সড়কেই নষ্ট এক লাখ চল্লিশ হাজার চামড়া

ক্রেতা নেই, নজিরবিহীন দরপতন

হাসান আকবর

বৃহস্পতিবার , ১৫ আগস্ট, ২০১৯ at ৫:১০ পূর্বাহ্ণ
407

নজিরবিহীন দরপতনের ঘটনায় ক্রেতা না পেয়ে নগরীর চারটি পয়েন্টে এক লাখ চল্লিশ হাজার পিস চামড়া ফেলে গেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দেশের ইতিহাসে এর আগে কোনোদিন এভাবে কোরবানির পশুর চামড়া ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটেনি। সংশ্লিষ্টরা জানান, রাস্তায় ফেলে দেয়া এসব চামড়া পচে ভয়াবহ দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। পরে এসব অপসারণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। দেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য চামড়া বছর কয়েকের ব্যবধানে ‘বর্জ্য’ হয়ে উঠার পেছনে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং অদূরদর্শী নীতিমালাকে দায়ী করেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
কাঁচা চামড়া রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর থেকেই দেশের চামড়ার বাজার ক্রমে সিন্ডিকেটের কব্জায় চলে গেছে বলে উল্লেখ করে ব্যবসায়ীরা জানান, প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের অন্তত চার কোটি টাকা ‘চোখের পানিতে’ ভেসে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব চামড়া রপ্তানি করে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে গতকাল প্রতি বর্গফুট ফিনিসড চামড়ার দাম ছিল সর্বনিম্ন আড়াই ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যা ২১০ টাকারও বেশি। অথচ এবার বাংলাদেশে একটি বড় গরুর চামড়া বিক্রি হয়নি দুইশ’ টাকা দরে। জানা যায়, একটি ছোট আকৃতির গরুতে ২০/২১ ফুট এবং বড় আকৃতির গরুতে ৩৫/৪০ ফুট, মহিষে ৩৫/৪০ ফুট এবং ছাগল ও ভেড়া থেকে ৪ ফুটের মতো চামড়া পাওয়া যায়। কোরবানির সময় ছোট বড় এবং মাঝারি আকৃতির গরু কোরবানি হয় বিধায় একটি পশুতে গড়ে ২৫ ফুট চামড়া হিসেব করা হয়। এই হিসেব ধরলে কোরবানিতে একটি গরুর চামড়ার গতকাল আন্তর্জাতিক বাজার ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। কাঁচা চামড়াকে ফিনিসড চামড়ায় পরিণত করতে তিনটি ধাপ পার হতে হয়। এই তিনটি ধাপ পার হতে একটি চামড়ায় গড়ে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা খরচ ধরলেও এক একটি চামড়ায় গড়ে সাড়ে তিন হাজার টাকা মুনাফার সুযোগ রয়েছে। আর এই মুনাফাকে নির্বিঘ্ন করতে ট্যানারি মালিকদের সংঘবদ্ধ একটি চক্র চামড়ার বাজার নিয়ে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছে। দেশে ছোট বড় মিলে দুইশটির মতো ট্যানারি থাকলেও সর্বোচ্চ ৩৫/৪০ জন ট্যানারি মালিকের একটি সিন্ডিকেট চামড়া বাজার নিয়ে এই সংকট সৃষ্টি করে।
ট্যানারি সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কাঁচা চামড়াকে ফিনিসড চামড়ায় পরিণত করতে তিনটি ধাপ পেরুতে হয়। এই তিন ধাপেই বিশ্ববাজারে চামড়া বিক্রি হয়। এরমধ্যে প্রথম ধাপ হচ্ছে ওয়েট ব্লু লেদার। কাঁচা চামড়া কিনে তাতে কিছু লবণ এবং সোডিয়ামসহ সামান্য কেমিক্যাল দিয়ে বড় বড় ড্রামে ঘুরিয়ে ড্রাই করা হয়। এতে চামড়ার লোম ঝরে যায়। চামড়াগুলো কিছুটা নীলাভ হয়ে যায়। এই চামড়া আর নষ্ট হয় না। কাঁচা চামড়াকে ওয়েট ব্লু করতে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মতো সময় লাগে। এটা দিয়ে যেভাবে খুশি সেভাবে চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন করা যায়। বিশ্বের চামড়া বাজারে এই ওয়েট ব্লু ক্যাটাগরির চামড়ার কদরই সবচেয়ে বেশি।
দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে ক্রাস্ট লেদার। ওয়েট লেদারকে কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রসেসিং করে ক্রাস্ট লেদার তৈরি করা হয়। তবে ক্রাস্ট লেদার করে ফেলার পর সেটিকে আর খুব বেশি রূপান্তর বা পরিবর্তন করা যায় না। একটি নির্দিষ্ট চকে রাখতে হয়।
চামড়ার তৃতীয় ধাপ হচ্ছে ফিনিশড লেদার। প্রসেসিং এর সব ধাপ শেষ করে ফিনিসড লেদার তৈরি করা হয়। ফিনিসড লেদার যদি জুতার জন্য করা হয় তাহলে জুতা তৈরিতে আর ব্যাগের জন্য করা হলে ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহার করতে হয়। ক্রাস্ট লেদারকে ফিনিসড লেদার করার সময় নির্দিষ্ট করতে হয় যে কি কাজে ব্যবহার করতে হবে। ফিনিসড লেদারকে আর ভিন্ন খাতে নেয়ার সুযোগ থাকে না।
বাংলাদেশ থেকে ওয়েট ব্লু লেদার বা কাঁচা চামড়া রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয় ১৯৯০ সালের দিকে। আর একই সাথে দেশের চামড়া খাতের ভাগ্য বিপর্যয়ও শুরু হয়। দেশিয় শিল্পের বিকাশের কথা বলে সরকারকে দিয়ে এই কাজটি করানো হলেও কার্যতঃ পুরো খাতটি সংঘবদ্ধ একটি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়া হয়। ওয়েট ব্লু লেদার রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর ক্রাস্ট লেদার এবং ফিনিশড লেদার রপ্তানি হচ্ছিল বিদেশে। কিন্তু এক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয় দেশিয় ট্যানারিগুলোতে। বাংলাদেশের ট্যানারির মেশিনগুলো বহু পুরনো। এসব মেশিনের ফিনিসড লেদার চায়নার সর্বাধুনিক মেশিনের ফিনিসড লেদারের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। চীনের ট্যানারিগুলো আধুনিক মেশিন ব্যবহারের কারণে প্রসেসগুলো অনেক সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে করতে পারে। বাংলাদেশের চামড়াগুলো পুরনো মেশিনে প্রসেস করার কারণে চীনের চামড়ার মতো হয় না। ফলে বিদেশি বায়াররা এসব চামড়ে কিনতে চান না। তারা বাংলাদেশ থেকে ওয়েট ব্লু চামড়া কিনতে চান। যা দিয়ে তারা আধুনিক মেশিনে নিজেদের চাহিদা মোতাবেক ফিনিসড লেদার তৈরি করবে। অথচ প্রচলিত আইনের কারণে বাংলাদেশ ওয়েট ব্লু লেদার বা কাঁচা চামড়া রপ্তানি করতে পারে না। শুধুমাত্র ওই আইনটির কারণে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প ধ্বংস হচ্ছে উল্লেখ করে একাধিক ব্যবসায়ী বলছেন, বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার বিশ্বব্যাপী কদর রয়েছে। কদর রয়েছে চীন-ভারতে। তারা বলেন, যদি শুধু চীন ও ভারতেই এসব চামড়া রপ্তানি করা যেত তাহলে এভাবে হাজার হাজার পিস চামড়াকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দিতে হতো না।

x