সড়ক পরিবহন আইনের প্রয়োজনীয়তা

শনিবার , ৪ আগস্ট, ২০১৮ at ৮:০০ পূর্বাহ্ণ
37

ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের দাবিগুলো যৌক্তিক ও জনসমর্থিত হওয়ায় সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারছে না। সরকারের তিন মন্ত্রী আলাদা আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রদের আন্দোলন ও দাবিকে যৌক্তিক আখ্যা দিয়ে সেসব মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরার আহ্‌বান জানান। ছাত্রছাত্রীদের দাবি নিরাপদ সড়কের, যা দেশের প্রতিটি নাগরিকের চাওয়া। যে কারণে এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন অভিভাবকদের অনেকেই। রোদবৃষ্টিতে যানবাহন ছাড়া কষ্ট স্বীকার করে চলাচল করলেও শিক্ষার্থীদের দিকে পথচারীদের সদয় দৃষ্টি ও সহানুভূতি লক্ষ্য করা গেছে।

গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই সরকার ও বিশ্লেষক নানা মহলেই আলাপ আলোচনা চলছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তনই আসেনি। জানা গেছে, প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া আইনি যাচাই (ভেটিং) করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। আগামী সোমবার খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় ওঠার কথা। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক পত্রিকান্তরে বলেছেন, প্রস্তাবিত আইনে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, তা পর্যাপ্ত। মানুষ মেরে কম শাস্তি পেয়ে কেউ চলে যেতে পারবে না। এ ছাড়া বিদেশের মতো চালকের ভুলের জন্য ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। অপরাধের সঙ্গে সঙ্গে পয়েন্ট কাটা যাবে। যদি ১২ পয়েন্টই কাটা যায়, তাহলে ওই চালক কোনো দিনই আর ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন না।

এই আইনের খসড়া যদি অনুমোদন পায়, তাহলে আমরা আশা করবো যে সড়কে কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। যদিও আমরা জানি আইনের খসড়াটি গত বছরের মার্চে মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তাতে বিধান রাখা হয়েছে গাড়ি চালানোর জন্য চালকের কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে; আর চালকের সহযোগীদের (কন্ডাক্টর) কমপক্ষে পঞ্চম শ্রেণি পাস লাগবে। এতে দুর্ঘটনার জন্য মৃত্যু বা অন্যান্য ক্ষেত্রে আগের মতোই দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কেউ যদি গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নরহত্যা করে, তাহলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে। আর মৃত্যু নয়, এমন ঘটনায় ৩০৪ ধারা অনুযায়ী সাজা দেওয়া হবে। শুধু দুর্ঘটনা হলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।

বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে গুছিয়ে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য ২০০৫ সালে একটি পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মনোযোগের অভাবে সেই পরিকল্পনা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। তাঁরা বলেন, সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যাদের কাছে সেই কৌশলপত্র পাঠানো হয়েছিল, তাদের নজরদারির অভাবের কারণে সেটি হয়নি। পাশাপাশি আমাদের দাতাগোষ্ঠীগুলোও মেগা প্রজেক্টের মধ্যে চলে আসছে। ফলে পথচারীবান্ধব ও গণপরিবহনকে সুশৃঙ্খল করে সেবা খাতে পরিণত করা যায়নি। এখনকার আলাদা আলাদা মালিক নির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল এবং সেটি নিয়ন্ত্রণের অসাধ্য বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।

প্রস্তাবিত আইনে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কেউ গাড়ি চালাতে পারবেন না। এসব অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি রাখা হয়েছে। নীতিগত অনুমোদিত খসড়া অনুযায়ী ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালালে এক বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা গুণতে হবে। আর সড়কে দুটি গাড়ি যদি পাল্লা দিয়ে (রেসিং) চালানোর সময় দুর্ঘটনা ঘটে, সে ক্ষেত্রে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বাসে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের সংরক্ষিত আসনে কেউ বসলে বা তাদের না বসতে দিলে এক মাসের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে।

আমরা প্রত্যাশা করবো, খসড়াটি মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুরো দেশ আজ উত্তাল। ক্ষোভে রাস্তায় নেমে এলো শিক্ষার্থীরা। পেশ করলো হত্যার বিচারসহ ৯ দফা দাবি। এই প্রতিবাদের ঝড় দেশের সর্বত্র। সে হিসেবে সড়ক পরিবহন আইনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। দুর্ঘটনার নামে মানুষ হত্যা, আহত শিক্ষার্থীকে আবার পানিতে ফেলে দিয়ে হত্যা করা, ফুটপাতের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীর ওপর বাস তুলে দেওয়াএটা দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড। সুতরাং এগুলো বন্ধ করতে হবে। আমরা এটাও জানি, সরকার বেপরোয়া গাড়ি চালানোর বিপক্ষে। তাই বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে সরকারকেই।

x