সড়ক নির্মাণে অস্বাভাবিক ব্যয় রোধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করুন

শনিবার , ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ
49

বিভিন্ন দেশে দুই লেনের স্থানীয় সড়ক যেমন রয়েছে, একইভাবে রয়েছে চার বা ছয় লেন বিশিষ্ট মহাসড়কও। কোন কোন ক্ষেত্রে এসব সড়কের সঙ্গে টানেল কিংবা সেতুর মতো অবকাঠামো যুক্ত থাকে। সাধারণভাবে গড় হিসেবে মিটার প্রতি ব্যয় নির্ধারণ করে সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয়ের সঠিক তুলনামূলক চিত্র তাই পাওয়া যায় না। এজন্য রোড ব্লক পদ্ধতিতে নির্মাণ ব্যয়ের হিসেব করেছে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি)। পদ্ধতিটি প্রয়োগ করে সংস্থাটি দেখিয়েছে, বাংলাদেশে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলক বেশিই পড়ছে। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ২০১৯ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনটি গত ২৮ জানুয়ারি প্রকাশ করেছে এআইআইবি। তাতে বাংলাদেশ, চীন, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। পত্রিকান্তরে গত ৩১ জানুয়ারি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরটিতে আরো বলা হয়, রোড ব্লক পদ্ধতিতে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত নির্মাণ সামগ্রীর তুল্যমূল্যকে সূচক হিসেবে ব্যবহার করেছে এআইআইবি। এআইআইবি মানদণ্ড হিসেবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর চার লেনের প্রধান সড়ককে বিবেচনায় নিয়েছে। এক্ষেত্রে তারা বাছাই করেছে যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত ইন্টারসেকশন যুক্ত রয়েছে চার লেনের এমন সড়ককে। নির্দিষ্ট সড়কের নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণে প্রথমেই স্থানীয় মুদ্রায় সেটির মিটার প্রতি ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মুদ্রার মানের ওঠানামার কারণে স্থানীয় মুদ্রায় নির্মাণ ব্যয়কে সরাসরি ডলারে পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র পায় না। তাই, বিকল্প হিসেবে স্থানীয় মুদ্রায় মিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয়কে একটি সূচকে রূপান্তর করেছে এআইআইবি। সড়কের প্রচলিত নির্মাণ প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট শ্রম, নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রাংশের ব্যয় ধরে এ সূচক তৈরি করা হয়েছে, যেখানে মুদ্রার তারতম্যের কোন প্রভাব নেই। তবে বহুল ব্যবহৃত নির্মাণ সামগ্রী ও প্রক্রিয়া ভেদে ব্যয়ের ভাবিত গড় এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় মিটারপ্রতি ব্যয়কে ব্লক দিয়ে ভাগ করে মুদ্রা নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক নির্মাণ ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে এনেছে সংস্থাটি। এ পদ্ধতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সড়ক নির্মাণ ব্যয় পর্যালোচনা করেছে এআইআইবি। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে সড়কের নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলকভাবে অন্য দেশগুলোর চেয়ে বেশি। সড়ক নির্মাণ ব্যয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে যে শীর্ষে অবস্থান করছে, এ খবর পত্র-পত্রিকায় একাধিকবার বেরিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এটা শুধু বিশ্বব্যাংকই বলছে না, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণেও তা উঠে এসেছে। ব্লক (বাস্কেট অব লোকালি অবটেইনড কমোডিটিজ) পদ্ধতি প্রয়োগ করে এআইআইবি বলছে, বাংলাদেশে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলক বেশিই পড়ছে। এআইআইবি’র এ পর্যবেক্ষণ বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করছে। তারা বলছে, প্রতি মিটার হিসেবে ঢাকার সড়কের (চার লেন) নির্মাণ ব্যয় স্থানীয় মুদ্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ডলারে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রতি মিটার ৬ হাজার ৩০০ ডলার। ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতেও এ ব্যয় বেশি। বাংলাদেশ প্লাবনের দেশ। ফলে সড়কের মতো অবকাঠামো নির্মাণে এখানে অন্য দেশের তুলনায় ব্যয় কিছুটা বেশি হতে পারে। এর অন্যতম কারণ বন্যা থেকে রক্ষা পেতে বাঁধ নির্মাণ করতে হয় আমাদের। এছাড়া পাথরও আমদানি করতে হচ্ছে। এগুলো হলো বাস্তবতা। তবে এর বাইরেও নির্মাণ ব্যয় বেশি হওয়ার কারণ হলো, দুর্নীতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়া, প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে কার্যাদেশ দিতে না পারা, দ্বন্দ্ব সংঘাতময় পরিস্থিতি, জমি অধিগ্রহণের খরচ, নির্মাণ সামগ্রীর দাম ওঠানামা। এছাড়া যথাযথ পরিকল্পনার অভাবও নির্মাণ কাজের সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এখানে পরিকল্পনা ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়। স্থানীয় পর্যায়ে কী ধরনের প্রকল্প নিলে জনগণ ও অর্থনীতি উপকৃত হতে পারে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপেক্ষিতই থাকে। এজন্য খুব কম প্রকল্প থেকে সর্বোচ্চ উপযোগ আসে। ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া বা অর্থ হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে প্রকল্প নেয়ায় সেটি টেকসই হচ্ছে না। কিন্তু কারো বিরুদ্ধেই কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। জবাবদিহিতাও নেই। প্রকল্প প্রণয়নের সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে যে ব্যয় ধরা হয়, পরবর্তী সময়ে সেই ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ানো হয়। অথবা ব্যয় বাড়ানোর জন্য সময় বাড়ানো হয়। তার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্নীতি। দুর্নীতি চলে জমি অধিগ্রহণে। যে দামে মালিকের কাছ থেকে জমি কেনা হয়, সেই প্রকৃত মূল্যের বদলে দ্বিগুণ বা তারও বেশি কাগজে কলমে দেখানো হয়। জমির মালিক কৃষক এভাবে বঞ্চিত হন। টাকা যায় মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে। টেন্ডারে প্রতিযোগিতা না থাকায় সড়ক মহাসড়ক নির্মাণের জন্য মালামাল কেনার ক্ষেত্রে চলে আরেক দফা দুর্নীতি। এছাড়া এদেশে কোন প্রকল্পই সময়মতো শেষ হয় না। ফলে সময় বাড়ে। ভুল নকশা, সঠিকভাবে সম্ভাবনা সমীক্ষা না করা অদূরদর্শী ও ভুল পরিকল্পনা, ডিপিপি প্রণয়নে দুর্বলতায় দফায় দফায় বাড়ে সড়কের নির্মাণ ব্যয় ও মেয়াদ। বিপুল পরিমাণ অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে নির্মিত সড়ক টেকসই হচ্ছে না বলে প্রায়শ খবর প্রকাশিত হয়। টেকসই না হবার মূলে রয়েছে নির্মাণ কাজে গাফেলতি ও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা। এক কথায় বলা যায়, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও জনগণ তার সুফল পাচ্ছে না। যেসব নতুন সড়ক তৈরি হচ্ছে তার প্রায় সবই মানহীন। মানহীন এসব সড়কের ভারবাহী ক্ষমতা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। এশিয়ান হাইওয়ে ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের তুলনায় অর্ধেক। তারপরও কর্তৃপক্ষের হুঁশ হচ্ছে না। তাছাড়া দেশের অধিকাংশ মহাসড়কে রয়েছে বড় বড় বাঁক। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা। অবকাঠামোকে দেশের উন্নয়নের মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। এর সঙ্গে বিনিয়োগসহ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রশ্ন জড়িত। কাজেই বিষয়টিকে হালকাভাবে কোনক্রমেই দেখা উচিত নয়।
প্রতি বছরই দেশের সড়ক, মহাসড়ক সংস্কারে প্রকল্প ও অর্থ বরাদ্দ থাকে। সে অর্থ রীতি মাফিক ব্যয়ও হয়ে থাকে। কিন্তু রাস্তা মেরামত হয় না বা সেগুলোর মানও উন্নত হয় না। এর কারণ খুঁজে বের করা অবশ্যই প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কের মতো অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা হতে হবে সামগ্রিক ও সমন্বিত। আমরাও এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করি। তবে সর্বাগ্রে দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সড়কের মানহীন মহাসড়ক এবং অত্যধিক নির্মাণ ব্যয়ের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই- এ কথা নীতিনির্ধারকদের মাথায় রাখতে হবে। সড়ক নির্মাণে কী করে ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়া যায়, কিভাবে দ্রত মানে উন্নীত করা যায়, তার কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার। অর্থ সংকট ও ভূমি জটিলতার অজুহাত দিয়ে এ প্রক্রিয়া আটকে রাখা হলে সম্পদের অপচয় বাড়তে থাকবে; পাশাপাশি দুর্ঘটনাও বাড়বে। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি ও জনগণ।

x