স্নায়ুরোগীর সংখ্যা বাড়ছে ॥ পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিত করতে হবে

সোমবার , ২৩ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ
121

দেশে স্নায়ুরোগী বাড়ছে, কিন্তু সেবা বাড়ছে না। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল (নিনস) ২০১৩ সালে চিকিৎসা নেন ৩৮ হাজার ১৬০ জন। এরপর প্রতি বছরই বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। স্নায়ুরোগের চিকিৎসায় বিশেষায়িত হাসপাতালটিতে ২০১৬ সালে সেবা নেন ২ লাখ ৪ হাজার ৪৪২ জন। অর্থাৎ তিন বছরে শুধু এ হাসপাতালেই স্নায়ুরোগী বেড়েছে ৪৩৫ শতাংশ। তবে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে অনেকে ফিরেও যাচ্ছেন। এ হাসপাতালের বাইরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরেও দেখা গেছে স্নায়ুরোগীদের ভিড়। রোগী বাড়লেও চিকিৎসা সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। অবকাঠামোর পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট। চিকিৎসাসেবার অপর্যাপ্ততায় বর্ধিত নিউরো রোগীদের অনেকেই দেশের বাইরে যাচ্ছেন। উচ্চবিত্তরা থাইল্যান্ড সিঙ্গাপুরকে বেছে নিলেও মধ্যবিত্তরা পাড়ি দিচ্ছেন পাশের দেশ ভারতে। চিকিৎসা ভিসায় ভারতে বাংলাদেশী পর্যটকের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিও একই কথা বলছে। ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব কমার্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্ট্যাটিকসের (ডিজিসিআই অ্যান্ড এস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫১৬ অর্থবছর ভারতে চিকিৎসা নিয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার বাংলাদেশী। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। খবরে আরো বলা হয়, চিকিৎসকদের মতে, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে স্ট্রোক, ডিমেনসিয়াসহ মস্তিষ্কের নানা ধরনের রোগ দেখা দিচ্ছে। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার কারণে মানুষ মাথা ও স্পাইনাল কডে আঘাত পায়, যা নিউরোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সড়ক দুর্ঘটনার অধিকাংশ রোগীই নিউরো বিভাগের। এছাড়া দেশে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগী বেশি। এ রোগগুলো যত বাড়ছে, স্নায়ুজনিত রোগও তত বাড়ছে। সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে এরোগে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। এ হিসাবে প্রতি লাখে স্নায়ুরোগে আক্রান্ত প্রায় ২৫০ জন।

স্নায়ুরোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ লাখ জানলেই আঁতকে উঠতে হয়। সংখ্যাটা অবশ্যই বিপুল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বাড়ন্ত রোগীর বিপরীতে স্নায়ুরোগের চিকিৎসা সুবিধা এখনো যথেষ্ট কম। নিনস পাশাপাশি ঢামেক ও বিএসএমএমইউমতো বড় হাসপাতালগুলোয় স্নায়ুরোগের চিকিৎসা দেওয়া হলেও রোগীর ভিড়ের কাছে তা বড়ই অপ্রতুল। তার চেয়েও বড় কথা, স্নায়ুরোগীর চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে অবকাঠামোর পাশাপাশি চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির প্রচণ্ড অভাব। এ অবস্থা দীর্ঘতর হলে যে সার্বিকভাবে পরিবার তথা দেশের ক্ষত বাড়বে; স্নায়ুরোগীরা সেবাবঞ্চিত হবে, সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কাজেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত, স্নায়ুরোগের, পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিত করতে ঘাটতি পূরণের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

তথ্যানুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বর্তমানে ১৪৫ জন নিউরো সার্জন রয়েছেন। রোগী যে হারে বাড়ছে, সে হিসাবে কমপক্ষে দেড় হাজার চিকিৎসক প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় না থাকারই মতো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক তৈরির উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। তার ওপর আছে যন্ত্রপাতির ঘাটতিও। ঢাকার বাইরে বরিশাল বাদে রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুরসহ সব মেডিকেল কলেজ নিউরোসার্জারির চিকিৎসক রয়েছেন বটে, তবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে তারা সাধারণ চিকিৎসা সেবাও দিতে পারছেন না। ফলে চিকিৎসা সেবার অপর্যাপ্ততায় বর্ধিত স্নায়ুরোগীদের অনেকেই বিদেশমুখী হচ্ছেন। যাঁদের আর্থিক সঙ্গতি আছে তাঁরা যাচ্ছেন থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যাঁদের ততটা আর্থিক সঙ্গতি নেই, অর্থাৎ মধ্যবিত্তরা যাচ্ছেন পার্শ্ববর্তীদেশ ভারতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, অর্থাভাবে গরীব রোগীরা দেশের বাইরে যেতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে দেশেও চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। তাঁরা চিকিৎসার অভাবে মরণের অপেক্ষায় রয়েছেন। এই ভয়াবহ অবস্থার ত্বরিত অবসানই আমাদের কাম্য।

সংবিধান মতে, দেশের সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য ও দায়িত্ব। এটা সরকারের মনে রাখা বিধেয়। সে দিক থেকে স্নায়ুরোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র শৈথিল্যও কাম্য নয়। স্নায়ুরোগ বৃদ্ধির বিষয়টিকে আধুনিক জীবনের অন্যতম প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করে এ ক্ষেত্রে গবেষণা বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দিতে সক্ষম এমন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তৈরি করতে হবে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক। একজন স্নায়ুরোগীও যাতে চিকিৎসার অভাবে মারা না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো আমলে নিয়ে এ ব্যাপারে ত্বরিত সক্রিয় হবে।

x