স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করতে হবে

বুধবার , ৩ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:০০ পূর্বাহ্ণ
27

পৃথিবীর সব দেশেই নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার নিমিত্তে বিভিন্ন রকম নীতিমালা ও কর্মপদ্ধতি বিরাজমান। এটি প্রধানত ওই নির্দিষ্ট রাষ্ট্রটির অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। এতে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো বিরাজমান। সামগ্রিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের অনেক রকম কার্যকরী ও ফলপ্রসূ কাঠামো প্রতিষ্ঠিত আছে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক কাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। সারা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পেতে ব্যর্থ। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রতিটি মানুষেরই তার প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার আছে এবং যে কোনো বিবেচনাতেই এর ব্যত্যয় করার সুযোগ নেই। কোনো কোনো দেশে বিত্তবানদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নাগালের মধ্যে আছে বা যারা স্বাস্থ্যসেবা কিনতে পারছে, তারাই আদর্শমানের স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষ অনেক সময়ই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পেতে ব্যর্থ হয়।
বিশ্ব-স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে কাজাখিস্তানের আলমাআটা শহরে ‘সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা’ প্রণয়ন করা হয় যাতে স্বাস্থ্যসেবাকে সার্বজনীন করে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা যায়। প্রাইমারি হেলথ-কেয়ারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিলো ২০০০ সাল পর্যন্ত যেখানে কমিউনিটির সকলের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতায় সকল সেক্টরের সমন্বয়ে যথোপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারে ন্যায্যতার-ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মূলনীতিতে ‘অতিপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা’ নিশ্চিত করা হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জোরালোভাবে প্রস্তাব করছে, পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্র অবশ্যই সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নীতি চালু করবে। যাতে করে কোনো একজন মানুষও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে না থাকে। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পেতে গিয়ে বছরে বিভিন্ন দেশে কমপক্ষে এক কোটি মানুষ ১.৯ ডলারের কম উপার্জনক্ষম মানুষের বলয়ে ঢোকে, অর্থাৎ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। গড়ে ৮ কোটি মানুষ তার প্রাত্যহিক মোট খরচের ১২ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যসেবার জন্য খরচ করে। এটি একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। উন্নত দেশগুলোর নাগরিকরা ব্যক্তিগতভাবে অথবা রাষ্ট্রীয় পলিসির কারণে এ স্বাস্থ্যসেবাটুকু নিতে সমর্থ হয়। এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা- এসব মহাদেশের রাষ্ট্রগুলো বা এদের জনগণ এ সুবিধা দিতে বা পেতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বলতে সব মানুষের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বুঝায় যাতে করে তাকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে না হয়। একই সঙ্গে এটি সব মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রাপ্তির বিষয়টি বুঝায় না। এটি আসলে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা নীতিকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে উৎসাহ দেয়া হয় যাতে করে যে কোনো রাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করে সব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। এখানে স্বাস্থ্যসেবা বলতে শুধু ওষুধ প্রদানকে বুঝায় না : ক. বর্তমানের সব রোগীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, খ. সম্ভাব্য সব অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনা, গ. মৌসুমভিত্তিক সংক্রামক রোগের সময়োচিত প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, ঘ. জীবনব্যাপী সব মানুষের আদর্শ সু-স্বাস্থ্য বজায় রাখা সব প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা বুঝায়।
এমডিজি অর্জনে সাফল্য সর্ব-মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এমডিজি এর সফলতাকে কাজে লাগিয়ে, এর অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের এসডিজি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। ন্যায্যতার-ভিত্তিতে গুরুত্ব সহকারে সমস্যাগুলোকে বিবেচনা করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে রাষ্ট্র এবং জনগণের ক্ষেত্রে ব্যক্তি পর্যায়ে অর্থনৈতিক মুক্তিও অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে মাথাপিছু আয় বাড়ানোর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি অর্জনের জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশও প্রয়োজন। সর্বোপরি সুশাসনের উপর গুরুত্ব আরোপ করে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জীব-বৈচিত্র্য রক্ষার জন্য জনসচেতনতা তৈরি, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনে নারী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে সমাজের সকল স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠন করার মাধ্যমে সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনে এগিয়ে যেতে হবে। জনসাধারণের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিতদের দায়িত্ববোধ বাড়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা এবং এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

x