সড়ক ব্যবস্থাপনায় সরকারকে সমন্বিত কর্মসূচি নিতে হবে

মঙ্গলবার , ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ
28

গত বছর দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষের মৃত্যুুর পরিসংখ্যান দিয়ে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন বলেছে, ৪২ শতাংশ মৃত্যু ঘটেছে গাড়ি চাপার ঘটনায়। এক সংবাদ সম্মেলনে ২০১৮ সালের সড়ক দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যান প্রতিবেদন তুলে ধরে বলা হয়, গত এক বছরে সারাদেশে ৩ হাজার ১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৪ হাজার ৪৩৯ জনের প্রাণ গেছে, আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪২৫ জন। ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে গাড়ি চাপায়, ২৪ শতাংশ ক্ষেত্রে দুই বাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে, ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে গাড়ি উল্টে, ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে গাড়ি খাদে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনায় যাদের প্রাণ গেছে, তাদের মধ্যে ৫৬৬ জনই চালক। তাদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১৬০ জন। এছাড়া ৬৪ জন বাসচালক ও ৫৯ জন ট্রাক চালক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন গতবছর। পুরা বছরের মধ্যে দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে জুন মাসে, ৩৮১ জন, আর সবচেয়ে কম নভেম্বরে, ২৪৫ জন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সামপ্রতিক গবেষণাতেও সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় শিকার হিসেবে পথচারীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পথচারীদের একটা বড় অংশই আবার স্কুলগামী শিক্ষার্থী। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মূলত ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। এর ফলে পথচারী এবং যাত্রীরা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারিভাবে পথচারীদের সচেতন করার কোনো কর্মসূচি নেই। সমপ্রতি প্রাথমিক স্তরে কিছু বইয়ে সড়ক নিরাপত্তার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব বলছে, দেশে মোট যানবাহন আছে ২৯ লাখ ৮৪ হাজার। এর মধ্যে ফিটনেস সনদবিহীন চলছে ২ লাখ ৭০ হাজার। এর বেশিরভাগই যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাক। অবশ্য ফিটনেস সনদ আছে এমন যানেরও যান্ত্রিক ত্রুটি থাকতে পারে। কারণ, আইনে যানবাহনের প্রায় ৬০টি কারিগরি ও বাহ্যিক দিক বিবেচনা করে সনদ দেওয়ার কথা রয়েছে, যা বিআরটিএর একজন মোটরযান পরিদর্শকের পক্ষে খালি চোখে নিশ্চিত করা কার্যত অসম্ভব। যানবাহন না দেখেই ফিটনেস সনদ দেওয়ার অভিযোগ আছে।
মোটরযান আইন অনুসারে, একজন পেশাদার চালক টানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি যানবাহন চালাতে পারবেন না। এর বেশি চালাতে হলে অবশ্যই আধা ঘণ্টার বিরতি দিতে হবে। তবে কোনোভাবেই দিনে আট ঘণ্টার বেশি যানবাহন চালাতে পারবেন না। কিন্তু চালকদের অনেকে টানা ১২-১৬ ঘণ্টাও যানবাহন চালাচ্ছেন।
চালক ও যানবাহনের এই দুরবস্থা যে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তা এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এআরআইয়ের গবেষণা অনুসারে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ। আর ব্র্যাকের গবেষণা বলছে, ৩৮ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার উৎস হচ্ছে বাস-মিনিবাস। ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ দুর্ঘটনার মূলে ট্রাক। ১২ শতাংশ মোটরসাইকেল।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ সমূহ : বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা, বিপজ্জনক অভারটেকিং, রাস্তা-ঘাটের নির্মাণ ত্রুুটি, ফিটনেস বিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, মহাসড়ক ও রেলক্রসিংয়ে ফিডার রোডের যানবাহন উঠে পড়া, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকায় রাস্তার মাঝ পথে পথচারীদের যাতায়াত।
সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে সড়কে শৃঙ্খলা আনতে হবে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় সরকারকে সমন্বিত কর্মসূচি নিতে হবে।
গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের পাশাপাশি স্কুলের পাঠ্যসূচিতে সড়ক দুর্ঘটনা রোধের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। ট্রাফিক নির্দেশনা অমান্য করা, যত্র-তত্র গাড়ি রাখা, নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া যাত্রী তোলা বা নামানো, ওভারটেক করা, প্রতিযোগিতা বা বেপরোয়া গাড়ি চালনা, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, ওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস বা জেব্রা ক্রসিং থাকার পরও তা ব্যবহার না করার প্রবণতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নিতে হবে।

x