সড়ক নিরাপত্তা দশকেও কেন কমছে না দুর্ঘটনা

মোরশেদ তালুকদার

শুক্রবার , ৩ আগস্ট, ২০১৮ at ৩:০৩ পূর্বাহ্ণ
47

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়কে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ ঘোষণা করেছিল। বাংলাদেশ এতে সম্মতি দেয়। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জাতিসংঘের সংস্থা এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আর্থিক ও সামাজিক কমিশন এসক্যাপে’র সঙ্গে একটি সমাঝোতা চুক্তি হয়েছিল ২০১১ সালের ১১ মে। ঘোষিত সড়ক নিরাপত্তা দশকের প্রধান লক্ষ্য ছিল সড়ক দুর্ঘটনার হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। চুক্তির পর গত সাত বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমেনি। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী বরং সড়ক দুর্ঘটনার হার বেড়েছে। এই ক্ষেত্রে অভিযোগ আছে, সড়ক দুর্ঘটনারোধে জাতিসংঘের সুপারিশগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় নি। ফলে রোধ করা যাচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি। এদিকে জাতিসংঘের নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার হার কমানোর লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর ‘ন্যাশনাল রোড সেফটি স্ট্যাটিজিক একশন প্ল্যান’ অনুমোদন দিয়েছিল সরকারের ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল’। গত নয় মাসে ‘ন্যাশনাল রোড সেফটি স্ট্যাটিজিক অ্যাকশন প্ল্যান’ এর সুফল তেমন একটা লক্ষ্য করা যায় নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা জাতিসংঘ নির্ধারণ করেছিল তা বাংলাদেশে পূরণ হবে তো?

এদিকে ২৫ জুন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়ক দুর্ঘটনারোধে বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে– ‘চালকেরা টানা ৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে পারবেন না। এছাড়া দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহনকালে পথে চালকদের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকা, চালকের সহকারী (হেলপার) কখনই চালকের আসনে বসতে পারবেন না ও পরিবহনে যাত্রীদের সিটবেল্ট পরা বাধ্যতামূলক’ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবে এসব নির্দেশনাও শতভাগ বাস্তবায়িত হয় নি।

সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র :

বাংলাদেশে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার উপর বিভিন্ন সময়ে তথ্য প্রকাশ করে ‘যাত্রী কল্যাণ সমিতি’ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ছয় মাসে সারাদেশে ২ হাজার ৮৬০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ২৬ জন ও আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৫২০ জন। এর মধ্যে জানুযারি মাসে চলতি মাসের জানুয়ারিতে ৪৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩৫৩ জন আহত ও ৫১৪ জন নিহত হন। ফেব্রুয়ারি মাসে ৪৩৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৫২১ জন আহত ও ৪৫৯ জন নিহত হন। মার্চ মাসে ৪৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৫০৬ জন আহত ও ৪৮৩ জন নিহত হয়েছেন। এপ্রিল মাসে ৪৫১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২২৩ জন আহত, ৪৭১ জন নিহত হন। মে মাসে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১২৭ জন আহত ৪৮৪ জন নিহত হন। জুন মাসে ৫২২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৭৯০ জন আহত ৬১৫ জন নিহত হয়।

২০১৭ সালের সড়ক দুর্ঘটনা :

যাত্রী কল্যাণ সমিতি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে ছোটবড় ৪ হাজার ৯শ ৭৯ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে মোট ২৩ হাজার ৫৯০ জন যাত্রী, চালক ও পরিবহন শ্রমিক হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩ শ ৯৭ জন, আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১৯৩ জন। আহতদের মধ্যে হাত, পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন ১ হাজার ৭২২ জন। এসব দুর্ঘটনায় আর্থিক হিসেবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে জিডিপির প্রায় দেড় থেকে দুই শতাংশ।

২০১৭ সালে সংঘটিত দুর্ঘটনার মধ্যে বাস দুর্ঘটনা ১ হাজার ২৪৯টি, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান দুর্ঘটনা ১ হাজার ৬৩৫টি, হিউম্যান হলার ২৭৬টি, কারজিপমাইক্রোবাস ২৬২টি, অটোরিকশা এক হাজার ৭৪টি, মোটর সাইকেল এক হাজার ৪৭৫টি, ব্যাটারিচালিত রিকশা ৩২২টি ও নছিমনকরিমনে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮২৪টি।

নিরাপদ সড়ক চাই’র তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৬৪৫ জন মারা যান সারাদেশে।

ঈদুল ফিতরে যেসব দুর্ঘটনা :

যাত্রী কল্যাণ সমিতি’র তথ্য অনুযায়ী, গত ঈদুল ফিতরে ১৩ দিনে (১১ জুন ’ ১৮ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত) ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন নিহত ১২৬৫ জন আহত হয়েছে। সংগঠিত দুর্ঘটনার যানবাহন পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ বাস, ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ১২ দশমিক ২২ শতাংশ নছিমনকরিমন, ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক, ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ অটোরিঙা, ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ কারমাইক্রো ও ১৫ দশমিক ২৮ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ অনান্য যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। অবশ্য ‘যাত্রী কল্যাণ সমিতি’র এ তথ্য নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। সরকারের এ বিভাগটির দাবি ছিল, যাত্রী কল্যাণ সমিতির দেয়া তথ্যগুলো সঠিক নয়।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ :

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অদক্ষ চালক এবং তাদের অনিয়ন্ত্রিত ওভারটেক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনই মূলত সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। পাশাপাশি পথচারীদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অসচেতনতার জন্যও ঘটছে দুর্ঘটনা। তবে সচেতন মহলের অভিযোগ, বিআরটিএ এবং ট্রাফিক বিভাগের সুষ্ঠু তদারকির অভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার সাতটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছিল। এগুলো হচ্ছেচালকদের বেপরোয়া গতি, পথচারীদের অসতর্কতা, লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের অনিয়ম, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগে শিথিলতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও মালিকপক্ষের নানা অব্যবস্থাপনা।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, বিরতিহীন/বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো, অদক্ষ চালক ও হেলপার দ্বারা যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিঙা, ব্যাটারি চালিত রিঙা, নসিমনকরিমন ও মোটর সাইকেল অবাধে চলাচল, মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকা, বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো, সড়কমহাসড়কে ফুটপাত না থাকার কারণে বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনা ঘটে।

এ প্রসঙ্গে নিরাপদ সড়ক চাই চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক শফিক আহমেদ সজীব দৈনিক আজাদীকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা এখন দেশের জাতীয় সমস্যা। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে। কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে অবশ্যই এ দুর্ঘটনা কমানো যাবে। এইক্ষেত্রে জাতিসংঘের যেসব সুপারিশ ছিল সেগুলো বাস্তবায়নে জোর দেয়া উচিত। দুর্ঘটনা কমানো কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে, সর্বক্ষেত্রে এর বিরুদ্ধে গণজোয়ার সৃষ্টি করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

ইকবাল নামে বেসরকারি বিশববিদ্যালয়ের এক ছাত্র বলেছেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সামগ্রিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে কেবল চালকদের দোষারোপ করলে চলবে না। পথচারীযাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকেই সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জন্য পথচারী কিংবা যাত্রীরাও দায়ী থাকেন।

x