সড়কে চলমান নৈরাজ্য বন্ধে পদক্ষেপ নিন

বৃহস্পতিবার , ২ আগস্ট, ২০১৮ at ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ
41

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে হানিফ পরিবহনের বাস থেকে ফেলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পায়েল হত্যার ঘটনায় উত্তাল পুরো দেশ। ক্ষোভে রাস্তায় নেমে এলো শিক্ষার্থীরা। পেশ করলো হত্যার বিচারসহ ৯ দফা দাবি। এই প্রতিবাদের ঝড় দেশের সর্বত্র। বাদ পড়েনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকও। সবচেয়ে জনপ্রিয় এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটিতে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবাদের আগুন ও বিভিন্ন প্রতিবাদী ছবি। সেখানে দেখা গেছে, বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের হাতে বিভিন্ন দাবি সম্বলিত ব্যানার এবং ফেস্টুন। যার একটিতে লেখা আছে, আমরা ৯ টাকায় ১ জিবি চাই না, ‘নিরাপদ সড়ক চাই।’ ওদের সবচেয়ে বেশি আহত করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের হাস্যোজ্জ্বল মুখ। বাসচাপায় নিহত শিক্ষার্থীদের নিয়ে গণমাধ্যমে হাসিমাখা মুখে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাকে কেউ মেনে নিতে পারে নি। যদিও পরে তিনি দুঃখপ্রকাশ করেছেন। বলেছেন, শিক্ষার্থীদের মৃত্যু নিয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে আমি দুঃখিত ও লজ্জিত। এতে যারা আহত হয়েছেন তাদের বিষয়টি ক্ষমাসুন্দরভাবে নেওয়ার আহ্‌বান জানাচ্ছি।

এদিকে, গণপরিবহনে অবৈধ চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়েছে বিআরটিএ এবং ডিএমপিকে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভাকক্ষে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিআরটিএ ও বিআরটিসিসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একটি সভা হয়। বর্তমান গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা বিষয়ক ওই সভায়ই এই নির্দেশ দেওয়া হয় বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, সারা দেশের সড়কে টেম্পোগুলোতে ভুরি ভুরি অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক দেখা যায়। সড়ক পরিবহন আইনে বর্তমানে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৪ মাসের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এই শাস্তি কম বলে তা আরও কঠোর করার দাবি রয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন আরও কঠোর করার উদ্যোগ থাকলেও পরিবহন মালিকশ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরোধিতায় তা এখনও ঝুলে আছে।

গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই সরকার ও বিশ্লেষক নানা মহলেই আলাপ আলোচনা চলছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তনই আসেনি। অনেকের প্রশ্ন, কেন কোনো একটি কাঠামোয় আনা যাচ্ছে না গণপরিবহন ব্যবস্থাকে? বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী সারা দেশে গত জানুয়ারি মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় তিন হাজার ২৬ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা আলোচিত হবার পর সংশ্লিষ্ট চালককে গ্রেপ্তার ও মামলার মত তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দৃশ্যত বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে গুছিয়ে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য ২০০৫ সালে একটি পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক শামসুল হক বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মনোযোগের অভাবে সেই পরিকল্পনা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যাদের কাছে সেই কৌশলপত্র পাঠানো হয়েছিল, তাদের নজরদারির অভাবের কারণে সেটি হয়নি। পাশাপাশি আমাদের দাতাগোষ্ঠীগুলোও মেগা প্রজেক্টের মধ্যে চলে আসছে। ফলে পথচারীবান্ধব ও গণপরিবহনকে সুশৃঙ্খল করে সেবা খাতে পরিণত করা যায়নি। এখনকার আলাদা আলাদা মালিক নির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল এবং সেটি নিয়ন্ত্রণের অসাধ্য বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল সমস্যা পরিচালনায়। সে কারণে কৌশলপত্রে সুপারিশ করা হয়েছিল সব গণপরিবহনকে এক ছাতার নিচে কয়েকটি কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসার। কিন্তু সেটা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এত বছর আগে একটি কৌশলপত্র সরকার অনুমোদন করলেও এখনো তা বাস্তবায়ন করা যায়নি কেন।

পরিবহন ব্যবস্থার ওপর মানুষের মনে চরম অনাস্থা তৈরি হয়েছে। নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আজ মানুষ ঐক্যবদ্ধ। তাঁরা মাঠে নেমেছেন, মানববন্ধন করছেন, প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীও ইতোপূর্বে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা চাইবো, সড়কে এই চলমান নৈরাজ্য বন্ধ হোক। তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানাই।

x