স্মৃতির চট্টগ্রাম

মঈনুল আলম

বুধবার , ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ
62

চট্টগ্রামেই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নপতাকা উড়েছিলো!

১৯৭১এ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পূর্বে ৩রা মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসাগরে দেওয়া ভাষণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি করেন। এই দাবি আদায়ে বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশে প্রত্যহ সকাল ৬টা হতে অপরাহ্ন ২টা পর্যন্ত হরতাল ঘোষণা করলেন।

৪ঠা মার্চ ভোর হতে এক অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত সার্বিক হরতালে চট্টগ্রামের সকল কর্মকাণ্ড এবং জনজীবন স্তব্ধ হয়ে গেল। আমার সাংবাদিকতা জীবনে এমন পিকেটিংহীন সার্বিক হরতাল আর কখনও দেখিনি। ঢাকার ইত্তেফাক অফিস হতে জানলাম, বাংলাদেশের সকল রাস্তার তখন একটিই দিকনির্দেশ হয়েছে: ধানমন্ডির ৩২ নংএর দিকে, বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষের কর্ণ নিবিষ্ট রয়েছে একটি ধ্বনির দিকে: একটি মুজিবরের কণ্ঠ।

দুপুরের দিকে খবর পেলাম, ঝাউতলা ওয়ারলেস কলোনী হতে পাহাড়তলীর দিকে অবাঙালি ও বাঙালিদের মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষ, গৃহে আগুন দেওয়া এবং গুলিবর্ষণ হচ্ছে। আরও খবর পেলাম, অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অধিকাংশই বাঙালি! পায়ে হেঁটে গেলাম চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। অপরাহ্ন, ইতোমধ্যেই হাসপাতালে এত লাশ এসে গেছে যে মর্গের সামনে বড় কক্ষটিতে লাশ একের উপরে দুইতিন স্তর করে রাখার পরেও বাইরে মেঝেতে রাখতে হচ্ছে! অধিকাংশ লাশই লুঙ্গিপরা অর্থাৎ বাঙালি! কয়েকটা ফুলপ্যান্ট পরা লাশও দেখলাম। কিছু লাশ সম্পূর্ণ উলঙ্গ।

লাশের গাদাগাদির মধ্যে পা দিয়ে উঠে কয়েক জন ধাঙর স্বজনহারা আত্মীয়দের অনুরোধে কোন কোন লাশের মুখ ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে পরিচিত মুখ কিনা। অনেকগুলো ফটো উঠালাম। চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহত অসংখ্য মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছি; কিন্তু মানুষের দ্বারা হত্যা করা এত মানুষের লাশ গাদাগাদি করে পড়ে থাকতে কখনো দেখিনি। ডাক্তারদের কাছ হতে জানলাম অধিকাংশ লাশই বুলেটবিদ্ধ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র হতে গুলিবর্ষণ করে নিরস্ত্র মানুষকে (বাঙালিকে) হত্যা করা হয়েছে।

ইউনিফর্ম পরা এক পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন, কোতোয়ালি থানার ও,সি, এম, , খালেক। মুখ কালো, গম্ভীর। ঠোঁটের উপরে ঠোঁট দৃঢ়ভাবে চেপে বসেছে। ভিতরে দাঁত কিড়মিড় করাতে দু’পাশের চোয়ালের পেশী ফুলে উঠেছে। বললেন, “অবস্থা দেখছেন? নিরস্ত্র বাঙালিদের কুকুরের মত গুলি করে মারছে! আমরা কি কিছুই করতে পারি না?”

লাশগুলোকে পেছন করে দাঁড়িয়েছেন। “এগ্যেইনস্ট লাইট” এ দাঁড়ানোতে ও,সি, খালেকের দীর্ঘ দেহ ‘সিল্যুট” (ছায়া) হয়ে ফুটে উঠেছে, যেন কালপুরুষ। মনে হলো বাঙালিদের প্রতিবাদের এক ইউনিফর্ম পরা প্রতীক। বললাম, ‘ফটো তুলব?” ওসি বললেন, “তোলেন। অন্তত লাশের সাক্ষী হয়ে থাকবো।” ছবি তুললাম, আলোর বিপরীতে হওয়ায় ছবি ভাল হলো না। তবে আমার প্রিয় ছবি হয়ে রইলো।

ওসি খালেক শুধু এই লাশগুলোর সাক্ষী হয়েই রইলেন না, মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামে বাঙালির প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধে শহীদ হয়ে চির সাক্ষী হয়ে রইলেন। এপ্রিলে পাক সেনাদের হাতে চট্টগ্রামের পতনের পর কোতোয়ালির ওসি খালেককে বন্দী করা হয় এবং নিষ্ঠুরতম নির্যাতনে হত্যা করা হয়!

৪ঠা মার্চ নির্বিচারে নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা করার প্রতিবাদে লালদিঘির ময়দানে স্বতঃস্ফূর্ত বিপুল গণ জমায়েত অনুষ্ঠিত হলো। মানুষে মানুষে লালদিঘি ময়দান পূর্ণ হয়ে উপচে পড়া জনতা পুলিশ পাহাড় ছেয়ে ফেলেছে। এই গণ জামায়েতে কোন দলীয় পতাকা উড়লো না। পাকিস্তানের পতাকার তো প্রশ্নই উঠে না। উড়ল শুধু একটি পতাকা, যা ইতোপূর্বে কেউ দেখেনি। সাদা কাপড়ের উপর রক্তে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র! ধীরে ধীরে পতাকা উত্তোলন করলেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম, আর, সিদ্দিকী। বিকেলের সোনালী রোদে জ্বলজ্বল করে উঠলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্ন পতাকা বীর চট্টলার বুকে। রক্তাক্ত বাংলাদেশের মানচিত্রের নীচে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন, শপথ নিলেন আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগ ও অন্যান্য দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। সমগ্র দেশ যখন অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা এবং আশঙ্কায় দোদুল্যমান, তখন চট্টগ্রাম প্রত্যয়ের দৃঢ় লক্ষ্য নিয়ে উড়ালো স্বাধীন দেশের স্বপ্ন পতাকা। চট্টগ্রামের এই যাত্রা শুরু সমগ্র জাতিতে ছড়িয়ে পড়লো চট্টগ্রাম হতে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের মাধ্যমে এবং যা দশ মাসে পূর্ণতা পেলো ১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ এ স্বাধীন বাংলাদেশ এর বাস্তবায়নে।

লেখক : চট্টগ্রামের প্রবীণতম সাংবাদিক, প্রবাসী।

x