স্বাগত ১৪২৬ বঙ্গাব্দ; শুভ নববর্ষ

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ
114

নববর্ষ সমাগত। ১৪২৬ বঙ্গাব্দ বরণে বাংলার প্রকৃতি সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত। তাপদগ্ধ দিনের আগুনে পুড়তে পুড়তে, বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে, নীল সবুজের শরতে বন্যায় ভাসতে ভাসতে হেমন্তের তীরে দাঁড়িয়ে সে দেখে মেঘ-কুয়াশায় মাখামাখি আকাশ আর পায়ের তলায় শিশির-ধোয়া সবুজ ঘাস। চেনা পথে আসেন মাঘের সন্ন্যাসী। তাঁর ধ্যানের অনুকূলে ধুম্র প্রকৃতির অর্ঘদান নতুন প্রাণের আশীর্বাদ নিয়ে আসে বাংলার নিসর্গে। আসে বসন্ত ফুলবনে। সাজে বনভূমি সুন্দরী। শুধু এইটুকু নয়। বসন্তকে দুটো কঠিন কাজের দায়িত্ব নিতে হয়। বর্ষ বিদায় এবং বর্ষবরণের কাজ। বিগত বর্ষমঞ্চে যবনিকা টেনে দেয় বসন্ত। একই সঙ্গে তাকে নিতে হয় বর্ষবরণের প্রস্তুতি। সে কাজ শুধু দৃষ্টিতে নয়, অন্তর্দৃষ্টিতেও দেখতে হয়। এই দেখার কাজে আমরা আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের শরণাপন্ন হই। হতেই হয়। ‘উৎসব’ প্রবন্ধে হুমায়ুন আজাদ বলেন, প্রায় শুকিয়ে আসা নদী একটি দু’টি কালবৈশাখী ও এক দুই পশলা ভারী বর্ষণে আবার জেগে উঠতে থাকে নতুন প্রাণ নিয়ে। সবুজের আভাস আসে পোড়া প্রান্তরে। কাষ্ঠপ্রায় বৃক্ষকাণ্ড ফুঁড়ে, ডাল ফুঁড়ে উঁকি দেয় সবুজ প্রাণ। দেখতে দেখতে নতুন পতাকার মতো গর্বিত পল্লবদলে আলোর নাচন শুরু হয়ে যায়।….পুরনো যখন বাতিলযোগ্য পুরনো, ধ্বংসের যখন পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবার জন্য আর কারো সাহায্যের দরকার হয় না তখন বর্ষশেষ আমাদের।….রঙ্গমঞ্চ যেন তৈরি। পাথুরে জমি শতচিরতায় উন্মুখ চাতক; চাই এক পশলা বৃষ্টি। খাল-বিল নদী নালার চাই আঁজলা জল। পরান তো নাচুক সবার তা-তা থৈ থৈ। মেঘে মেঘে অন্ধকার হোক নিকষ কালো। সোনার চাবুকের মতো বিদ্যুৎ ধেয়ে যাক আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। নামুক বর্ষণ, তাপহরা, তৃষাহরা।
বাঙালির বর্ষবরণ শুদ্ধতার লড়াই। বাংলার আদি জননীরাই সে কাজটি করতেন। এখনও করেন। ছোট-বড়, ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, ঘরকন্নার প্রতিটি সামগ্রী, প্রত্যেক তৈজসপত্র (সম্মার্জনীসহ) ধুয়ে মুছে সংক্রান্তির পালা শেষ করেন জননীরা। মায়েরা, বোনেরা, আমরা। এটা ঠিক, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ। চাইলেই আজ যাঁরা পুরনো বলে সব বাতিল করে নতুনে ঘর ভরে তুলতে পারেন তাঁরা কিন্তু বর্ষশেষে নেই, বর্ষবরণেও নেই। তাঁরা আছেন শুধু ভোগে-উপভোগে। বাংলা নববর্ষের তাঁরা কেউ না। (আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গনেও এঁরা আছেন, আছেন সবখানে। আমাদের নববর্ষের উৎসবে এঁদের আমরা আগাছা, পরগাছা গণ্য করি। এঁরা ধর্তব্য নন। নববর্ষ এঁদের চৈতন্য ফিরিয়ে দিক, এঁরা শুদ্ধ হোক। শুধু প্রাণের আনন্দে জাগুক এঁদেরও প্রাণ।)
প্রিয় পাঠক, মাত্র কয়েকঘণ্টার ওপারে দাঁড়িয়ে যে নববর্ষ, প্রাণের নববর্ষ, তাকে আবাহন করতে গিয়ে ফতোয়াবাজির কোনও কাজ করতে চাইনি। বোধকরি হুমায়ুন আজাদ ভর করেছিলেন বলে একটুখানি বকাবাদ্যি হয়ে গেল। কবির উদ্ধৃতি দিয়ে বলি:
বন্ধু হও শত্রু হও যেখানে যে কেহ রও
ক্ষমা কর আজিকার মতো
পুরাতন বর্ষের সাথে
পুরাতন অপরাধ যতো।
শুরুতে যা বলছিলাম বা বলতে চেয়েছি সেকথায় ফিরি। ভোরের মায়া যাদের নেশার মতো টানে, আযান-ভোরে যাঁরা পথে নামেন তাঁরা জানেন নববর্ষের জন্য বসন্তের প্রস্তুতি এবং বর্ষশেষের আয়োজন মূলত একই। চৈত্রের প্রথম প্রহর থেকে আমার ভোরের পথে পাতাঝরার খেলা দেখেছি আমি। দেখতে দেখতে চৈত্রই শুধু ফুরালো না, নাতি ঊর্ধ্ব (নিয়মমতো কাটছাঁট করা হয় বলে) দেবদারু সারির প্রতিটি বৃক্ষ শেষ পাতাটিও ঝরিয়ে দিয়ে আবার ঝামুর-ঝুমুর নতুন পাতায় সেজেছে পরিপাটি সাজে। আসলে স্মৃতির স্মারক বলে একটা কথা আছে। সে কথাটি বাস করে আমাদের সকলের মনে। সদ্য ফোটা একটি গন্ধরাজ কি বেলির ঘ্রাণ মস্তিষ্কের কোন কোষে কোথায় কি আলোড়ন তোলে তিনিই জানেন যাঁর তেমন কোনও স্মৃতি আছে। কবি আহসান হাবীব যথাসাধ্য সুদর্শন ছিলেন। তাঁর চলে যাবার পর ঝর্না রহমান তাঁর কথা বলতে গিয়ে দৈনিক বাংলায় তাঁর অফিসকক্ষের টেবিলে কালো টেলিফোনটিতে তাঁর হাত রাখা এবং পেলব আঙ্গুলে চমৎকার মুদ্রায় রিসিভার তোলার ভঙ্গিটির বর্ণনা দিয়েছেন। বহু বহু বছর আগে পড়েছি। আজও যেন ভঙ্গিটা দেখতে পাই। স্মৃতি যে কারণেই হোক যখন মুদ্রিত হয়ে যায় মনে কি মস্তিষ্কে তখন তার আর মরণ নেই। আমার পড়ন্ত কৈশোর বিশাল দুই দেবদারু বৃক্ষের মাঝেখানে অদৃশ্য এক দোলনায় বসে এপাশে-ওপাশে দোল খায়, আজও। রংপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলের পাঁচিল ঘেরা বেষ্টনীর পেছনের অংশটা জুড়ে ছিল টানা লম্বা ছাত্রীবাস, একপাশে প্রধান শিক্ষিকার বাসভবন (আহা ছিলেন সেখানে বিলেত-ফেরত হেলেনা খান, পরে বাংলা একাডেমি পদকপ্রাপ্ত লেখিকা; এই সেদিন চলে গেলেন ওপারে) দেয়াল জুড়ে লিচুগাছের সারি-মিশকালো ডালে ডালে ঘন সবুজ পাতার মাতামাতি দিনমান) ছোট্ট খেলার মাঠ আয়তাকার। মাঠের শেষে সেই দুই দেবদারু বৃক্ষের তোরণ। তার ওপারে স্কুল ভবন- দালানের পর দালান, খেলার মাঠ, বাঁধানো বকুল গাছ এবং মৌসুমী ফুলের অজস্রতায় বর্ণিল রঙে ডোবানো শীতকাল। স্কুল ছুটির পরে আমাদের ষোলোজোড়া ঘরকাতুরে চোখ দেবদারুর ওপারে প্রধান ফটকের ছোট পকেট গেটটার দিকে তাকিয়ে থাকতো অভিভাবকের অপেক্ষায়। যদি কেউ আসে! ওই তাকিয়ে থাকার পথ জুড়ে দেবদারুর পাতা ঝরার গান এবং নতুন পাতার সাজ আজও স্মৃতিতে সবুজ,সতেজ। সেই সঙ্গে মনে আসে সেই সময়কার গান, ওই দেবদারু বন ঝুরুঝুরু/ কার চঞ্চল মন উড়ুউড়ু/ এই মৌসুমী বায়ে কোন ছন্দের খেলা হল শুরু/ কিছু জানি তার কিছু জানি না। সম্ভবত দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের গান। আজ নববর্ষের প্রাক্কালে দেবদারু সাজে পুরনো দিন মনে পড়ে গেলে বসন্তকেই দোষ দেব। কিন্তু বসন্তের এটি কাজ। নববর্ষকে স্বাগত জানাবার জন্যে বাংলার মানুষের দীক্ষাগুরু বাংলার প্রকৃতিই বটে; আর কেউ নয়।
আসলে বাংলার নববর্ষ যে-সৌন্দর্য, যে-আনন্দ এবং যে-মিলনের বার্তাবহ তার সমস্ত আয়োজন চলে প্রকৃতিতে। বিশেষ করে- ভোরের আকাশে বাতাসে ভোরের পাখ-পাখালির গানে, ভোরের আলোকাভিসারের যাত্রাপথে তার দেখা মেলে। বাঙালিকে এ পথ চিনতে এবং এ পথে চলতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে বাংলা সন। অনেক অনেক তর্ক-বিতর্কের পরে, তর্কের পথ অবারিত রেখেও আজ জানি এবং মানি যে ২৯ বছর রাজ্যশাসনের পরে ৯৯৩ হিজরিতে, খিস্ট্রিয় ১৫৮৪ অব্দের ১০ ই মার্চ বাংলা সন প্রবর্তনের ফরমান জারি করেন সম্রাট আকবর। এটি কার্যকর হয় হিজরি ৯৬৩ বা ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে, তাঁরই নির্দেশে তাঁর সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে। বাঙালির নিজস্ব আদল তৈরিতে এই সন ও তাঁর আর্থসামাজিক কর্মকান্ডের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সেই সঙ্গে মনে রাখি বা বলতে ভালবাসি যে সনটির উজ্জীবনে এবং জাতীয় চেতনা থেকে এই সনের উৎসব অনুষ্ঠানাদি উদযাপনের সক্রিয় উদ্যোগটি রবীন্দ্রনাথের। দেশে দেশে নববর্ষ উদযাপিত হয় যে যার মতো করে উদযাপন করে কিন্তু আর কোনও দেশে নববর্ষ এতটা প্রকৃতিলগ্ন নয়, এতটা সাংস্কৃতিক নয়। নববর্ষ কেন্দ্রিক বাঙালির সাংস্কৃতিক, জাতীয় এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের সুসংহত রূপের বিশ্বজোড়া স্বীকৃতিও মিলেছে। কিন্তু এমন একটি উৎসব যদি বাহ্যিক আড়ম্বরেই শেষ হয়, ভোগবাদিতাতেই যদি তার সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে যায় তাহলে কী হয়? নতুনত্বের দোহাই দিয়ে আত্মপরিচয়কে মসীলিপ্ত করা, আমাদের ইতিবাচক অহঙ্কারের গায়ে আঘাত করার কাজটি কারা করেন? তথাকথিত শিক্ষিত, সংস্কৃত, রুচিবান মানুষেরাই এমন সব অপকর্মের হোতা। রিচুয়ালের নবীনত্ব, পুননির্মিতি চাইতেই পারি কিন্তু সে জন্যে আমার ঐতিহ্যে, আমার সম্ভ্রমবোধের কাঠামোটিতে হাত পড়বে কেন?
বাংলা নববর্ষ যে ধরনের উৎসব তার প্রাণশক্তির যোগান আসতে হবে অন্তরের উৎস থেকে। এই বাংলার মাটি থেকে, বৃক্ষ থেকে, আকাশ-বাতাস, নদ-নদী, পাহাড়-সমতল থেকে সঞ্জীবনী সুধা নিয়ে ঋতুবদলের বহমান প্রক্রিয়ার আদরে গড়ে ওঠা বাঙালি-মন-কেন উড়ে এসে জুড়ে বসা বা বেনোজলে ভেসে আসা অন্য সংস্কৃতির বা অপসংস্কৃতির ক্রীড়নক হবে?
বাংলা নববর্ষ পূর্ণ প্রাকৃতিক উৎসবের শুদ্ধতায় ও নান্দনিকতায় বেঁচে থাকুক চিরকাল। শুভ নববর্ষ। শুভ নববর্ষ। শুভ নববর্ষ প্রিয় পাঠক, শুভ নববর্ষ।

x