স্পেনিশ লেখক ফেদেরিকো গার্সিয়া লরকা

বিশ্ব সাহিত্য

তাওহীদুল ইসলাম বাবু

শুক্রবার , ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৩৩ পূর্বাহ্ণ
37

পুরো নাম ফেদেরিকো ডেল সেগরাদো কোরাজন ডি জিসাস গার্সিয়া লরকা কিন্তু বিশ্ব সাহিত্যে তিনি ফেদেরিকো গার্সিয়া লরকা নামেই পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন স্পেনিশ কবি, নাট্যকার ও থিয়েটার পরিচালক। আরো ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্ব দরবারে স্পেনিশ সাহিত্যকে তুলে ধরেন। জন্ম- ৫ জুন ১৮৯৮ সাল। জন্মস্থান- ফুয়েন্তি ভ্যাকুয়ারস আন্দালুসিয়া, স্পেন, আর মৃত্যু-১৯ আগস্ট, ১৯৩৬ সাল। তার মৃত্যু স্থান ছিল- গ্রানাডায়। সাহিত্য চর্চায় তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন সালভাদর ঢালি, উইলিয়াম শেঙপিয়ার, লুইস বানুয়েল ও প্রমুখ লেখকদের দ্বারা। বিশ্বখ্যাত সাকরেড হার্ট বিশ্ববিদ্যালয়, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়াশুনা করেন।
১৯১৯ সালে লরকা মাদ্রিদে আসেন এবং সেখানে তিনি চিত্র শিল্পী সালভাদর ঢালির সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন যিনি তাকে নাটক প্রয়োজনীয় সহায়তা করেছিলেন। স্পেনিশ ভাষায় লেখা লরকার দুটি বিখ্যাত কাব্য সংকলন হল ‘কনসিয়নস’ বা সঙ্গীত এবং ‘রোমানসিরো গিতানো’ বা দ্যা জিপসি বালাদ। স্পেনের গৃহ যুদ্ধের সময় তিনি জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো এর গেরিলাদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
লরকা ছিলেন স্পেনের বিখ্যাত কবিদের অন্যতম ও একজন সেরা নাট্যকার। লরকার কাব্যে ছিল তিন মাত্রার সাহিত্য অলংকার ও রোমান্স। ‘রোমানসিরো গিতানো’ কাব্যে তিনি মানবীয় যৌন কামনার বিষয়গুলো বিচিত্র্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ১৯৩০ সালের দিকে লরকা নাটক রচনায় বেশি মনোনিবেশ করেন। এ সময়ে তিনি ফোকলার সাহিত্য নিয়েও কাজ করেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয় তার লোক নাট্য গাঁথা যা ছিল তিনটি নাটক সমন্বয়ে- ‘বোদাস ডি সেংরি’ বা ব্লাড ওয়েডিং। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘ইরমা’ এবং ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘লা কাঁসা ডি বারনরদা আলবা’ বা দ্যা হাউজ অব বারনরদা আলবা।
১৯৩৬ সালে স্পেনিস সিভিল ওয়ার শুরু হলে তিনি গেরিলাদের হাতে অ্যাটক হন। আগস্টের ১৯ কিংবা ২০ তারিখ ফ্রাঙ্কোর লোকেরা কবিকে বিনা বিচারে গুলি করে হত্যা করেন। তার মৃতদেহ কখনো খুঁজে পওয়া যায়নি। কবির জাতীয়তা ছিল স্পেনিশ আর তিনি স্পেনিশ ভাষাতেই লেখালেখি করতেন। তার পিতার নাম-ফেদেরিকো গার্সিয়া রঁদরিগেজ আর মা হলেন ভিসেনটা লরকা রোমেরো। স্পেনিশ নামকরণের প্রথা অনুযায়ী একজন লোক সাধারণত তার পিতার উপনামকে নিজের প্রধান নাম হিসাবে ব্যবহার করে। অথচ তিনি পিতার নামের একাংশ নিয়েছেন গার্সিয়া আর মায়ের নামের একাংশ নিয়েছেন লরকা, তবে লরকা নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। লরকা আন্তর্জাতিক সংস্থা জেনারেশন-২৭ এর সদস্য ছিলেন। এটি ছিল বিখ্যাত সব কবিদের আন্তর্জাতিক একটি সংগঠন। ২০০৮ সালে এক স্পেনিশ জাজ লরকার হত্যাকারীদের বিচার শুরু করেছিল। তার মৃতদেহের অস্তিত্ব খোঁজার জন্য আলফাকর এলাকায় সব গণকবর খোঁড়াখুঁড়ি করা হয় কিন্তু সেখানে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।
লরকার জন্মস্থান ছিল একটি সুন্দর ছোট শহর যা গ্রানাডা থেকে মাত্র কয়েক মাইল পশ্চিমে অবস্থিত ফুয়েন্তি ভ্যাকুইরস। তার পিতা ফেদেরিকো গার্সিয়া রঁদরিগেজ ছিলেন একজন সম্পদশালী বা ভূ-স্বামী বা জমিদার। পাহাড়ের পাদদেশের উপর উপত্যকায় তার এক বৃহৎ খামার ছিল। এটি ছিল শহরের মধ্যস্থলে অবস্থিত একটি নয়ানাভিরাম উপত্যকা এবং একটি পরিচিত এলাকা। ইক্ষু উৎপাদন ও চিনি শিল্প তাদের ভাগ্যকে বদলে দিয়েছিল। কবির মা ভিসেনতা লরকা রোঁমেরো ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক ও সভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। ১৯০৫ সালে তাদের পরিবার ফুয়েন্তি ভ্যাকুইরস এলাকা ছেড়ে পার্শ্ববর্তী শহর ভলদারুবিয়োতে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। ১৯০৯ সালে লরকার বয়স যখন মাত্র এগার তখন তাদের পরিবার গ্রানাডাতে চলে যায়। সেখানে তাদের গ্রীষ্ম মণ্ডিত বাড়িটি ‘হুয়েরতা ডি সান ভিসেনতি’ নামে পরিচিত ছিল। বাড়িটি মূলত শহরের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত ছিল। এমনকি কবি তার জীবনের শেষ দিনগুলোতে প্রকৃতি ঘেঁষা পরিবেশ বেষ্টিত এ বাড়িতেই বসবাস করতে ভালোবাসতেন। কবির স্মৃতি বিজড়িত তিনটি বাড়ি যথাক্রমে ‘ফুয়েন্তি ভ্যাকুইরস’, ‘ভলদারুবিয়ো’ এবং ‘হুয়ের্তা ডি সান ভিসেনতি’ বর্তমানে যাদুঘর হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
১৯১৫ সালে মাধ্যমিক স্কুলের লেখাপড়া শেষ করার পর কবি বিশ্বখ্যাত গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কবি সেখানে আইন, সাহিত্য ও কম্পোজিশন নিয়ে পড়াশুনা করেন। বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই সঙ্গীত ও সাহিত্যে কবির গভীর ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়। এমনকি কবির বয়স যখন মাত্র এগার বছর ছিল তখন থেকে প্রায় ছয় বছর তিনি এন্টোনিও সেগুরা মিসা এর নিকট পিয়ানোর সুর ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার শিখেছিলেন। তার সঙ্গীত গুরু তাকে মিউজিকের মধ্যে ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও ক্যারিয়ার দেখার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। ক্লডি ডিবিসি, ফ্রেদেরিক চপিন, লুডউইগ ভান বিথোবেন নামের কয়েকটি সঙ্গীতে কবি সুর তুলেছিলেন। ম্যানুয়েল ডি ফালা ছিলেন কবির এক বন্ধু যিনি তার সাথে স্পেনিশ ফোকলার নিয়ে মিউজিকে কাজ করেছিলেন। ১৯১৬ সালে তার সঙ্গীত গুরু এন্টোনিও সেগুলার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কবি তার লেখালেখির ক্যারিয়ার শুরু করেননি।
‘নকচারনি’, ‘বালাদ এন্ড সনেটা’ ছিল লরকার জীবনের প্রথম দিনের কবিতা যা তিনি মিউজিক্যাল ফর্মে রূপ দিয়েছিলেন। তার পরিচিত তরুণ শিল্পীরা তখন প্রতিদিন গ্রানাডার ‘ক্যাফে আলামেডার এল রিনকনসিলো’ নামক স্থানে সঙ্গীতের আড্ডায় বসত। ১৯১৬ থেকে ১৯১৭ সালের দিকে গার্সিয়া লরকা উত্তর স্পেনের কাস্টাইল লিওন ও গ্যালিসিয়া নামক স্থানে ভ্রমণ করেন। এ সময়ে কবির সফর সঙ্গী ছিল তার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। কবির লেখালেখির উৎসাহ দেখে তার শিক্ষক মুগ্ধ হন এমনকি তার অনুপ্রেরণায় কবি রচনা করেন ‘ইমপ্রেসনস ই পেইসাজেস’ বা ইমপ্রেসনস এন্ড ল্যান্ডস্কেইপস, ১৯১৮ সালে বইটি প্রকাশনায় কবির পিতা খরচ বহন করেছিলেন।
মাদ্রিদের রেসিডেনসিয়া ডি এস্তুদিনতেস-এ বসবাস কালিন লরকার সাথে বন্ধুত্ব হয় লুইস বানুয়েল এবং সালভাদর ঢালির সাথে। তারা সবাই ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট ছিলেন এবং যাদের কর্মকাণ্ড স্পেনিশ সমাজকে প্রভাবিত করেছিল। কবি জোয়ান রামন জিমেনেজ এর লেখা লরকাকে প্রভাবিত করেছিল। নাট্যকার ইদারদো মারকুইনা এবং মাদ্রিদের এসলাভা থিয়েটারের পরিচালক গ্রেগোরিও ও মার্টিনেজ সিয়েরা এর সাথে লরকার সখ্যতা গড়ে উঠে। ১৯১৯-২০ সালে সিয়েরার আমন্ত্রণে কবি রচনা করেন বিখ্যাত নাটক ‘দ্যা বাটারফ্লাইস এভিল স্পেল’। এটি ছিল এমন একটি নাটক যেখানে, তেলাপোকা এবং প্রজাপতির মধ্যে ভালোবাসার অসম্ভবতা দেখানো হয়। যাতে সমর্থন যুগিয়েছিল তাদের প্রজাতির অপরাপর কিটপতঙ্গ। নাটকটি মঞ্চস্থ হলে হল ভর্তি দর্শক ছন্দ তুলে তুমুল করতালির মাধ্যমে আনন্দ উল্লাস করে তাদের ইতিবাচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করে যা লরকার জনপ্রিয়তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
১৯২৭ সালে বের হয় তার নাটক ‘মারিয়ানা পিনেদা’ যা কবিকে নাট্য জগতের স্বীকৃতি এনে দেয়। রেসিডেনসিয়া ডি এস্তুদিয়ানতেস এর সময়গুলোতে লরকা আইন ও দর্শনশাস্ত্র নিয়ে লেখাপড়া করেন কিন্তু তিনি বরাবরই সাহিত্য সাধনায় বেশি আনন্দ পেতেন। ১৯২১ সাল লরকার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বের হয়। এটি প্রকাশে তার ভাই ফ্রান্সিসকো তাকে সাহায্য করেছিল। এতে প্রকাশ পেয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস বোধ, বিছিন্নতা ও প্রকৃতির বর্ণনা। ১৯২২ সালের দিকে লরকা একবার যোগ দেন গীতিকার ম্যানুয়েল ডি ফালার এর সাথে এবং তারা বিভিন্ন উৎসবে গান করতেন। এ সময়ে তিনি ‘পয়েম অব দ্যা ডিপ সং’ লেখার জন্য কাজ করেছিলেন যা প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। পরবর্তী বছর গ্রানাডাতে তিনি ফালাও এবং অন্যান্য গীতিকারদের সাথেও কাজ করেছিলেন শিশুদের উপযোগী কিছু নাটক তৈরিতে যার বিবরণ তার আন্দালুসিয়ার গল্পে পাওয়া যায়। তার মৃত্যুর বহু বছর পর বের হয় তার নির্বাচিত কিছু গান নিয়ে গ্রন্থ ‘ডিপ সং’। ১৯২৮ সালে বের হয় তার দুটি সেরা কাব্য ‘কনসিওনেস’ এবং ‘রোমান সিরো গিতানো’ এগুলো ছিল স্পেনিশ কাব্য জগতের মধ্যমণী।
তার কাব্যগুলো যেন শিল্পীর হাতে আঁকা ছোট ছোট টুকরা, এতে বর্ণনা পেয়েছে আন্দালুসিয়ার বেদেদের কাহিনী, ঘোড়ার আস্তাবল, দেব দূতদের আগমন, গ্রহ নক্ষত্রের বর্ণনা, নদী নালা, অপরাধ প্রবণতা, চোরাকারবারিদের কৌশল ও কর্ডোভার উলঙ্গ ছেলে ছোকারদের করুণ জীবন কাহিনী। ‘মারিয়ানা পিনেদা’ নাটকটি মঞ্চস্থ করার সময় সালভাদর ঢালি তার সাথে ছিলেন। ১৯২৭ সালে এটি মঞ্চস্থ হলে বার্সিলোনায় দর্শক শ্রোতাদের মধ্যে জয়ধ্বনী উঠে। ১৯২৬ সালে তিনি লিখেন ‘দ্যা স্যুমেকারস প্রোডিজিয়াস ওয়াইফ’ যা বিভিন্ন কারণে ১৯৩০ সালের আগে মঞ্চস্থ করা হয়নি। এটি ছিল একটি ফ্যান্টাসি নাটক যাতে দেখানো হয় উচ্ছৃঙ্খল গৃহবধূদের ছেনালীপূর্ণ আচরণ।
১৯২৫-২৮ এ সময়কালীন তিনি সালভাদর ঢালির সাথে কাটিয়েছিলেন। তাদের বন্ধুত্ব এমন অন্তরঙ্গ ছিল যে, লেখালেখির সকল বিষয় তিনি ঢালির সাথে শেয়ার করতেন। ঢালি তাকে অতি মাত্রায় প্রেম না টেনে বেদেদের লোক সংগীত লেখায় উৎসাহিত করেছিলেন। কবির সাথে ভাস্কর সুন্দরী এমিলিও সোরিয়ানো অলড্রিন- এর চলমান প্রণয় সম্পর্ক তখন কিছুদিনের জন্য ভাটা পড়ে যায়। এসব কারণে তিনি কিছুদিন বিষণ্নতায় ভুগছিলেন আর নিজকে সমকামিতায় জড়িয়ে ফেলেন। একদিকে তার উচ্ছন্ন ব্যক্তিগত জীবন আর অন্যদিকে একজন জনপ্রিয় কবি, এ দুদল্যতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। লোকরা তখন তাকে জিপসী কবি বলে ডাকতে শুরু করে।
১৯২৯ সালের জুনে লরকা একবার আমেরিকায় ভ্রমণ করেন। এ সময়ে তার সফরসঙ্গী ছিল ফারমানদো ডি লস রায়োস। তখন তারা নিউইয়র্ক সিটিতে অবস্থান করেন এবং একদিন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জেনারেল স্টাডিজ বিভাগের এক সেমিনারে কবি বক্তৃতা করেন। নিউইয়র্কে বসে কবি যেসব কবিতা লিখেছেন তা মরণোত্তর ১৯৪২ সালে ‘অ্যা পয়েট ইন নিউইয়কর্’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এর কিছুদিন পর কবি কিউবার হাভানায় চলে যান।
১৯৩০ সালে লরকা আবার স্পেনে ফিরে আসেন এবং একনায়ক প্রিমো ডি রিভেরার সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। ১৯৩১ সালে তিনি টিট্রো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্টুডেন্ট থিয়েটার কোম্পানির ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভাগ থেকে এ প্রতিষ্ঠানের খরচ বহন করা হত ফলে স্পেনের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও তারা নাটকে কাজ করার অনুমতি পেত। এ সময়ে তিনি কিছু বিখ্যাত নাটক লিখেন, ‘ব্লাড ওয়েডিং’, ‘ইরমা’ এবং ‘দ্যা হাউজ অব বারনদা আলবা’। তিনি ইউরোপিয়ান থিয়েটারের মৌলিক বিষয়গুলো তুলে ধরতে সক্ষম হন এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
১৯৩৩ সালে তিনি একবার আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স গমন করেন এবং সেখানেও ব্লাড ওয়েডিং নাটকটি মঞ্চস্থ করেন। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় তার কাব্য ‘সনেটস ডি আমোর ওসকারো’ বা সনেটস অব ডার্ক লাভ । তার আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাটক হল, ‘দ্যা বাটারফ্লাইর্স এভিল স্পেল’, ‘দ্যা বিলি ক্লাব পাপেটস’, ‘দ্যা পাবলিক’, ‘প্লে উইদাউট অ্যা টাইটল’, ‘ড্রিমস অব মাই কাজিন অরেলিয়া’ – অসমাপ্ত), এছাড়াও তিনি অনেকগুলো বইয়ের অনুবাদের কাজও করেছেন। ১৯২৬-১৯৩৬ সময়কালের বিভিন্ন গ্রীষ্মকাল লরকা কাটিয়াছিলেন হুয়েরর্তা ডি সান ভিসেনটিতে তার ওখানে বসেই লিখেন ‘হোয়েন ফাইভ ইয়ারস পাস-১৯৩১’, ‘ব্লাড ওয়েডিং-১৯৩২,’ ‘ইরমা’-১৯৩৪ এবং ‘বিভান ডেল টামারিত’-১৯৩৬। আর ১৯৩৬ সালে এখান থেকেই তিনি গেরিলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। ১৯ আগস্ট ১৯৩৬ সালে মিলিশিয়ারা তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করে।
১৯৩৬ সালে তিনি লিখেন নাটক ‘দ্যা হাউজ অব বারনর্দা আলবা’ কিন্তু এটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৪৫ সালে। এতে তিনি দেখান যে, বারনর্দা হাউজ স্পেনের একটি বিখ্যাত বাড়ি। ল্যাডি বারনর্দা তার পাঁচ কন্যা, গৃহ পরিচারিকা লা পঞ্চিয়া ও আরো কিছু দাস দাসী নিয়ে বাড়িটিতে বসবাস করতেন। বাড়িটি স্পেনের আন্দালুসিয়ার ছোট্ট একটি গ্রামে অবস্থিত। নাটকের প্রথম দৃশ্যে দেখানো হয় যে, বারনর্দার মৃত স্বামীকে চার্চের ধারে রাখা হয়েছে আর তার বাড়িটি তখন বারনর্দার নির্দেশে লা পঞ্চিয়া ও অন্য এক ভৃত্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করছে। গৃহ স্বামী সদ্য মারা গেলে তার শোক কেটে উঠতে না উঠতেই গৃহকর্মী বারনর্দা বাড়িটি ঝকঝকে পরিষ্কার করে রাখার জন্য উঠে পড়ে লাগল। অথচ তখন ঘরে তার অবিবাহিত পাঁচ কন্যা, এদের সান্ত্বনা দিতে গৃহকর্তীর কোন নজর নেই। মৃত দেহ বয়ে নিয়ে যাওয়ার র‌্যালির শেষ ঘণ্টাটা যখন বাজল ঠিক তখুনি বারনর্দা প্রায় ২০০ মহিলা ও তার কন্যাদেরসহ ঘরের দিকে ফিরে চললেন আর গল্প গুজবে মেতে উঠলেন।
এ সুযোগে এলাকার সুদর্শন যুবক পিঁপে এল রোমানো প্রত্যাশা করতে লাগল যে, কোন ফাঁকে এ বাড়ির বড় মেয়ে এনগাস্টিয়াকে প্রেম নিবেদন করা যায়। এদিকে বারনর্দা হঠাৎ মেয়েদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলো যে, এখন থেকে পরবর্তী আট বছর মেয়েরা সবাই শোক পালন করবে শুধু এনগাস্টিয়া ছাড়া। এর বাইরে কেউ ভিন্ন কিছু বিয়ে কিংবা পার্সোনাল লাইফ নিয়ে চিন্তা করতে পারবে না। এ বাড়ির ছোট মেয়ে আদেলা ভাবল যে, মায়ের এসব নিরস কথা বার্তা ও নিপীড়নমূলক তিরস্কার থেকে সে নিজকে সরিয়ে রাখতে পারবে। এতসব বাধা সত্ত্বেও পিঁপের প্রস্তাবে এনগাস্টিয়া প্রলুব্ধ হল আর মায়ের অযৌক্তিক বাধা নিষেধ সত্ত্বেও মেয়েরা ছেলেদের প্রতিই ক্রমশ উৎসাহিত হতে থাকল। একদিন দেখা গেল আদেলা তার মুরগীর বাচ্চাদের নিয়ে খেলা করছে আর তখন বারনর্দা দেখল এনগাস্টিয়া নিজে সাজগোজ করছে সাথে মারিয়া জোসেফাও আছে। বারনর্দার বৃদ্ধা মাও ঘটনাটি দেখল এবং মেয়েদেরকে ভর্ৎসনা করল যে, কেন তারা সাজগোজ করছে এবং বিয়ের কথা ভাবছে।
নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যে দেখানো হল যে, শোকাবহ বছরগুলোতে তাদের মা কিভাবে তাদেরকে ঘরে বসিয়ে রেখে সেলাইয়ের কাজে বাধ্য করছে আর অন্য মেয়েরা গল্প করছে যে কিভাবে এনগাস্টিয়া লুকিয়ে চুরিয়ে পিঁপের সাথে কথা বলছে। আর লা পাঞ্চিয়া মেয়েদেরকে গল্প শুনিয়ে ক্ষ্যাপাত যে তাদের চেয়েও ছোট বয়সে সে কিভাবে তার স্বামীর সাথে আনন্দময় সময় কাটিয়েছিল!
মেয়েরা আরো উদ্বিগ্ন হয়ে গল্প করতো ম্যাগডোলেনাকে নিয়ে যার ইদানীং ঘুম কম হয়। আর মার্টিরিয়ো যে ছিল ঘরের মধ্যে একমাত্র কুঁজোওয়ালা মেয়ে যে সারাক্ষণ মায়ের বাধা নিষেধের ভয়ে অস্থির থাকত। আদেলা লুকিয়ে চুরিয়ে পিঁপের কিছু খোঁজ খবর এনে তার বোনকে দিত আর মেয়েরা রাতভর গল্প করতো যে কেন পিঁপে সারারাত ঘরের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকে যে কখন এনগাস্টিয়া ঘুমাতে যাবে। এনগাস্টিয়া একদিন শোরগোল শুরু করল যে, কেউ একজন তার বালিশের নিচ থেকে পিঁপের ফটো চুরি করে নিয়ে গেছে। পরে দেখা গেল তার বোন মার্টিরিও চুরি করেছে। নাটকে দেখা যায় মায়ের কঠোর বাধা ও শাসনের ফলে মেয়েদের প্রেমের কাহিনী এভাবে শেষ হয় যে, শেষ দৃশ্যে পিঁপেকে হত্যা করার জন্য বারনর্দা একটি বন্দুক নিয়ে আসে। আরেক কন্যা মার্টিরিও তখন ভয়ে চিৎকার করে প্রচার করতে থাকে যে, তার মা পিঁপেকে গুলি করেছে। ঘটনার বিহবলতায় শোকে ও ভয়ে আদেলা সাথে সাথে আত্মহত্যা করে আর এ সুযোগে পিঁপে পালিয়ে বেঁচে যায়। মূলত লরকার নাটকগুলো ছিল জীবন্ত যেখানে উঠে এসেছে তৎকালীন স্পেনের জীবন সভ্যতা, সমাজ ও সংস্কৃতি। তিনি তার নাটকে সরকারের দমন পীড়ননীতির কঠোর সমালোচনাও করেন।

x