সড়কে মৃত্যুর মিছিল : কঠোর নজরদারি প্রয়োজন দিদার আশরাফী

সঞ্জয় চৌধুরী

শনিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৪:৩১ পূর্বাহ্ণ
9

সড়ক ও মহাসড়কে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীল অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত। সড়ক দুর্ঘটনা চলমান সময়ে রুটিন মাফিক কর্মকাণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রসঙ্গত, শিশুকিশোর শিক্ষার্থীদের সপ্তাহ খানেকের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে, আশাবাদী হতে অনুপ্রাণিত করেছে। তারা রাজপথে নেমে সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সড়ক ও মহাসড়কে শৃংখলা প্রতিষ্ঠা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় যে ভূমিকা রেখেছে, তা অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন। এ মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য দেশে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রশংসার দাবিদার। আরো উল্লেখ্য যে, রাজধানী ঢাকার রাজপথে ট্রাফিকের দায়িত্ব নিয়ে লাইসেন্সবিহীন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ধরেছে, অনেক আমলা, মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির লজ্জায় ফেলিয়েছে, তারা ট্রাফিক আইন মানতে বিভিন্ন যানবাহন ও পথচারীদের বাধ্য করেছে। এতে কিছুটা হলেও সড়কে শৃঙ্খলা লক্ষ্য করা গেছে, যানজট কমতে দেখা গেছে। সড়কে বেপরোয়া বিশৃঙ্খলা ও দুঃসহ যানজট নিরসন অসম্ভব, এই ধারণা তারা বদলে দিয়েছে। শিশুকিশোর শিক্ষার্থীদের এই ‘পথ দেখানোকে’ গোটা দেশের মানুষ সমর্থন জানিয়েছে, তাদের অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়েছে। তাদের এই আন্দোলন সরকার ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যেমন নাড়া ফেলেছে তেমনি জনগণ পর্যায়েও সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে। এর ফল হিসাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ট্রাফিক সপ্তাহ পালনসহ সড়ক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সড়ক নিরাপত্তা আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, শিশুকিশোর শিক্ষার্থীদের এই অরাজনৈতিক ও মহতী আন্দোলনকে শেষ দিকে রাজনৈতিক রং দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। হামলামামলাগ্রেফতার ইত্যাদিও হয়েছে। তারপরও বলতে হবে, তাদের আন্দোলন বিফলে যায়নি। পরবর্তীতে গৃহীত বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ ও পদক্ষেপ তার প্রমাণ বহন করে। এই আন্দোলনেরই অনুপ্রেরণায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়েছে স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও বিএনসিসির সদস্যরা। তারা গত কয়েকদিন ধরে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ও পয়েন্টে কাজ করছে। তারা মূলত জেব্রাক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের নির্দেশনা ও সহযোগিতা দিচ্ছে। আমি মনে করি, এ অভিযান সারাদেশে পরিচালনা করা দরকার। তাদের এই স্বেচ্ছাকর্মের কারণে রাস্তা পারাপারে শৃঙ্খলার পাশাপাশি যানজট কিছুটা হলেও কমে এসেছে। স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও বিএনসিসির সদস্যরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তারা স্বেচ্ছায় এ জনহিতকর কর্মে ব্রতী হয়েছে। তাদের অকুণ্ঠিতচিত্তে আমরা সাধুবাদ জানাই।

প্রসঙ্গত, সড়ক ও মহাসড়কে নিশ্চিত নিরাপদ সড়ক চাই, এখন একটা প্রধান জাতীয় দাবি। সড়কে প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে। গত ঈদুল আযহার সময় মাত্র ১৩ দিনে দু’শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। আহতের সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি। এরপরও এমন কোনো দিন নেই, যেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ হতাহত না হচ্ছে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামানো সম্ভব হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে যানজট ও অশেষ ভোগান্তি। সড়কমহাসড়কগুলোতে যানজট প্রতিদিনের সাধারণ বাস্তবতা। এতে যাত্রীদের অপরিমেয় দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। মালামাল পরিবহন ব্যাহত ও বিলম্বিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। পণ্যমূল্যে যুক্ত হচ্ছে এই ক্ষতির অংক। আর তার অনিবার্য খেসারত দিতে হচ্ছে ক্রেতাভোক্তাদের। যানজটে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ কত, বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা ও সমীক্ষায় তার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। আমরা এখানে তার পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। অর্থনীতিকদের মতে, এই ক্ষতি যদি নিরোধ করা সম্ভব হতো, তাহলে জিডিপিতে এক থেকে দেড় শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটতো।

ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী ও প্রধান শহর। এই শহরটি যানজটের নির্বিচার শিকার। প্রতিদিন যানজটে এখানে কোটি টাকার ক্ষতি ও বিপুল কর্মঘণ্টা বিনষ্ট হয়। এছাড়া দুর্ঘটনা ও প্রাণহানিও যখনতখন ঘটতে দেখা যায়। এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, দুর্ঘটনা, সড়ক বিশৃংখলা ও যানজটের জন্য শুধু চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়িই দায়ী নয়, যাত্রীপথচারীরাও দায়ী। চালক ও গাড়ি ঠিক হলেই যে দুর্ঘটনা ও যানজট কমবে সে নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। যদি যাত্রী ও পথচারীরা সতর্কসচেতন হয় ও ট্রাফিক আইন চলে তবেই সেটা সম্ভব হতে পারে। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।

স্বীকার করতে হবে, চলাচল ও সড়ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের নাগরিক সচেতনতা অত্যন্ত কম। জেব্রাক্রসিং, আন্ডারপাস, ওভারব্রিজ ইত্যাদি ব্যবহারে অনেকের মধ্যেই অবহেলা ও অনীহা প্রত্যক্ষ করা যায়। অথচ এগুলো ব্যবহার করলে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি যেমন থাকে না তেমনি দুর্ঘটনা ও যানজট কম হতে পারে। স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও বিএনসিসির সদস্যরা রাজধানীতে এই সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইন মানতে অভ্যস্ত করার কাজটাই মূলত করছে।

বাংলাদেশে সামাজিক ও মানবিক এসব সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে বহুদিন ধরেই কাজ করে চলছে। লাখ লাখ শিক্ষার্থী এদের সদস্য। এরা সুশৃঙ্খল এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এরা একটি সংগঠিত বিশাল ফোর্স। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি আগে সংযুক্ত ছিলেন, এখনো আছেন। এদের এই সংঘশক্তিকে সঠিকভাবে, উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যবহারের কোনো উদ্যোগ অতীতে তেমন একটা নেয়া হয়নি। এই অব্যবহৃত শক্তিকে কাজে লাগানো গেলে অনেক বড় বড় কাজ করা সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে।

সড়ক শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও বিএনসিসির সদস্যরা যেভাবে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছে সেটা একটা বিরল নজির এবং এ নজিরের অনুসৃতি প্রসারিত করা যেতে পারে। আগে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া ও খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাক্ষরতা, পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা ও জনসেবামূলক অনেক কাজ করতো। এখন আর এসব কাজ তাদের করতে দেখা যায় না। জনসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজে তাদের নিয়োজিত করা সম্ভব হলে দেশ ও জাতি প্রভূত উপকৃত হতে পারে।

স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও বিএনসিসির সদস্যরা যে উদ্যোগ নিয়েছে তার সঙ্গে মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা যেতে পারে। আমাদের শিশুকিশোর ও তরুণদের মধ্যে সুপ্ত ও অপব্যবহৃত অবস্থায় যে শক্তি রয়েছে তা কাজে লাগানোর পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত ইনশিয়েটিভ নিতে হবে। আর স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বেচ্ছাকর্ম যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে করা সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে তাদের ইনসেনটিভও কিছু না কিছু দিতে হবে।

উল্লেখ্য যে, সড়ক মহাসড়কে মৃত্যু ও কান্নার মিছিল অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন এটিই আমরা গণমাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু কথা হলো প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নজরদারির পাশাপাশি এখনও সড়ক ব্যবস্থাপনায় অনেক দুর্নীতিবাজ অপকর্মে লিপ্ত থাকার কারণে সুষ্ঠুভাবে কাজগুলো সমাধান হচ্ছে না। সুতরাং সরকারের প্রতি অনুরোধ সড়ক ও মহাসড়কে মৃত্যু ও কান্নার মিছিল বন্ধের জন্য সরকারি নজরদারি প্রয়োজন, এতে করে নাগরিক সমাজ উপকৃত হবে।

লেখক : সাংবাদিক

x