, প্রতিটি মহাসড়কের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী তদারক করবেন। কোথাও সমস্যা হলে বড় গর্ত হওয়ার আগেই তা নিজস্ব লোকজন দিয়ে সংস্কার করবেন টেন্ডারের অপেক্ষায় না থেকে। অর্থাৎ কাজের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। দেশে যদি সে নিয়মের প্রতিপালন হতো তাহলে এত ক্ষতি হতো না, আর হলেও পরিমাণে কম হতো। আমরা চাই, সরকার যত দ্রুত সম্ভব ভাঙাচোরা সড়ক-মহাসড়ক পুনঃসংস্কারের উদ্যোগ নিক। সরকারি কাজের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হোক্‌্‌ সড়ক-মহাসড়ক এমনভাবে সংস্কার করা হোক যাতে অন্তত সেটা পাঁচ বছর ভালো থাকে, মেরামত করতে না হয়।

x