স্বপ্ন আনন্দ

নাসের রহমান

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ
19

ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় কবিতার কয়েকটি লাইন মাঝে মধ্যে খাতায় লিখে ফেলতাম। দু’একদিনের মধ্যে আরো কয়েকটি লাইন যোগ করে মিলিয়ে দেখতাম। পরে আরো কয়েক লাইন যোগ হতো। এসব লাইনের মধ্যে এক ধরনের মিল খুঁজে পেতাম। তখন মনে হতো এটা একটি কবিতা । কবিতাটি শোনানোর মত বা দেখানোর মত কাউকে খুঁজে পেতাম না। তারপরও নিজে নিজে বারবার পড়তাম। কোথাও শব্দের অমিল থাকলে নতুন শব্দ বসিয়ে মিলাতে চেষ্টা করতাম। এভাবে কয়েকটি কবিতা লেখা হয়ে যায়। স্কুল ম্যাগাজিন ও দেয়াল পত্রিকায় দু’একটা কবিতা ছাপা হয়। টিচারদের কেউ কেউ বলতেন তোমার কবিতাটা সুন্দর হয়েছে। তখন কবিতা লেখার আনন্দটা আরো বেড়ে যেত। কবিতা লেখার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। আলাদা একটি খাতায় কবিতাগুলো লিখে ফেলি। ক্লাবের ম্যাগাজিনেও একটি কবিতা ছাপা হয়। ম্যাগাজিনটি এলাকায় যারা পড়তে পারে তাদের সবার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। এতে সবাই জানতে পারে যে আমি কবিতা লিখতে পারি। কোন কিছু লিখতে হলে অনেকে আমার কাছে আসে। আমাকে দেখায়, কেউ কেউ আবার আমাকে লিখে দিতে বলে। এতে আমার গদ্য লেখার প্রতি এক ধরনের আগ্রহ জাগে। ছোট খাট ঘটনা প্রবাহকে গল্পে রূপ দেয়ার চেষ্টা করি। কয়েক পৃষ্ঠা লিখে ফেলে আবার পড়ে দেখি। মনে হচ্ছে গল্প হচ্ছে। যদিওবা তখনো গল্প বা কবিতার মৌলিক বিষয়গুলো আমার জানা ছিল না। তারপরও গল্পটা ক্লাবের ম্যাগাজিনে ছাপা হলো।স্কুলের পাঠ্য বইয়ের কবিতা ও গল্পগুলো আমাকে বেশ আকর্ষণ করতো। বছরের শুরুতে এসব কবিতা গল্প নিজে নিজে পড়ে নিতাম। সবটাই যে বুঝতে পারতাম তা নয়। তবে এ পড়ার মাঝে এক ধরনের আনন্দ খুঁজে পেতাম।
হাই স্কুলে গিয়ে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলাম। সবাই বললো কবিতা টবিতা লিখলে সায়েন্সে পড়তে পারবে না। আমিও অনেকটা থেমে গেলাম। সায়েন্সের বইগুলো অনেক মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। ক্লাসে সবকিছু ভাল করে বুঝে নিতে হয়। প্রাকটিক্যাল ক্লাস চলে পাঁচটা ছয়টা পর্যন্ত। অনেকটা এসবের ভেতর ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কবিতার লাইন কয়েকটি মাথায় উঁকি দিলেও খাতায় লিখার সময় পেতাম না। তাই আবার কোথায় যেন হারিয়ে যেত। কিছু দিন পরে স্কুলের ম্যাগাজিনে লেখা আহবান করা হলো। তখন আর না লিখে পারলাম না। একটি কবিতা আর একটি গল্প জমা দিলাম। দু’টি লেখাই মনোনীত হলো, এগুলো ছাপাও হলো। লেখা দু’টির প্রশংসা করলো অনেকে। তাই লেখা আর থামিয়ে রাখা গেল না। মাঝে মধ্যে লেখা পড়ার ফাঁকে স্কুল ছুটির সময় দু’একটা কবিতা লিখতে পারলে মনটা যেন হালকা মনে হতো। হাই স্কুলে পড়ার সময় কখনো ভাবতে পারিনি আমার লেখা পত্রিকায় ছাপা হবে। পত্রিকার সাহিত্যের পাতায় লেখা ছাপানো এটা ছিল সম্পূর্র্ণ কল্পনার বাইরে। মনে করতাম বড় বড় কবি সাহিত্যিকদের লেখা্‌ পত্রিকার সাহিত্যের পাতায় ছাপা হয়। কিন্তু এসএসসি পাস করে চট্রগ্রাম কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে এ ধারণা পাল্টে গেল। কলেজে চন্দ্রবিন্দু নামে একটি সাহিত্য সংগঠন ছিল। ম্যাগাজিনের নাম ছিল চন্দ্রবিন্দু। এতে আমার লেখা প্রকাশিত হয়। সে সময় নয়বাংলা নামে একটি দৈনিক পত্রিকা বের হতো। এর সাহিত্যের পাতায় একটি লেখা ছাপা হয়। অনেকে বললো আজাদী পত্রিকায় লেখা জমা দিতে। এদের কথায় আজাদী পত্রিকায় লেখা জমা দিলাম। দু’সপ্তাহ পর সাহিত্য সাপ্তাহিকীতে গল্পটি ছাপা হয়। এতদিন ম্যাগাজিন, দেয়াল পত্রিকায় লেখা ছাপা হলেও আজাদীর সাহিত্যের পাতায় গল্পটি দেখে মনটা আনন্দে ভরে যায়। নিজেকে একজন লেখক মনে হতে থাকে। এ দু’টি পত্রিকার সাহিত্যের পাতায় মাঝে মাঝে লেখা ছাপাতে শুরু হয়। গল্প, কবিতা যা লিখি না কেন পত্রিকার অফিসে গিয়ে জমা দিয়ে আসি। কয়েক সপ্তাহ পর পত্রিকায় উঠতে থাকে। যখনই সময় পাই লেখা লেখিতে সময়টা দিতে থাকি। এতে মাসে অন্তত একটা কবিতা বা গল্প পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে। পড়া লেখা ঠিক রাখতে গিয়ে লেখালেখির কাজটায় অত মনোযোগ আর সময় দেয়া যায় না। তারপরও পরীক্ষা ছাড়া অন্য সময়ে লেখা লেখিতে থাকলে মনটা ভাল থাকে যেন। পত্রিকার পাতায় লেখা ছাপার অক্ষরে দেখলে মনটা আনন্দে ভরে উঠে। তাই লেখার প্রতি একধরনের ভাল লাগা সৃষ্টি হয়।
লেখাগুলো কখনো বই আকারে বের হবে তা ভাবতে পারিনি। এমনকি অনার্স মাস্টার্সে পড়ার সময়ও বেশ কিছু লেখা পত্রিকায় ছাপা হয়ে যায়। তবে বই প্রকাশ করার কোন চিন্তা মাথায় আসেনি। লেখক মহলে যাদের সাথে পরিচয় ছিল তারাও কখনো বই ছাপার কথা বলেনি। সেসময় বই আকারে প্রকাশের চেয়ে লেখার মান কি করে বাড়ানো যায় সেদিকে সবার মনোযোগ ছিল। যাদের বই প্রকাশিত হতো তারা অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখক। সবাই তাদেরকে চিনতো। তাদের লেখা পড়ে মুগ্ধ হতো। সাহিত্যের জগতে এসব লেখকেরা অনেকদিন থেকে বিচরণ করছেন। যাদের পরিচিতি অনেক শুধু তাদের লেখা বই প্রকাশ হতো। অন্য কারো বের হলেও আমাদের হাতে পৌঁছাতো না। তাই এ ব্যাপারটা কখনো চিন্তায় আসেনি। বই প্রকাশ হওয়ার মত লেখক হওয়া তখন অনেক বড় বলে মনে হতো। তদুপরি বই প্রকাশের জন্য যে টাকার প্রয়োজন তা একজন ছাত্রের পক্ষে যোগাড় করা কোনভাবে সম্ভব না। ফলে ছাত্রাবস্থায় অনেক লেখা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও বই করার চিন্তাভাবনা কখনো মাথায় আসেনি। দশ বারোটি গল্প নিয়ে একটি সুন্দর গল্পের বই হয়। ত্রিশ চল্লিশটি কবিতা নিয়ে একটি চমৎকার কবিতার বই হতে পারে। কে এই বই প্রকাশ করবে? কোন প্রকাশকতো নতুন লেখকের বই প্রকাশ করতে চায় না। এসব হিসাব নিকাশ তখন একবারে অজানা ছিল তা নয়।
লেখাপড়া শেষ করে অনেকের মতো আমিও একটি চাকরি পেয়ে যাই। চাকরিটা একটা রাষ্টা্রয়ত্ত ব্যাংকে। তবে আমার প্রথম পোষ্টিং হয় বান্দরবানে। অনেকে আাপত্তি তুললেও আমি স্বাছন্দে বান্দরবান গিয়ে জয়েন করি। যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল ছিল না। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গাড়ি কিছু দূর উঠে দু’একবার মাঝে মাঝে থেমে যেতো। কখনোও বিপর্যয় ঘটে যেতো। গাড়ি একেবারে খাদে পড়ে যেতো। কয়েকজন হতাহত হতো। তারপরও চলাচল কখনো বন্ধ হয়ে যেতো না। ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ী উঁচু রাস্তা পাড়ি দিয়ে গাড়ি বান্দরবান পৌঁছে যেতো। গাড়ি পাহাড়ে উঠানামায় ভয় লাগলেও বাইরে তাকালে মনটা জুড়িয়ে যেতো। পাহাড় যে এত সুন্দর হতে পারে তা আগে জানা ছিল না। যতদূর চোখ যায় সবুজ বন বনানীতে ভরা উঁচু উঁচু পাহাড়। কোথাও যেন আকাশের সাথে মিশে গিয়েছে আবার কোথাও যেন শ্যামল প্রকৃতিকে জড়িয়ে আছে। বান্দরবান জেলা শহরটি খুব সুন্দর। যদিওবা তখন শহর হয়ে ওঠেনি। জেলা সদর হওয়ায় নানারকম অফিস, স্থাপনা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। চারিদিকে পাহাড় বেষ্টিত অনেকটা সমতল। এ জায়গাটির পাশ দিয়ে সাংগু নদী মৃদুমন্দ স্রোত ধারায় বয়ে চলেছে। নদীর পাশ ধরে বড় একটি বাজার পাহাড়ি এলাকাটিকে অবয়ব থেকে কিছুটা আলাদা করেছে। বাজারের পরে নদীর কোল ঘেঁষে পাহাড়ী ঘরবাড়ি দেখা যায়। একদিকে রাজবাড়ি, যাদীর পাহাড়, অপরদিকে রেস্ট হাউজ, জেলা প্রশাসন সাংগুর ওপাড়ে সেনানিবাস এ জায়গাটিকে বড় বৈচিত্রময় করে তুলেছে। তারচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় এখানকার মারমা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা। ব্যাংকিং কাজকর্মের পাশাপাশি এসব সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতাম। কখনো কখনো অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকতাম। চারিদিকে লেখার অনেক উপকরণ। ব্যাংকের কাজ শেখায় মনোনিবেশ করায় কিছুদিন লেখালেখি অনেকটা থেমে যায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কোন কোন সপ্তাহে চট্রগ্রাম যাওয়া হতো। তবে প্রায় সময় বান্দরবানে থেকে যেতাম। এরকম এক ছুটির দিনে চট্রগ্রামের চেরাগী পাহাড় মোড়ে আজাদীর সাহিত্য সম্পাদক অরুণ দা’র সাথে দেখা হয়। তিনি কুশলাদি জিজ্ঞেস করে বললেন, তোমার লেখা পাই না কেন ? তুমিতো এখন বান্দরবানে। আমি কিছুটা ইতস্তত করে বললাম , ব্যাংকের নতুন চাকরি, কাজকর্ম শিখে নিতে হচ্ছে। লেখা আর হয় না। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন ,এটা হলেতো চলবে না। যত কাজই থাকুক লেখা ছাড়া যাবে না। এবার আমি কিছুটা বিনয়ের সাথে বললাম, এবার গিয়ে লেখা পাঠিয়ে দেবো। তাঁর কথায় আবার যেন নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হলাম। লেখা আবার শুরু হলো। লিখতে চাইলে সময় যেন বের হয়ে যায়। বিশেষ করে রাতে লেখার কাজটা ভাল হয়। এ সময় উপজাতীয় জীবন ধারার গল্প লিখতে শুরু করি। প্রথম লেখার নাম ছিল বুনোফুল। দৈনিক আজাদীর সাহিত্য সাপ্তাহিকীতে খুব সুন্দর ইলাস্ট্রাসন দিয়ে ছাপা হয়েছিল। এরপর চট্রগ্রাম থেকে দৈনিক পূর্বকোণে প্রকাশিত হতে শুরু হলো।পূর্বকোণের সাহিত্যোর পাতায় অনেক গল্প এমনকি ধারাবাহিকভাবে অনুউপন্যাস ছাপতে শুরু করলো। তখন পূর্বকোণের সাহিত্যের পাতা দেখতেন কবি শিশির দত্ত। এরা সবাই আমার লেখালেখির জগৎটাকে বিশেষ করে উপজাতীয় জীবনধারার গল্পগুলো খুব প্রশংসা করলেন। অরুণদাসহ অনেকে বললেন লেখাতো অনেক হয়েছে , তোমার এখন বই বের করা দরকার। কথাটা আমার মাথায় কিছুটা ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। বান্দরবানের পাবলিক লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান এর সাথে আমার প্রায় প্রতিদিন দেখা হতো। তিনি বই প্রকাশের ব্যাপারটা গুরুত্বসহকারে নিলেন। লাইব্রেরির পাশে একটা প্রেস ছিল সেখানে বিয়ে শাদীর দাওয়াত পত্র কিংবা ছোটখাট সুভেনিয়র ম্যাগাজিন ছাপানো হতো। সেখানে তিনি কথা বললেন। তারা খুব আগ্রহ দেখালেন বই ছাপানোর ব্যাপারে। আমি খানিকটা সম্মতি দিলাম। কেননা এখানে সহজে প্রুফ দেখা যাবে। আর আমি সময় দিতে পারবো। কিন্তু চট্রগ্রাম শহরে এসে পরিচিত মহলে এসে যখন আমি বললাম বান্দরবান থেকে বই প্রকাশ করবো, কেউ তাতে সায় দিল না। বই করতে হলে এখান থেকে করতে হবে। এখানে ছাপা অনেক উন্নতমানের। বইয়ের প্রচ্ছদ আর বাইন্ডিং আকর্ষণীয় না হলে বই কেউ নিতে চায় না। আমি পড়ে গেলাম কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে। তখন আমাদের সহপাঠীর কয়েকজন মিলে প্রিন্টিং লাইনের ব্যবসা শুরু করেছে। একটি প্রিন্টিং প্রেস দিয়েছে আন্দরকিল্লার নজির আহমদ চৌধুরী রোডে। প্রেসটির নাম ‘তিলোত্তমা’। ওরা জানতে পেরে ধরে বসলো আমাকে। বললো পাণ্ডুলিপি আমাদেরকে দাও, আমরা খুব সুন্দর করে তোর বই করে দেবো। সবদিক বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত তাদেরকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ততদিনে চাকরি দু’বছর পেরিয়ে গেছে। একাউন্টে কিছু টাকা জমা পড়ে আছে। বই বের করতে কত টাকা লাগতে পারে সে ধারণা নেই। তিলোত্তমা একটা হিসাব দিলো । ছয় সাত হাজারের মধ্যে একশ বিশ পৃষ্ঠার একটা উন্নতমানের বই হতে পারে। এখন কোন কোন গল্প প্রথম বইতে স্থান পাবে তা নির্বাচন করতে হবে আমাকে। আমি সব খুঁজে প্রায় ত্রিশটা গল্প পেলাম। কোনটি ভাল আর কোনটি অত ভাল নয় তা আমি কি করে বলতে পারি ? আমার প্রিয় শিক্ষক চৌধুরী জহুরুল হক স্যারের শরণাপন্ন হলাম। ত্রিশটি গল্প পড়া তার পক্ষে এত সহজ নয়। তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত থাকেন। আগে কয়েকটি গল্প পড়া থাকলেও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আমার গল্পগুলো তিনি দেখে দিয়েছেন। আমি তার কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। এতে কয়েক মাস চলে গেলেও বিশটি গল্প নিয়ে প্রথম বই প্রকাশের কাজ শুরু হয়ে গেল। বই প্রকাশ করতে হলে একটি প্রকাশনীর মাধ্যমে করতে হয়। এ ব্যাপারে চৌধুরী জহুরুল হক স্যার অধ্যাপক মাহবুবুল হককে অনুরোধ করায় তাঁর বিখ্যাত প্রকাশনী ‘কথাকলি’ নামটি প্রকাশক হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছি।
প্রেসের কাজ শুরু হয় কিন্তু সহজে শেষ হয় না। বইয়ের কাজ একেবারে ধীরগতিতে চলতে থাকে। প্রথমে কম্পোজ তারপর প্রুফ দেখা। কয়েকটা গল্প কম্পোজ করে একসাথে দেয় প্রুফ দেখার জন্য। এ কাজটা একটু কঠিন। বানান সম্পর্কে ভাল ধারণা না থাকলে আর হয় না। আমার অনুজ শাকিল ও ইব্রাহিম দু’জনই বাংলা সাহিত্যের ছাত্র । বানান দেখার কাজে অনেক সহযোগিতা করেছে। এভাবে প্রথমে কম্পোজ তারপর প্রুফ দেখা আবার ফাইনাল প্রুফ। ধীরে ধীরে দশ বারটি গল্পের প্রুফ দেখা ফাইনাল করা হয়। এদিকে প্রচ্ছদ করার জন্য শিল্পী খালিদ আহসান বইটির নাম ও কয়েকটি গল্প চাইলেন । নাম ঠিক করাও এত সহজ নয়। বিশটি গল্পের কোন নামটি দিলে বইটি আকর্ষণীয় হবে তা নিয়ে কয়েকজনের সাথে আলাপ হলো। বিশটি গল্প থেকে একটি নাম বাছাই করা সহজ হলো না। গল্পের সবগুলো নাম পছন্দের। কোনটা রেখে কোনটা বেছে নেব। প্রথমে বিশটা থেকে দশটা নাম বেছে নিলাম। বাকী দশটা বাদ করে দিলাম। এরপর দশটা থেকে পাঁচটায় চলে এলাম। এখন আর এগুতে পারি না। পাঁচটা থেকে আবার তিনটায় । এবার তিনটা থেকে একটা বাদ দিয়ে দু’টো নাম নিয়ে কয়েকদিন চলে গেল। প্রচ্ছদ শিল্পীও শেষ তিনটা নামের মধ্যে একটি নামের উপর বেশ গুরুত্ব দিলেন। পরের সপ্তাহে নামটি দিয়ে দু’টি প্রচ্ছদ ডিজাইন করে দেখালেন। ব্যাক কভারে দেওয়ার জন্য স্টুডিওতে নিয়ে আমার ছবি তুললেন। দু’টি প্রচ্ছদই চমৎকার করে এঁকেছেন। একটিতে প্রকৃতি আর নৈসর্গিকতা মূর্ত হয়ে উঠেছে। অন্যটিতে প্রকৃতির সাথে রোমান্টিকতা প্রাধান্য পেয়েছে। আমি প্রথমটিতে মত দিলেও শিল্পী বললেন পরেরটি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বেশী। তাই দ্বিতীয়টি নির্বাচন করা হলো প্রচ্ছদের জন্য। এ সময়ে প্রতি সপ্তাহে চট্রগ্রাম শহরে আসতে হয়। প্রুফ দেখার কাজ প্রায় শেষের পথে। গল্পগুলোর প্রচ্ছদ শিল্পী একের পর এক সাজিয়ে দিলেন। একটি ডামি বইয়ের প্রথম আট পৃষ্ঠা ইলেস্ট্রাশনসহ পরপর সন্নিবেশিত করলেন। ফাইনাল প্রুফের পর লেখাগুলোকে ফর্মা আকারে নিয়ে সেট করা হলো। ট্রেসিং করে পাতাগুলোকে একের পর এক সাজানো হলো। এবার ছাপার কাজ শুরু। কাগজ কিনে দিতো হলো। কর্ণফুলি পেপার মিলের কাগজ। ছাপতেও দু’সপ্তাহ লেগে গেল। এবার কাটিং হবে। প্রচ্ছদ শিল্পী চার রংয়ের চমৎকার একটি প্রচ্ছদ নিয়ে এলেন। সবাই দেখে মুগ্ধ হলো। ব্যাক কভারে ছবিটাও বেশ ফুটে উঠেছে। এতদিনে মনে হলো সত্যিই বই বের হচ্ছে। বইটা বাইন্ডারকে দেয়ার আগে তাকে জানাতে বললেন। তিনি সেখানে প্রচ্ছদগুলো পাঠিয়ে দিবেন। প্রচ্ছদ কভারটি তিনি ছাপিয়ে দিয়েছেন। ভাল বাইন্ডারকে দিতে বললেন। ভাল বাইন্ডার অনেকে আছে। তবে সবাই ছালাম বাইন্ডারের কাজ ভাল বললো্‌ । আমরাও তার কাছে গেলাম। কয় ফর্মার বই জানতে চাইলো ,মলাট কভারে কি বোর্ড দেবো তাও জিজ্ঞাসা করলো। তারও কিছু পরামর্শ নিয়ে মলাটের বোর্ড কিনে দিলাম। কাটিং মেশিনে ফর্মা সব বুঝিয়ে দেয়া হলো। পরেরদিন আমাকে অফিসে চলে যেতে হবে। সাপ্তাহিক ছুটি একদিন শুক্রবার। শনিবার সকালে চলে গেলাম বান্দরবানে। এখানে অফিসে লোকজন কম। কাজের চাপ আছে। সবাইকে ব্যস্ত থাকতে হয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বইয়ের একটি ছবি চোখের উপর ভেসে ওঠে। ব্যাংকের কাজে ফাঁকি দেয়ার কোন সুযোগ নেই। দায়িত্বও অনেক বেড়েছে। ম্যানেজার সাহেব অনেকগুলো কাজ পুরোপুরি আমার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। চাইলেও আমি আসতে পারি না। এ দু’বছরে বান্দরবানে অনেকে জেনে গেছে আমি লেখালেখির কাজে সম্পৃক্ত। বান্দরবান শিশু একাডেমিতে আমার যাতায়াত ছিল। শুক্রবার ছুটির দিনে ছোটদের কবিতা আবৃত্তি ও গল্প বলার অনুষ্ঠান আমার ভালো লাগতো। ওখানে কিছুটা সময় দিতাম। তাদের কেউ কেউ বই নিয়ে কথা বলতে চান। আমি আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে চাই না। যখন বই বের হবে তখন সবাই জানবে।
সপ্তাহশেষে বৃহস্পতিবার অফিসের প্রায় সবাই বান্দরবান ছেড়ে যায়। বিকেলে বাসের টিকিট আগে থেকে করে রাখতে হয়। বিশেষ করে তিনটার পরে যে কয়টি বাস ছাড়তো এতে সাথে সাথে সিট পাওয়া যেতো না। পাওয়া গেলেও একবারে পিছনের দিকে। সন্ধ্যার পর কোন বাস ছাড়া হতো না। পরের সপ্তাহে বৃহস্পতিবার সকালে বিকাল পাঁচটার বাসে একটা টিকিট করে নিলাম। বাসটি ঠিক সময়ে বান্দারবান থেকে ছাড়লেও চট্রগ্রাম এসে পৌঁছাতে রাত নয়টা বেজে যায়। বহদ্দারহাট বাস স্টেশন থেকে আন্দরকিল্লার বাইন্ডারের দোকানে পৌঁছতে প্রায় দশটা বাজে। তখন সে দোকান প্রায় গুটিয়ে ফেলেছে। এ সময় আমাকে দেখে কিছুটা অবাক হয়। এমন কিছু বলতে চায় আমিতো দোকান বন্ধ করে ফেলেছি। আমি বললাম এখন বই নেবোনা, একটু দেখবো। সে আর দেরী না করে ভিতরে নিয়ে যায়। আমি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলাম। থরে থরে সাজানো অনেক বই। বইয়ের নামের সাথে আমার নামটি নাসের রহমান দেখা যাচ্ছে। উপর থেকে একটি বই হাতে নিতে মনটা বিস্ময়ে ভরে গেল। কোনমতে বই থেকে অন্য কোথাও দৃষ্টি ফেরাতে পারলাম না। বইটির মলাট কোনমতে উল্টাতে পারলাম না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। চোখের পলক যেন পড়তে চায় না। শৈল্পিক কারুকার্যময় প্রচ্ছদ থেকে সত্যিই চোখ ফেরানো যায় না। নির্বাক দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাইন্ডার বললো বইটি বাসায় নিয়ে গিয়ে দেখেন। কথাটা শুনে যেন সম্বিৎ ফিরে এলো। ইচ্ছা হলো একটির পর একটি পাতা উল্টায়ে দেখি। কেমন করে শৈলীময় কারুকার্যপূর্ণ পাতাসব থরে থরে সাজানো আছে। এখন এসব দেখার সময় নেই। বইটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তবে এমন চমৎকার দৃষ্টিনন্দন বই আগে কখনো দেখিনি। অপূর্ব সুন্দর এ বইটির নাম ‘বন ময়ূরের কান্না’।

x