স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শিশুজন্মদান নারীর মর্যাদা ও অধিকার

মাহমুদা খাতুন

শনিবার , ১ জুন, ২০১৯ at ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ
26

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে গত দু-তিন ধরে একটি নিউজলিঙ্ক বেশ শেয়ার করছেন লোকজন। সিলেটটুডেটুয়েন্টিফোর ডট নিউজে প্রকাশিত খবরটি এরকম ‘অস্ত্রোপচার ছাড়াই ৪২৮ শিশু ভূমিষ্ঠ করিয়েছেন শিরীন’। নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া একটি খবর। এমন পজিটিভ বা ধনাত্মক খবর আমরা খুব একটা পাই না বলেই মানুষজন এটি ছড়িয়ে দিতে চাইছেন। আর খবরটি প্রকাশিত হলো এমন একটি সময়ে যখন ‘মর্যাদা ও অধিকার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রসূতি সেবার অঙ্গীকার’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে সারা দেশে গত ২৮ মে পালিত হলো বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস।
খবরটি যারা এখনো পড়েননি তাদের জন্য সংক্ষেপে এখানে বলে রাখছি। সানজানা শিরীন একজন প্রশিক্ষিত নার্স। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতালে সিনিয়র নার্স হিসেবে কর্মরত। পেশায় নার্স হলেও শখের তাড়নায় নরমাল ডেলিভারি করানো তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪২৮ টি (যখন লেখাটি লিখছি তখন হয়তো সংখ্যাটি বেড়েছে) স্বাভাবিক প্রসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তিনি।
এবার এই সংক্রান্ত কিছু তথ্য-উপাত্ত এবং সেই সাথে কিছু হিসাব-নিকাশে যাই। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার বাংলাদেশে ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। এতে ঝুঁকিতে পড়ছে মা ও শিশুর জীবন। অস্ত্রোপচারে বাচ্চা প্রসব করাতে গিয়ে মা অনেক ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। অস্ত্রোপচারে বাচ্চা হলে একজন নারী পুনরায় মা হতে গেলে ঝুঁকি থাকে ৯০.৭%। শুধু তাই নয় অনেক সময় ছুরি, কাচি লেগে বাচ্চার বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতি হয়। মায়েরাও অস্ত্রোপচার পরবর্তী ইনফেকশনে ভোগেন। তাহলে কেন মায়েরা বা সংশ্লিষ্ট পরিবারটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের দিকে ঝুঁকেছেন এবং ঝুঁকছেন? আমরা জানি অনেক প্রসূতি মায়েরই প্রসবকালীন নানা জটিলতা তৈরি বিধায় একজন গাইনি চিকিৎসক স্বাভাবিক জন্মদানের বদলে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এই হার শতকরা কত? ধরে নিই প্রতি একশ জন মায়ের বিশজন এই জটিলতায় ভুগে থাকেন ফলে তিনি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তারা সন্তান জন্মদান করতে চান। তাহলে বাকি আশিজন প্রসূতি মায়ের তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান জন্মদানের কথা! পাঠক আপনি নিজেই একটু ভেবে দেখুন যে আপনার আশেপাশে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশীদের মধ্যে গত দশবছরে ক’জনকে দেখেছেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান প্রসব করতে? ঠিক উল্টোটিই পাবেন। দেখবেন শতকরা আশিজন মা-ই নিজেকে শঁপে দিচ্ছেন ছুঁরি-কাচির তলায়। কেন ঘটছে এরকম? কারণ তিনি যে গাইনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন ছিলেন তিনিই এটি প্রস্তাব করেছেন। আবার এ-ও দেখা যায়, অজানা এক ভয়ে ভীত হয়ে প্রসূতির পরিবারটিই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন। কিন্তু নগ্নভাবে বললে, একটা বিশাল বাণিজ্যিক লাভালাভের জালে আমাদের প্রসূতি মায়েরা এবং তাদের পরিবার বন্দী হয়ে গেছেন। যেখান থেকে রেহাই পাওয়ার যেনো কোনো উপায়ই নেই! ধরা যাক, একটি সিজারিয়ান ডেলিভারি বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানে খরচ হরেদরে বিশহাজার টাকা। এবং পরবর্তীতে ওই একই মায়েরা সন্তান প্রসবে যখন ৯০ শতাংশ ঝুঁকির মধ্যে থাকে তখন আবার একই পরিমাণ টাকার খরচ। তাহলে ভাবতে পারছেন কী বিপুল পরিমান টাকার লেনদেন ঘটছে এইক্ষেত্রে? এই টাকা খরচ হচ্ছে কীসে কীসে? অস্ত্রোপচারের আনুষাঙ্গিক খরচ, চিকিৎসকের ফি, ক্লিনিকে থাকার খরচ, ওষুধ ইত্যাদি ইত্যাদি।
তুলনায় স্বাভাবিক প্রসবের পর একজন মা ডেলিভারির মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে অস্ত্রোপচার ছাড়াই সন্তান জন্মে কাজ করে যাচ্ছেন সানজানা শিরীনরা সহ অনেকেই। নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য নরমাল ডেলিভারির কোনো বিকল্প নেই। তাই বাংলাদেশ সরকার প্রতিটি উপজেলায়, জেলার হাসপাতালগুলোতে প্রশিক্ষিত ধাত্রীদের নিয়োগ দিয়েছে। হাসপাতালগুলোয় স্বাভাবিক প্রসবের সবরকমের ব্যবস্থাই করা আছে। সেইভ দ্য চিলড্রেনের মতো আন্তর্জাতিক সেবাসংস্থাগুলোও সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে, স্বাভাবিক প্রসব করানোর জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ তথা ধাত্রী গড়ে তুলেছে এবং নিয়োগ দিয়েছে। আজ বাংলাদেশের কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে প্রশিক্ষিত ধাত্রী না পাওয়াটা নেহায়েতই ব্যতিক্রম হবে। তদুপরি এই মিডওয়াইফারি সার্ভিসটি টুয়েন্টি ফোর সেভেন অর্থাৎ সপ্তাহের প্রতিদিনই চব্বিশ ঘন্টা সেবাদানে প্রস্তুত। এবারের বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘মর্যাদা ও অধিকার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রসূতি সেবার অঙ্গীকার’ কথাটিই ভেবে দেখুন না! অথচ শহর বা মফস্বলের হাসপাতালগুলোর মিডওয়াইফারি রেজিস্টারের পাতা আগের মতোই ফাঁকা! কেন বলুন তো? শুধুই কী গাইনি চিকিৎসক দায়ী? প্রসূতি মা, বাবা, পরিবারের সদস্য হিসেবে আমাদের অসচেতনতা আর অমূলক ভয় কি দায়ী নয়?
কিছু প্রশ্ন থাকে যার সঙ্গে যুক্ত আরো কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না বা এর উত্তরও আড় ভেঙ্গে নেওয়া যায় না। তবুও প্রশ্ন প্রশ্নই, অনাগত প্রতিটি শিশুর মা-বাবা-পরিবারের প্রতি রইলো প্রশ্নটি। সেবা আমাদের দোরগোড়ায়। যে সেবা আমাদের শক্তিও বটে! এখনই সময় সেই শক্তিকে সাহসে পরিণত করে অসাধু ব্যবসায়ের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার। আমাদেরই হাতে আছে অনাগত শিশুটির সুস্থ-সুন্দর আগামী। আর সেই আগামীর আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাচ্ছেন অদম্য শিরীন সানজানারা।

x