স্মরণ : অধ্যক্ষ আল্লামা ক্বারী নূরুল আলম খান (রহ)

আ ব ম খোরশিদ আলম খান

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ
24

বরেণ্য শিক্ষাবিদ অগণিত আলেমের উস্তাদ বা শিক্ষাগুরু ছিলেন অধ্যক্ষ আল্লামা ক্বারী নূরুল আলম খান (রহ)। সত্তর বছরের দীর্ঘ জীবনে বহু মাদ্রাসার অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ হিসেবে আজীবন ইলমে দ্বীনের খেদমতে, দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে ও সুন্নিয়তের প্রচারে তিনি নিবেদিত ছিলেন। অত্যন্ত সাদাসিধে ও প্রচারবিমুখ এই ব্যক্তিত্ব জীবনভর দ্বীনি চেতনায় আলোকিত মানুষ গড়ার মিশনে নিজেকে উৎসর্গীত রাখেন। চট্টগ্রাম চান্দগাঁওয়ে শাহজি হুজুর কেবলা (রহ) প্রতিষ্ঠিত আল আমিন বারীয়া মাদ্রাসাকে ইবতেদায়ী হতে ফাযিল (ডিগ্রি সমমান) পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন এ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। কর্মজীবন ও শিক্ষকতা জীবনে সিংহভাগ অর্থাৎ ১৮ বছর ধরে তিনি বারীয়া মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ ছিলেন। মাদ্রাসা ও খানকার পাশে অবস্থিত মসজিদের (বর্তমানে মসজিদে সনজরি) খতিবও ছিলেন। জুমার দিনে তাঁর মোহনীয় সুরেলা কণ্ঠের খুতবাহ ও ক্বেরাত শুনে সবাই মুগ্ধ হতেন। এক ঐতিহাসিক দিনে অধ্যক্ষ আল্লামা ক্বারী নূরুল আলম খানের জন্ম। ১৯৪৭ সনের ১৪ আগস্ট তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভ্রান্ত খান বংশে তাঁর জন্ম। চট্টগ্রাম চকবাজার নবাব ওয়ালি খান বেগ প্রকাশ অলি খাঁ (তাঁর নামে অলি খাঁ মসজিদ) এর ৬ষ্ঠ অধঃস্তন পুরুষ হলেন আল্লামা ক্বারী নূরুল আলম খান (রহ:)। তাঁর পিতা ছিলেন অত্যন্ত বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব দরবেশ মৌলভী মুহাম্মদ নূরুল হোসাইন খান (রহ)। পিতামহ হলেন ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ আবদুল গফুর খান। তাঁরা সকলের আদি নিবাস চট্টগ্রাম বোয়ালখালী উপজেলার খরন্দ্বীপ ইউনিয়নের মুন্সিপাড়া গ্রামে। অধ্যক্ষ আল্লামা নূরুল আলম খানের (রহ) পিতা দরবেশ মৌলভি নূরুল হোসাইন খান (রহ) একজন দ্বীন প্রচারক ও সাধক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দ্বীন প্রচারের এক পর্যায়ে চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জের টোরাগড় গ্রামে গিয়ে তিনি বসবাস শুরু করেন। তাঁর বিশেষ ইবাদত বন্দেগি ও বুজুর্গি দেখে সেখানকার অধিবাসীরা তাঁকে ‘দরবেশ সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ওখানে তিনি সংসার জীবন শুরু করেন। তবে নাড়ির টানে বোয়ালখালীর খরন্দ্বীপের পূর্ব পুরুষের বাড়ির কথাও ভুলে থাকতে পারেননি। অধ্যক্ষ খান (রহ) এর পৈতৃক নিবাস যেমন বোয়ালখালীর খরন্দ্বীপে, তেমনি তাঁর নানার বাড়ি হচ্ছে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে। পরবর্তীতে তাঁর স্থায়ী নিবাস হয় চন্দনাইশের উত্তর হাশিমপুর সৈয়দাবাদ গ্রামে। তবে বোয়ালখালীতে এখনো তাঁর পূর্ব পুরুষের আত্মীয়-স্বজনের বসবাস রয়েছে।
অধ্যক্ষ আল্লামা ক্বারী নূরুল আলম খান (রহ) ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। বিভিন্ন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন তিনি। আল্লামা মোস্তফা আল হামিদি (রহ) নামে একজন বর্ষীয়ান আলেম শায়খুল হাদিস হিসেবে ছিলেন কুমিল্লা গাজিমোড়া আলিয়া মাদ্রাসায়। তিনি ছিলেন হাফেজুল হাদিস অর্থাৎ শত শত হাদিস তাঁর মুখস্থ ছিল। শায়খুল হাদিস আল্লামা মোস্তফা আল হামিদির কাছ থেকে হাদিসের পাঠ নিতে আল্লামা নূরুল আলম খান (রহ) কুমিল্লা গাজিমোড়া আলিয়া মাদ্রাসায় কামিল (হাদিস) শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে এখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ১৯৭০ সনে মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদ লাভ করেন। তিনি গর্ব করে বলতেন,আমি নকল ছাড়াই ইবতেদায়ী থেকে কামিল পর্যন্ত সকল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করে এসেছি। কখনো কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হইনি। আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্রে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ও পাণ্ডিত্য দেখে সত্যিই মুগ্ধ হতে হয়। বিভিন্ন জটিল কঠিন কিতাবের জ্ঞান তাঁর আয়ত্তে ছিল।
কামিল শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবার পর আল্লামা নূরুল আলম খান (রহ)’র কর্মজীবন ও শিক্ষকতা জীবন শুরু হয় চট্টগ্রাম বোয়ালখালী খরন্দ্বীপে অবস্থিত ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসায়। তিনি কিছুদিন এ মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ ছিলেন। এ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হলেন পীরে তরিকত উস্তাজুল উলামা আল্লামা মুফতি ইদ্রিস রজভি (মজিআ)। এ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা কালে কর্ণফুলীর উত্তর পাড়ে অবস্থিত বাগোয়ান পাঁচখাইন গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবী ও ব্যবসায়ী আলহাজ্ব মুহাম্মদ এমদাদুল হকের কনিষ্ঠ কন্যার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন আল্লামা নূরুল আলম খান (রহ)। সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত শুনে তাঁর শ্বশুর অনেকটা যেঁচেই নিজ কন্যাকে পাত্রস্থ করেন। আর এই বিয়ের নেপথ্যে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেন পীরে তরিকত উস্তাজুল উলামা আল্লামা মুহাম্মদ নূরুল আলম হেজাজী (মজিআ)। শিল্পপতি-ইসলামী চিন্তাবিদ আলহাজ্ব সূফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঙ্গে আল্লামা খান (রহ) এর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। একদিন সূফী সাহেব তাঁর কাছে জানতে চাইলেন জ্বিনজাতির আবাস কোথায়। ‘বদাইয়ুজ জহুর ফি ওয়াকায়িদিদ দহুর’ কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি তাঁকে জ্বিন জাতির ইতিহাস জানালেন। সেই দিন থেকে সূফী সাহেব তাঁকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখেন। আল্লামা নূরুল আলম খানের (রহ) খ্যাতি, গভীর জ্ঞান ও ইলমের কথা অনেকেই জেনে যায়। চান্দগাঁও বারীয়া দরবার শরিফের সাজ্জাদানশিন পীরে তরিকত শাহসূফি মাওলানা সৈয়দ আবদুল বারী শাহজী (রহ) এর সঙ্গে ইত্যবসরে তাঁর পরিচয় ঘটে। শাহজি হুজুর (রহ) বললেন, আপনি আমার দরবারে চলে আসুন। আপনাকে দিয়ে আমি একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। তিনি তাতে সম্মতি দিয়ে বারীয়া দরবার শরিফে চলে আসেন। এরপর ইবতেদায়ী হতে ফাযিল শ্রেণি পর্যন্ত বারীয়া মাদ্রাসাকে তিলে তিলে গড়ে তুললেন তিনি। তিনি ছিলেন সততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। ১৮ বছরের কর্মজীবন শেষে ১৯৯০ সনে বারীয়া মাদ্রাসা হতে বিদায়কালে শুধুমাত্র আট আনা পয়সার হিসাব দিতে পারেননি তিনি। একথা বহুজনকে বলেছিলেন শাহজি পীর সাহেব (রহ)।
স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় যারা অধ্যক্ষ- উপাধ্যক্ষ হিসেবে থাকেন তারা প্রশাসনিক দায়িত্বের অজুহাতে তেমন ক্লাস নেন না। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী গুণের অধিকারী ছিলেন অধ্যক্ষ আল্লামা ক্বারী নূরুল আলম খান (রহ)। অধ্যক্ষ হিসেবে শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত ক্লাস নিতেন। কোনো ক্লাসে শিক্ষক নেই দেখলে নিজেই ক্লাসে ঢুকে পড়তেন। বাংলা-ইংরেজি বিষয়েও তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। বারীয়া মাদ্রাসার এক শিক্ষক একদিন লাইব্রেরি এই শব্দটির ইংরেজি বানান ভুল লিখেছিলেন তাঁর এক দরখাস্তে। সহাস্যে তাঁর ভুল শুধরে দিলেন এই অধ্যক্ষ মহোদয়। কিন্তু এই শিক্ষককে লজ্জিত হওয়ার সুযোগ তিনি দেননি। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এবং বিভিন্ন মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে সরলতার সুযোগে অনেকেই তাঁর ক্ষতি করতে চাইলেও তিনি কখনো কারো ওপর প্রতিশোধ নেননি। অনেক দুঃখ-কষ্ট নীরবে হজম করে নিজ দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রতি সনিষ্ঠ ছিলেন। শেষ বিচারে জয়ী হয়েছেন তিনি। ষড়যন্ত্রকারীরা নানাভাবে করুণ নিয়তির মুখোমুখি হবার বাস্তব নমুনা দেখা গেছে।
বারীয়া মাদ্রাসা থেকে আল্লামা খান (রহ) কে সসম্মানে আনা হলো বায়েজিদ আহছানুল উলুম জামেয়া গাউছিয়া ফাযিল মাদ্রাসায়। খুবই দুঃসময়ে খান সাহেব হুজুরকে কাছে টেনে নিলেন ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা কাযী মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম হাশেমী হুজুর কেবলা (মজিআ)। আরো বেশ কয়েকটি মাদ্রাসায় তিনি অধ্যক্ষ ছিলেন। আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়ার তৎকালীন সহসভাপতি আলহাজ্ব এম এ ওহাব আলকাদেরী (বর্তমানে প্রয়াত) অধ্যক্ষ হুজুরকে খুবই ভালোবাসতেন। বারীয়া মাদ্রাসায় থাকাকালেই দুজনের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তিনি বাকলিয়া আহমদিয়া করিমিয়া সুন্নিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদ ছেড়ে এবং শহীদনগর মসজিদ থেকে অব্যাহতি নেয়ার পর আনজুমানের ওহাব সাহেবের পরামর্শানুযায়ী আনজুমান পরিচালিত তৎকালীন দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার মহেশখালী পুটিবিলা ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। সেখানে থাকেন আড়াই বছর। ১৯৯৭ সনে আনজুমান ট্রাস্ট পরিচালিত চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর মাদ্রাসা এ তৈয়বিয়া সুন্নিয়া ফাযিল এর অধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত হন। অত্যন্ত স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পন্থায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জন করে তিনি তৈয়বিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করেন। অনেক বাধা, চক্রান্ত ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তৈয়বিয়া মাদ্রাসায় পাঁচ বছর অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। বারে বারে নিজে জুুলুমের শিকার হলেও দীর্ঘ অধ্যক্ষ জীবনে কারো ওপর তিনি জুলুম চাপিয়ে দেননি। কাউকে চাকরিতে হয়রানি করেননি। অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে কারো চাপে কোথাও অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেননি। পূর্ণ সততা, দায়িত্বশীলতা, যোগ্যতা-দক্ষতার সঙ্গে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি। মাদ্রাসা বোর্ড বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো নিয়মমাফিক তদন্তে তাঁর কাছ থেকে কোনো অসাধুতার প্রমাণ কখনো মেলেনি। মাদ্রাসার অর্থ লেনদেনে তিনি সাবধানতা অবলম্বন করতেন। নিজে ক্যাশ রাখতেন না। মাদ্রাসার ক্যাশিয়ারের কাছেই যথানিয়মে ক্যাশ তদারকির দায়িত্ব দিয়ে তিনি ঝামেলামুক্ত থাকতে চাইতেন। টানা ২০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চট্টগ্রাম হামজারবাগ শাহী জামে মসজিদের খতিব পদে ছিলেন তিনি। এই মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। ২০১৭ সনের ১৩ জুন (১৭ রমজান) তিনি ইহজীবন থেকে বিদায় নিলেও কর্মগুণেই তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন যুগ যুগ ধরে।
লেখক: সাংবাদিক

x