স্মৃতিতে ধরে রাখার মত উপভোগ্য রেলযাত্রা

এস. কে. বসাক, এফসিএ

শনিবার , ২৪ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
114

যাত্রা পথ হচ্ছে টরেন্টো ইউনিয়ন স্টেশন থেকে মন্ট্রিয়েল সেন্ট্রাল স্টেশন পর্যন্ত মোট ৫ ঘণ্টার ৩১৪ মাইলের একটা আরামদায়ক ভ্রমণের অভিযাত্রা। ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডায় ট্রেন ভ্রমণ খুবই আরাম দায়ক। বিমানের মত সিকিউরিটি তল্লাশির কোন বিড়ম্বনা নেই তবে ব্যাগেজ নেয়ার ক্ষেত্রে বাজেটেড এয়ার লাইন্সের মত ৩০ কেজির উপরে ল্যাগেজ নিলে বাড়তি ভাড়া গুণতে হবে। আমাদের টিকেট ছিল ৮ই জুন ২০১৯ দুপুর সোয়া ২ টা। টরেন্টো ইউনিয়ন স্টেশন থেকে উঠতে হবে। যেটা ডাউন টাউনে অবস্থিত। রাস্তায় অজস্র সিগনাল বাতি, ট্রাম চলাচলের উপদ্রব, ওয়ান ওয়ে রাস্তা, স্টেশনের কাছে এসে একটা রাস্তা মেরামতের জন্য বন্ধ হওয়ায় বিকল্প রাস্তায় স্টেশনে পৌঁছা, বাঙালি অধ্যুষিত স্কারবরো থেকে ডাঃ উত্তম জামাই বাবার গাড়িতে দেড় ঘণ্টায় আমাদের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো। ২.০৫ মিনিটে আমরা পৌঁছলাম স্টেশনের সামনে ৩টা ব্যাগেজ, ৩টা ক্যাবিন ব্যাগ, মেয়ে মনিকার রান্না করা খাবারসহ ৪ টা ক্যাবিন ব্যাগ, হাঁটু ব্যথার রোগ নিয়ে স্ত্রীসহ হুইল চেয়ার ছাড়া ট্রেন উঠবো কেমনে এই চিন্তায় ৫ মিনিট চলে গেলো। ছেলে সুসেন স্টেশনের ভিতরে গিয়ে চড়ৎঃবৎ যোগাড় করতে পারল না। জামাই বেআইনী জায়গায় হ্যাজার্ড জ্বালিয়ে গাড়ি রেখে স্টেশনের ভিতরে গিয়ে হুইল চেয়ারসহ পোর্টার নিয়ে আসলো। স্টেশনের ভিতরে পৌঁছতে পৌঁছতে পোর্টার বললো ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে আপনারা বিশ্রামাগারে বসেন।
ভয়ানক বিপদ একমাস আগে প্রতিটি ইকনমি ক্লাসের টিকেট কেনা হয়েছে ১২০ ডলার দামে। আগামী দিনের টিকেটের দাম প্রতিটি ২৫০ ডলার। মেয়ে, জামাই ও নাতনি খুব খুশি, আরো একদিন থাকতে পারবো। নাতনি নিধি জন্ম কানাডায় আমাদের প্রথম দেখেছে তাই বেজায় খুশি। চরম দুরন্ত। মামা সুসেনের সাথে খুব বনিবনা। জামাই বাবা ট্রেন ফেল করায় খুব বিব্রত বোধ করছে। সুসেনকে বলছে “টিকেট কাউন্টারে যাও, টিকেট মাস্টারকে বুঝাও বাবা, মা বুড়ো দেশ থেকে এসেছেন আমার কনভোকেশন দেখতে, দয়া করে কালকের বিকল্প টিকেট দিন”। টিকেট মাস্টার বয়স্ক ভদ্র মহিলা বললেন, আগামী কালকের প্রতিটি টিকেটের দাম ২৫০ ডলার। ওখানে সকল সময়ে টিকেট মূল্য ফিক্সড থাকে না। ছেলে বললো আমি ছাত্র দয়া করে বিকল্প টিকেট দিন।
ভদ্র মহিলা একটু ইতঃস্তত করে জিজ্ঞাসা করলো টিকেট না হয় দিলাম কিন্তু রাত্রে থাকবে কোথায় ? ছেলে বললো, আমার আত্মীয়-স্বজন কারো বাসায় রাত্রে থাকবো। তিনি আরো বললেন আজকের মতো ভুল আর করবে না। স্টেশনে ২ ঘণ্টা আগে পৌঁছবে। ল্যাগেজ ওজন চেক করে স্টিকার লাগিয়ে নেবে। এ রকম অনাত্মীয় শুভাকাঙ্ক্ষী কোথায় পাওয়া যায়। বিনে পয়সায় পরের দিনের সার্ভিস টিকেট পেয়ে খুব শান্তি লাগলো সবার। ট্রেনের টিকেট মিস করলে সিট খালি থাকা সাপেক্ষে বিকল্প টিকেট পাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার জন্য এই প্রথম। ওদিকে মন্ট্রিয়েলে আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজন রাত্রী বেলার রান্নার আয়োজন (যা পরের দিন ৯ জুন জামাই ষষ্ঠীতে রূপ নেয়) ও শনি, রোববারের পর্যটনের জন্য আরামদায়ক বড় গাড়ি ভাড়া করে রেখেছে। ট্রেন মিস করে সব ভণ্ডুল হয়ে গেল। আগের দিনের আতংকে ৯ জুন আমরা ইউনিয়ন স্টেশনে ২ ঘণ্টা আগে পৌঁছলাম। ল্যাগেজ মেপে রিডিস্ট্রিবিউট করে স্টিকার লাগিয়ে প্রস্থান সময়ের জন্য ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করতে থাকলাম। ট্রেন যাত্রার সময়, গেইট নম্বর মনিটরে ও মাইক্রোফোনে ঘোষণা করছে। আমাদের তল্পিতল্পা বেশি হওয়ায় ও হুইল চেয়ার এর প্রয়োজন থাকায় লাইনে না দাঁড়িয়ে হেল্প ডেক্সের সহায়তা চাইলাম। তারা বললেন যথা সময়ে তারা আসবেন।
০৬৬ নং ট্রেনে ওঠার জন্য ইতোমধ্যে ১ ঘণ্টা আগে লোকে লাইনে দাঁড়িয়েছে। হেল্প ডেক্সের লোকগুলো আমাদের আশেপাশে আছে কিন্তু আমাদের দিকে মনোযোগ না দেওয়ায় আমরা বারবার বসা থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছিলাম, গতকালকের মতো ট্রেন মিস করার ভয়ে। হেল্প ডেক্সে লোক বদল হলে তাকেই বলি হেল্প করার জন্য কিন্তু সবার একই উত্তর যথাসময়ে আসবো। যথা সময় কোনটা কেউ বলে না। শেষতক ট্রেন ছাড়ার ১৫ মিনিট আগে এলেন।
পোর্টার লোহার ট্রলিতে সব ল্যাগেজ নিলেন হুইল চেয়ার ধরলো ছেলে, আমি ২ টি কেবিন ব্যাগ নিয়ে পোর্টারকে অনুসরণ করতে থাকলাম। সে দেখি বিকল্প পথে সহসা বগির মুখে নিয়ে গেল এবং সব কয়টা ল্যাগেজ তুলে বগিতে লাগেজ রাখার জায়গায় সারিবদ্ধভাবে রেখে দিল। আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মানি ব্যাগে হাত দিচ্ছিলাম কিছু ডলার বকশিস দেওয়ার জন্য, কিন্তু ছেলে বারণ করল এই বলে যে, ওটা তার কাজ, এজন্যে সে বেতন পায়। বকশিষ দেয়া বেআইনী এই দেশে। ট্রেনে ফ্যামিলি সিটে (সামনে টেবিল দেয়া) বসতে পেরে বেশ ভালো লাগলো।
ফ্যামিলি সিট চেয়ে নিতে হয় না টিকেট মাস্টার ফ্যামিলি দেখলেই সিট দিয়ে দেন। একটা বগিতে ন্যূনতম ৪টা টেবিল দেয়া সিটের ব্যবস্থা আছে। ট্রেনের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬৩ মাইল। ইউনিয়ন স্টেশন ডাউন টাউনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ট্রেন ছাড়ার পর রাস্তার দুই দিকে টরেন্টো মেগা সিটির ঐতিহাসিক স্কাই স্কেপারসমূহ (সুউচ্চ বাণিজ্যিক দালান), সি এন টাওয়ার, বিভিন্ন ব্যাংকের ও কোম্পানীর হেড অফিস, অফিস, মলসহ অনেক দৃষ্টিনন্দন দালান কোঠা দেখা যায় যাহা আধুনিক শহরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে। দিবালোকে দুই পার্শ্বে মনোরম দৃশ্য – লেইক, চলমান বড় বড় হরেক রকম রাস্তা, ব্রিজ, বাসা বাড়ি, কলকারখানা, দীর্ঘ সোলার প্যানেল।
অন্টারিও প্রদেশ থেকে কুইবেক প্রদেশ দুটো প্রদেশেই মার্কিন সীমান্ত লাগোয়া। এই গ্রীষ্মে সবুজের সমারোহ চারিদিকে প্রকৃতির অপার দৃশ্য চোখ ফেরানো যায় না। কিন্তু বাংলাদেশের কোন বৃক্ষরাজির সাথে মিল নাই। ট্রেন ছাড়ার পর মাইক্রোফোনে স্বাগত ঘোষণা ভ্রমণ বৃত্তান্ত, বাইরের তাপমাত্রা, যেকোন সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি। পুরো ট্রেনে ফ্রি ওয়াই ফি ইন্টারনেট যুক্ত আছে।
এর পরপরই ক্যাটারার টেবিলে টেবিলে পরিশোধযোগ্য নাস্তার ম্যানু দিয়ে গেল। হালকা, ভারী সব নাস্তাই আছে যেমন, কোক, কফি, চা, ডোনাট, প্যাটিস, ভ্যাজ প্যাটিস, বিস্কুট, চিপস ইত্যাদি। গার্ড সাহেব টিকেট দেখতে আসলেন, ম্যাগনেটিক লাইটযুক্ত কি একটা দিয়ে টিকেটের উপর আলো ফেললেন।
আমরা এই সুবাদে কথা বলার সুযোগ পেয়ে ওনাকে জিজ্ঞাসা করলাম মন্ট্রিয়েলের আগের স্টেশন ডোরভাল এ আমরা নামতে পারব কিনা। উনি বললেন কেন নয়। আমার ছেলে বললো আমাদের ৩টা ল্যাগেজ, ৩ টা ক্যাবিন ব্যাগ, তার মার জন্য হুইল চেয়ার। এই স্টেশনে নামলে আমার শ্বশুরবাড়ি কাছে হয়। তাই মাঝ পথে নামা, সময়টাও সেভ হয়। বিলম্বিত নিমন্ত্রণ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে রুন্টির বাড়িতে (আমার সম্বন্ধির ছেলে)।
এখানে উল্লেখ্য যে, ডারভাল স্টেশনের কাছেই মন্টিয়েল ট্রুডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। গার্ড সাহেব সানন্দে বললেন অবশ্যই আপনাদের ডারবান স্টেশনে নামিয়ে দেবো, কোন চিন্তা নাই। আমার স্ত্রী বললো আমি তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে ট্রেন থেকে নামতে পারবো না, শেষ স্টেশন মন্টিয়েল এ চলো, আস্তে ধীরে নামা যাবে। সুটেড ও বুটেড গার্ড সাহেব বললেন কোন অসুবিধা নাই, আমি সবাইকে নিরাপদে নামিয়ে দেব, হুইল চেয়ার থাকবে। রুন্টিকে মোবাইলে বললাম তুমি আমাদের ডোরভাল স্টেশনে নিতে আসো।
আবারো অজানা আশংকা, গার্ড ঠিকমতো নামাবে তো। ভ্রমণে অসুস্থতা ও বাড়তি ল্যাগেজের বিড়ম্বনা কখনো স্বস্তিদায়ক হয় না। বিশ্বস্ত গার্ড সাহেব দেখি আমাদের গন্তব্যের স্টেশন পৌঁছার ১০ মিনিট আগে আমাদের সিটের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রেন ডারভাল স্টেশনে থামলো, উনি আমাদের নামতে আহবান জানালেন। আমরা হাত ব্যাগ নিয়ে নামলাম।
গার্ড সাহেব সহাস্যে সব ল্যাগেজ নামিয়ে দিলেন। হুইল চেয়ার প্রস্তুত ছিল। ট্রেন মনট্রিয়েলের পথে ছাড়তেই গার্ড সাহেব আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন আমরাও হাত নাড়লাম। মুগ্ধ করার মতো সার্ভিস, নিখরচায় বিকল্প টিকেট পরের দিন, সব মিলে স্মৃতিতে ধরে রাখার মত সাড়ে চার ঘণ্টার দৃষ্টিনন্দন, উপভোগ্য ও আরামদায়ক রেল যাত্রা।

x