স্বস্তির ম্যাচে দিন শেষে অস্বস্তি

নজরুল ইসলাম

শনিবার , ২৪ নভেম্বর, ২০১৮ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ
73

ওয়েস্ট ইন্ডিজকে রুখতে হলে টার্নিং উইকেট দরকার। স্পিন দিয়েই কেবল তাদের কাবু করা যাবে। সেটা জানা ছিল আগেই। সে কারণেই হয়তো জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে স্পিন সহায়ক উইকেট করা হয়েছিল। কিন্তু টেস্টের দুই দিন না যেতেই সে উইকেট দাঁড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের বিপক্ষেও। নিজেদের জালে বাংলাদেশ নিজেরা ধরা পড়ছে কিনা সে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্তত টেস্টের দ্বিতীয় দিনে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং সে আভাসই দিচ্ছে। গতকাল বিকেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনারদের সামাল
দিতে রীতিমত নাক আর চোখের জল এক হয়ে গেছে। কোন দিকের বল কোন দিকে গেছে সেটা বুঝতেই পারেনি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। অবশ্য একই অবস্থা হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসেও। সাকিব-নাঈমদের বল দেখতেও পায়নি ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা। তবে ম্যাচের দ্বিতীয় দিন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশই। কারন দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং বিপর্যয়ে অনেকটাই ব্যাকপুটে বাংলাদেশ। গতকাল ম্যাচের দ্বিতীয় দিনে উইকেট উৎসব করেছে বোলাররা। বিশেষ করে বললে স্পিনাররা। গতকাল দু দলের পতন হওয়া ১৭ উইকেটের সবকটিই নিয়েছেন স্পিনাররা। আর দুই দিনে পতন হওয়া ২৫ উইকেটের ২০টি নিয়েছে স্পিনাররা। প্রথম দিন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই পেসার নিয়েছেন ৫টি উইকেট। জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উইকেট যেন এক রহস্যে পরিণত হয়েছে। বল কখন কি গতিতে আসে বা কতটা টার্ন করে সেটা বুঝতে পারছেননা ব্যাটসম্যানরা। কখনো দেখা যাচ্ছে বল টার্ন করছে বিশাল আকারে। আবার কখনো বল এতটাই নিচু হয়ে আসছে যে ব্যাটসম্যান ব্যাট নামানোর আগেই বোল্ড কিংবা এলবিডব্লিউ হয়ে যাচ্ছেন। ম্যাচের প্রথম দিনেই আভাস পাওয়া গিয়েছিল এই উইকেটে রাজত্ব করবে স্পিনাররা। আর দ্বিতীয় দিনে তা যেন আরো পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রথম ইনিংসে ৭৮ রানের লিড নিয়েও ক্যারিবীয় স্পিনারদের ছোবলে নীল হয়ে যায় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। দিনের শেষ এক ঘন্টা ব্যাট করতে নেমে ৫৫ রান তুলতেই ৫ উইকেট হারিয়ে বসে স্বাগতিকরা। ফলে এখন মাত্র ১৩৩ রানে এগিয়ে বাংলাদেশ। আজ ম্যাচের তৃতীয় দিনে আরো কি ভয়াভহ পরিণতি অপেক্ষা করছে ব্যাটসম্যানদের জন্য সেটাই এখন দেখার। অথচ দ্বিতীয় দিনটা হতে পারতো বাংলাদেশের জন্য দারুন সুখের। প্রথম ইনিংসে ৩২৪ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে গেছে ২৪৬ রানে। অভিষেক ম্যাচে সবচেয়ে কম বয়সি ক্রিকেটার হিসেবে নাঈমের ৫ উইকেট লাভ। সবমিলিয়ে দারুণ সুখের হতে পারতো দিনটা। কিন্তু শেষ বেলায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। গতকাল এক দিনে পতন হয়েছে ১৭ উইকেটের। এর আগে ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে একদিনে পড়েছিল ১৮ উইকেট।
আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান নাঈম হাসান ও তাইজুল ইসলাম শুরু করেছিলেন দ্বিতীয় দিন। কিন্তু ২৮ বলের বেশি খেলতে পারেনি। আগের দিনের ৩১৫ রানের সাথে আর মাত্র ৯ রান যোগ করতেই শেষ বাংলাদেশের ইনিংস।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা সাবধানে করার চেষ্টা করেছিলেন দুই ওপেনার কাইরান পাওয়েল ও ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট । বল টার্ন পেলেও এ দুজন প্রথম ১০ ওভার কাটিয়ে দেন নিরাপদে। শেষ পর্যন্ত পাওয়েলকে ফিরিয়েই বাংলাদেশকে ব্রেক থ্রু এনে দেন তাইজুল। এই বাঁহাতি ওপেনার ফিরেন ১৩ রান করে। পরের ওভারেই সাকিবের ধাক্কা। ইনজুরি কাটিয়ে মাঠে ফিরে প্রথম বলেই নিলেন উইকেট। বোল্ড করলেন শেই হোপকে। এক বল পরই পেতে পারতেন আরেকটি। কিন্তু আবারও ক্যাচ ছাড়লেন মুশফিক। উইকেটের পেছনে গতকাল বেশ নড়বড়ে ছিলেন মুশফিক। তবে সে হতাশা ভুলে দুই বল পরই সাকিব ফেরান ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটকে। ১৩ রান করেন তিনি। চতুর্থ উইকেটে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন আমব্রিস ও রোস্টন চেইস। ১৮ রানে চেইসের ক্যাচটা মোস্তাফিজ ছেড়ে না দিলে আরো বিপদে পড়তে পারতো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে বেশি সময় লাগে ৪৬ রানের এই জুটি ভাঙতে। নিজের পরপর দুই ওভারে ফিরিয়ে দেন এ দুজনকে। ৮৮ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে তখন খাদের কিনারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ঠিক তখনই প্রতিরোধ গড়ে তুলেন শিমরন হেটমেয়ার এবং ডরউইচ। ব্যাট হাতে হঠাৎই ঝড় তোলেন হেটমেয়ার। এ জুটি যখন শতরান করার কাছে চলে গিয়েছিল ঠিক তখনই আঘাত হানেন মিরাজ। ৫টি চার এবং চারটি ছক্কার সাহায্যে ৪৭ বলে ৬৩ রান করা হেটমায়ারকে থামান মেহেদী হাসান মিরাজ। এরপর শেষের দিকের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে দলকে আড়াইশর কাছে নিয়ে যান শেন ডরউইচ। তিনটি ছক্কা আর দুটি চারের সাহায্যে ১০১ বলে ৬৩ রান করে অপরাজিত থাকেন ডরউইচ। শেষ পর্যন্ত ২৪৫ রানে অল আউট হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শেষের দিকের ব্যাটসম্যানদের সুবিধা করতে দেননি নাঈম। সবচাইতে কম বয়সী বোলার হিসেবে টেস্ট অভিষেকে নাঈম নেন ৫ উইকেট।
৭৮ রানের লিড নিয়ে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশের স্বস্তি শেষ হয়ে যায় দিনের শেষ এক ঘন্টাতেই। ইমরুল, সৌম্য, মোমিনুল, সাকিব, মিঠুনরা যেন বল দেখতে পাচ্ছিলেন না চোখে। ক্যারিবীয় স্পিনারদের বল যেমন ঘুরছিল তেমনি ভুল পথে পা দিয়ে উইকেট দিয়ে আসছিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। চেইস-ওয়ারিনকার বল যেন ওয়ার্ন কিংবা মুরালির বোলিংয়ে পরিণত হয়েছিল। একে একে ৫ জন ব্যাটসম্যান ফিরে আসে ৫৩ রানে। শেষ পর্যন্ত দাতে দাঁত চেপে ধরে দিনটা কোনমতে পার করে আসেন মুশফিক। আবারো ব্যর্থ হলেন ইমরুল আর সৌম্য। প্রথম ইনিংসের পুনরাবৃত্তি করতে পারলেন না মোমিনুল। সাকিবের সে শটটা খেলা জরুরি ছিল কিনা তিনিই ভাল বলতে পারবেন। মিঠুন যেভাবে ব্যাট নামালেন তা টেস্ট ক্রিকেটে চলে কিনা জানা যায়নি। সব মিলিয়ে উইকেট পতনের মিছিলে শরীক হয়ে নিজেদের এখন নিয়ে গেলেন খাদের কিনারায়। যে টেস্ট ম্যাচটি হতে পারতো অনেক কিছু অর্জনের সে টেস্ট ম্যাচটিতে এখন হারের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ।

x