স্বপ্ন পূরণ

মানিক দেবনাথ

বুধবার , ১০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৯:০১ পূর্বাহ্ণ
36

বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন গনি সাহেব। চোখে ঝাপসা দেখেন। কানেও কম শুনেন। কান আবার মর্জির ওপর চলে। কখনো ভালো শুনেন কখনো শুনেন না। কানের এমন তালবাহানার কারণ আজ অবধি খুঁজে পান নি তিনি।
রাত এগারটা বেজে কয়েক মিনিট। চোখে ঘুম ঘুম ভাব। সবে মাত্র বালিশে মাথা ঠেকিয়েছেন। এ সময় ল্যান্ড ফোনে একের পর এক রিং পড়ে যাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে ফোনটা ধরতেই ও পাশ থেকে এক মেয়ের কণ্ঠ।
মেয়েটি বলছে, মামা তোমার আশা পূরণ করেছি। গনি সাহেব ক্ষেপে গেলেন। কে কার মামা? কথা না বাড়িয়ে রং নাম্বার বলে ফোন রেখে দিলেন। ও পাশের মেয়েটি বলে যাচ্ছে মামা প্লিজ ফোন ধরুন, কথা বলুন। অনেকক্ষণ পর আবারো ফোন এল! উফ্‌ রং নাম্বারের কি জালাতন? গনি সাহেব ফোনের তার খুলে রেখে দিলেন। এবার যদি শান্তিতে একটু ঘুমানো যায়? ফের বালিশে মাথা দিলেন তিনি। গায়ের কম্বলখানা টেনে আড়মোড়া দিতেই কি ভেসে উঠে বসলেন। ঐ সে মেয়ে নয়তো? যাদের খুব আপন মানুষ ছিলাম। আমার ফোন নাম্বার সে পেল কিভাবে? ভাবলেন ভুলো মন তাই হয়তো সবকিছু ভুলে গেছেন। আজকাল কি যে হয় না সবকিছু ভুলে যান।
মনে পড়ে যায় সেই অনেকদিন আগের কথা। চট্টগ্রাম নিউ মার্কেট মোড় সকাল থেকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিকেল হতেই মানুষের আনাগোনা আরো বেড়ে যায়। এ ব্যস্ততা চলে রাত দশটা অবধি। হন্তদন্ত হয়ে অফিসে ছুটছেন তিনি। এ সময় সামনে এসে দাঁড়াল ছয়-সাত বছরের এক শ্যামলা মেয়ে। হাত পেতে আছে সাহায্যের আশায়। গোটা শহরে এমনে দৃশ্য হরহামেশা দেখা যায়। বিকেলে অফিস ফেরত গনি সাহেব দেখলেন একটা ল্যাম্প পোস্টের নিচে বসে মেয়েটি কাঁদছে। গনি সাহেবের এর মায়া হলো। কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন তোমার কি হয়েছে? খুব ক্ষিধা পেয়েছে তাই কাঁদছি মামা। মেয়েটির সহজ-সরল উত্তর গনি সাহেবকে মুগ্ধ করল। মানুষ কত খাওয়ার নষ্ট করে ফেলে দেয়। এরা খেতে পায় না। মেয়েটিকে কিছু খাওয়ার কিনে দিতেই খুশি হয়ে গেল।
: তোর বাবা কি করেন?
: মা বলেছে, বাবা নাকি না ফেরার দেশে চলে গেছে। জানো, আমার বাবাকে খুব মনে পড়ে। আমি বাবার কাছে যেতে চাই। এখানে আর ভালো লাগে না।
: তোর মা কি করেন?
: মাও ভিক্ষা করে। সব সময় ভিক্ষা করতে পারে না। অসুস্থ থাকে। তাই বিছানায় পড়ে থাকে।
এ মেয়েটির মত গনি সাহেবেরও একটা মেয়ে রয়েছে। এ মেয়েটার মুখের ওপর যেন নিজের মেয়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেন। মনে মনে স্থির করলেন এ পথশিশুকে আলোর মুখ দেখাবেন। লেখাপড়া শেখাবেন। জীবনে একটা ভালো কাজ করে আত্মতৃপ্তি থাকবেন।
: আমি যদি পড়ালেখা শেখাই পড়বি? স্কুলে যাবে? প্রশ্ন করলেন গনি সাহেব।
: আমি স্কুলে যেতে চাই। পড়ালেখা শিখতে চাই। অনেক বড় স্যার হতে চাই। কিন্তু ভিক্ষা করবে কে মামা? না হলে খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।
: তোমার আর ভিক্ষা করতে হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করব। তুমি লেখাপড়া শিখে মস্ত বড় ডাক্তার হবে।
: ঠিক আছে মামা। আমি মন দিয়ে পড়াশোনা করব।
জানা গেল মেয়েটির নাম বর্ষা। কাছের একটা বস্তিতে থাকে। একদিন গনি সাহেব গেলেন বর্ষাদের সেই বস্তিতে। চারিদিকে মশার ভনভন শব্দ। নর্দমার দুর্গন্ধ। বর্ষা মায়ের সাথে গনি সাহেবকে পরিচয় করিয়ে দেয়। গনি সাহেবের আশ্বাস পেয়ে তার মা কথা দিলেন মেয়েকে দিয়ে আর ভিক্ষা করাবেন না। শুধু লেখাপড়া শেখাবে। গনি সাহেব নিজ খরচে বই, খাতা, স্কুল ব্যাগ, কলম, জামা জুতো কিনে দিলেন, বর্ষার সেই কি আনন্দ!
গনি সাহেব বর্ষার মাকে ও কুটির শিল্পে কাজে লাগিয়ে দিলেন। এমনি করে সুন্দরভাবে চলছে বর্ষাদের দিনকাল। দিন যায় মাস আসে। তারপর বছর। এমনি করে বর্ষা নবম শ্রেণির ফার্স্ট গার্ল। একদিন বর্ষাদের অবস্থার উন্নতি হলো। তারপর অনেক বছর গনি সাহেবের সাথে তাদের দেখা নেই। তবে ফোনে দুই একবার কুশল বিনিময় হয়েছিল। তারপর থেমে যায় সেই আলাপ ও। বর্ষা হয়ত নিজ থেকে যোগাযোগ করেনি একদিন সারপ্রাইজ দেবে বলে। তাইতো অসংখ্য কষ্ট সহ্য করে আছে আজকের এ দিনটির জন্য।
পরের দিন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হলো বর্ষার জীবন কাহিনী। তাতে নাম উঠে এল গনি সাহেবের। সংবাদটি দেখে গনি সাহেবের দু’চোখের আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে আসে। বস্তির মেয়ে বর্ষা মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় টিকেছে। বাঁধ ভাঙা আনন্দ বর্ষাদের বস্তিতে। এ প্রথম বস্তির কেউ ডাক্তার হওয়ার সুযোগ পেল। এতে বুঝা গেল একটু সুযোগ পেলে অবহেলিত পথ শিশুরাও মানুষের মত মানুষ হতে পারে। সমাজের উঁচু জায়গায় নিজেকে ঠাঁই করে নিতে পারে। একটা ফোন এলো বর্ষার নাম্বারে। ফোন রিসিভ করতেই বর্ষার চোখে পানি পড়ে গড়িয়ে এল। বন্ধুবান্ধব ও স্বজনরা সে দৃশ্য অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল। ফোনের এ প্রান্ত বলতে শোনা গেল আমি তোমার কথা রেখেছি মামা। ফোনের ঐ প্রান্তের গনি সাহেবের চোখেও আজ পানি। এ অশ্রু যে অন্য রকম এক বিজয়ের আর বাঁধ ভাঙা আনন্দের।

x