স্বামী বিবেকানন্দ ও শিকাগো বক্তৃতা

ড. উজ্জ্বল কুমার দেব

মঙ্গলবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:২৪ পূর্বাহ্ণ
241

স্বামী বিবেকানন্দ এমন একজন মহান ব্যক্তিত্ব যাঁর মহান চিন্তাধারা, আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও স্বদেশ প্রেম প্রত্যেক মানুষের মনে এক গভীর রেখাপাত করে। তাঁর অভূতপূর্ব দূরদর্শী মনোভাব মাতৃভূমির বিকাশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পা লন করেছিল সেই সময়কার দিনগুলোতে। স্বামী বিবেকানন্দ প্রদত্ত শিকাগো বক্তৃতা ইতিহাসে কয়েকটি বক্তৃতার অন্যতম। সমপ্রতি স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতার ১২৫ তম বৎসর সমাপ্তি হলো । ১২৫ তম বর্ষপূর্তি উৎসবের সূচনা হয়েছিল ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। তারই সমাপ্তি পর্ব উপলক্ষে চট্টগ্রাম রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম দুদিন ব্যাপি সমাপনী উৎসব আয়োজন করে গত ৩০, ৩১ আগস্ট। সমাপনী দিনে অতিথি ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকার অধ্যক্ষ স্বামী পূর্ণাত্মানন্দজী মহারাজ। উনি সমপ্রতি আমেরিকার শিকাগো শহরের কলম্বাস হলটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, যেখানে ১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্বামী বিবেকানন্দ সাড়া জাগানো প্রায় ৪ মিনিটের বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন।
মহারাজের বক্তৃতায় জানলাম, ১৮৯৩ সালে এ হলটিতে একসাথে পাঁচ হাজার লোক বসলেও বর্তমানে সে অবস্থা আর নেই। পুরো হলটিকে সাত/ আটটি ছোট হলে ভাগ করে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে যে জায়গায় স্বামী বিবেকানন্দ দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক বক্তব্যটি দিয়েছিলেন সেটি অক্ষত রেখে ৩০০-৪০০ মানুষ বসতে পারার জন্য ছোট আকারের হলঘর করে স্বামীজীর স্মৃতিকে রক্ষা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে উক্ত ধর্ম মহাসম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের বড় বড় ধর্মীয় প্রতিনিধিরা বক্তব্য দিলেও কারও স্মৃতি আর সেখানে নেয়, কিন্তু হল কর্তৃপক্ষ স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতি রক্ষা করেছেন। এতেই বুঝা যায়, স্বামীজী সেদিন যা বলেছিলেন তা কোন একটি বিশেষ ধর্মকে বড় করার জন্য না বরং সেটাতে বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা ছিল। যদিও সেদিন তিনি উপস্থিত ছিলেন সনাতন ধর্মের প্রতিনিধি হিসাবে- যে ধর্ম জগৎকে চিরকাল পরমতসহিষ্ণুতা ও সর্বাধিক মত স্বীকার করার শিক্ষা দিয়া আসছে।
১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩ দিনটি ছিল সোমবার। আমেরিকার শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউট হলের বিশ্ব ধর্মমহাসম্মেলনের আসরে বক্তা তালিকায় রয়েছেন খ্রিস্টান, ইসলাম, ইহুদি, ব্রাহ্ম, হিন্দু, বৌদ্ধ, শিল্টো, জরথ্রুষ্ট, তাও এবং কনফুসিয়াস ধর্মের সবমিলিয়ে দশটি ধর্মের প্রতিনিধি রয়েছে। আর এই কারণেই ঠিক বেলা ১০টায় দশবার ঘন্টা বাজিয়ে শুভ উদ্বোধন মুহূর্ত ঘোষিত হল। ঘোষণা মুহূর্তে মঞ্চে ছিলেন দশ ধর্মেরই দশজন বক্তা। তাঁদেরই একজন বীর সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ। পরনে ছিল লালচে রঙের পোশাক ও মাথায় গেরুয়া পাগড়ি। অন্য নয়জন বক্তার থেকে পোশাক, রঙ এবং চোখেমুখে ছিল তাঁর আলাদা এক দীপ্তি। আর সেই কারণেই কলম্বাস হলে থাকা হাজার পাঁচেক শ্রোতার নজর আলাদা করে বারে বারেই পড়ছিল তখনকার ভারতবর্ষ থেকে যাওয়া এই তেজদীপ্ত যুবক সন্ন্যাসীর দিকে।
স্বামী বিবেকানন্দের সে ঐতিহাসিক ভাষণটি ছিল সর্বধর্ম সমন্বয়ের জন্য ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। শিকাগোর বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, ‘খ্রিস্টানকে হিন্দু বা বৌদ্ধ হতে হবে না, কিন্তু প্রতিটি ধর্মই অন্যান্য ধর্মের সারভাগ গ্রহণ করে পুষ্টি লাভ করবে এবং স্বীয় বিশেষত্ব বজায় রেখে নিজ প্রকৃতি অনুসারে বর্ধিত হবে।’ কি অপূর্ব আহবান সর্বধর্ম সমন্বয় তথা জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠায়! তিনি আরও কঠোর ছিলেন কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে। স্বামীজীর মতে, দর্শনবর্জিত ধর্ম কুসংস্কারে গিয়ে দাঁড়ায়, আবার ধর্মবর্জিত দর্শন শুধু নাস্তিকতায় পরিণত হয়। ধর্ম মহাসম্মেলনে উদ্বোধনী ভাষণ শেষে তিনি বলেছিলেন,“সামপ্রদায়িকতা ও গোড়ামিগুলোর ভয়াবহ ফলস্বরূপ, ধর্মোম্মোত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুকাল অধিকার করে রেখেছে; পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করেছে। বারবার এটিকে নরশোনিতে সিক্ত করেছে। সভ্যতা ধবংস করেছে এবং জাতিসমূহকে হতাশায় মগ্ন করেছে। এ ভীষণ পিচাশগুলো যদি না থাকত, তা হলে মানব সমাজ আজ পূর্বাপেক্ষা অনেক উন্নত হত। তবে এর মৃত্যুকাল উপস্থিত এবং আমি সর্বোতভাবে আশা করি, এ ধর্ম মহাসমিতির সম্মানার্থে, আজ যে ঘন্টাধ্বনি নিনাদিত হয়েছে, তাই সর্ববিধ ধর্মোন্মত্ততা, তরবারী অথবা লেখনি মুখে অনুষ্ঠিত সর্বপ্রকার নির্যাতন এবং একই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর ব্যক্তিগণের মধ্যে সর্ববিধ অসদ্ভাবের সম্পূর্ণ অবসানের বার্তা ঘোষণা করুক।” শিকাগো সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দের উদ্বোধনী ভাষণে উপরোক্ত আশাবাদ ব্যক্তের একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিদ্যমান ছিল। আর তাহলো উগ্রজাতীয়তাবাদ, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ মিলিয়ে এমনভাবে মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছিল, সে সময়ের ইউরোপসহ সারাবিশ্বের মানবতাবাদ বিকাশের জন্য ব্যাপক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার প্রেক্ষিতেই স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর উক্ত বক্তৃতায় সমস্ত কিছুর অবসানের বার্তা দিয়েছিলেন। বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালেও আমরা দেখি, ধর্ম নিয়ে আজও পৃথিবী সন্ত্রস্ত। মৌলবাদীদের আস্ফালন সর্বত্র, মানুষের জীবন বিপন্ন। বিবেকানন্দ মন ও মুখের সত্যতায় স্পষ্টত জানান ‘ধর্ম মানুষের বন্ধু, তা কোনও শর্তাধীন নয়। বিনিময়যোগ্য স্বার্থের আদানপ্রদানে সঙ্কুচিতও নয়। ধর্ম বিবর্তনের পথেই এগোয়। ধর্ম সমাজের দায় বহন করে। নিরন্ন মানুষের জন্য অন্ন, অসুস্থ পীড়িতের জন্য ত্রাণ-সেবা, অনাথ-বিধবার অশ্রুমোচনের দায়িত্ব ধর্মকেই নিতে হয়’। সেই সময়ের উচ্চারিত চরম সত্য আজকের বাস্তবতায় ও মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠায় না মেনে উপায় নেই।
শিকাগোর ধর্ম মহাসম্মেলনের উদ্দেশ্য ও আদর্শ প্রসঙ্গে শেষ অধিবেশনে তিনি বলেছিলেন, “যদি এখানে কেহ এরূপ আশা করেন যে, বিভিন্ন ধর্মসমূহের মধ্যে একটির অভ্যুদয় ঘটবে এবং তা অপরগুলির বিনাশ দ্বারা সাধিত হইবে, তবে তাহাকে আমি বলি, ভ্রাতঃ তোমার আশা ফলবতী হওয়া অসম্ভব। আমি ইচ্ছা করি না যে, খৃষ্টান হিন্দু হউন অথবা হিন্দু বা বৌদ্ধ খৃষ্টান/মুসলিম হউন। কিন্তু প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্মগুলোর সারভাগ গুলিকে ভিতরে গ্রহণ দ্বারা পুষ্টি লাভ করিয়া আপনার বিশেষত্ব রক্ষাপূর্বক নিজের প্রকৃতি অনুসারে পরিবর্ধিত হইবে “। স্বামীজীর মতে পবিত্রতা, উদারতা, চিত্তশুদ্ধি প্রভৃতি সদগুণ সমূহ কোন ধর্মেরই নিজস্ব নহে এবং প্রত্যেক ধর্মেই উন্নত চরিত্র নরনারীর অবির্ভাব হইয়াছে। শীঘ্রই দেখিবেন সকল ধর্মের পতাকাশীর্ষে লিখিতে হইবে, ” বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি”। স্বামীজীর এই বাণী পুরো বিশ্বের প্রতি শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। নোবেল বিজয়ী ফরাসী উপন্যাসিক রোম্যা রোঁলা বলেছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দের বাণীগুলো কেউ শুয়ে পড়লে, তিনি উঠে বসেন। বসে পড়লে দাঁড়িয়ে যান। এবং দাঁড়িয়ে পড়লে দৌড়াতে থাকেন। এমন প্রেরণাদায়ী ছিল বাণীগুলো। মানুষের আত্মবিশ্বাস জাগানোর জন্য স্বামীজীর বাণীগুলো অত্যন্ত প্রেরণাদায়ী। প্রচলিত আছে, যে ঈশ্বর বিশ্বাস করেনা সে নাস্তিক কিন্তু স্বামীজী বলেন, যে নিজেকে বিশ্বাস করেনা সেই বড় নাস্তিক। অনেক সাহসী উচ্চারণ ছিল তা। আবার জীবনধারা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘অসংযত ও উচ্ছৃঙ্খল মন আমাদের নিয়ত নিম্ন থেকে নিম্নতর স্তরে নিয়ে যাবে এবং চরমে আমাদের বিধ্বস্ত করবে, ধ্বংস করবে। আর সংযত ও সুনিয়ন্ত্রিত মন আমাদের রক্ষা করবে, মুক্তিদান করবে।’ যুবকদের প্রতি এটি ছিল তাঁর চরম সাবধান বাণী। স্বামীজী গরীব দুঃখীদের দুঃখ দুর্দশা দেখে ব্যথিত হতেন। গরীব দুঃখীদের তিনি শিবজ্ঞানে সেবা করতেন। অসহায়দের জন্য তাঁর হৃদয়ে হত রক্তক্ষরণ। আর তা থেকেই রচনা করেছিলেন “সখার প্রতি” কবিতাটি। যার অন্তিম দুইটি চরণ আজও সবার মুখে মুখে – “বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? / জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” আর কাজী নজরুলের কবিতায়ও আমরা পায় তাঁর প্রতিধ্বনি – “কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই/ কাহারে মারিছ লাথি? / হয়তো উহারই বুকে ভগবান, জাগিছেন দিবা-রাতি। স্বামীজীর মতে নিম্নশ্রেণির জন্য আমাদের কর্তব্য হলো এই, কেবল তাহাদিগকে শিক্ষা দেয়া এবং তাহাদের বিনষ্টপ্রায় ব্যক্তিত্ববোধ জাগাইয়া তোলা। অর্থাৎ তারা যে মানুষ, সৃষ্টির সেরা জীব -এ বোধ জাগ্রত করা। ‘যে ধর্ম গরীবের দুঃখ দূর করে না, মানুষকে দেবতা করে না, তা আবার কিসের ধর্ম?’- ধর্ম সম্পর্কে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি আজও আমাদের ধর্মের উর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করে। স্বামীজীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক : প্রফেসর, গণিত বিভাগ,
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

x