স্থানীয় সরকারের সেবায় সন্তুষ্ট নয় মানুষ ক্ষমতায়ন ও দক্ষতা বাড়াতে হবে

বৃহস্পতিবার , ১১ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
36

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এ জন্য ৪৭ শতাংশ মানুষই এখনো স্থানীয় সরকারের সেবা থেকে বঞ্চিত। আর যারা সেবা পাচ্ছে তাদের ৩৮ শতাংশ সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। বিশ্বব্যাংক ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি রাজধানীর আমারি হোটেলে আয়োজিত এক সেমিনারে ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ লোকাল গভর্নমেন্ট পাবলিক ফিন্যাসিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি সরবরাহ, সামাজিক সুরক্ষা, পয়ঃনিষ্কাশন, বসতবাড়ি, নিরাপত্তা অবকাঠামোসহ স্থানীয় সরকারের দেয়া নানা সুবিধা নিয়ে ৬৮ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট, বাকি ৩৮ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট নয়। তাদের অসন্তুষ্টির কারণ হিসেবে বিকেন্দ্রিকরণের অভাব, গুণগত মান, অর্থায়ন ঘাটতি, ব্যবস্থাপনা ও সেবা প্রদানে নানা দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত সেবাগুলোয় নাগরিকরা কতটা সন্তুষ্ট তার একটি চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদগুলোর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সন্তুষ্ট ৬২ শতাংশ মানুষ, এছাড়া শিক্ষাসেবায় ৭০ শতাংশ, পানি সরবরাহে ৬৪ শতাংশ, সামাজিক নিরাপত্তায় ৭২ শতাংশ, আবাসন সুবিধায় ৩৭ শতাংশ, অবকাঠামোয় ৬৬ শতাংশ, নিরাপত্তায় ৫৪ শতাংশ, পয়ঃনিষ্কাশনে ৫৪ শতাংশ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ৭১ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট রয়েছেন। সব মিলিয়ে ৬২ শতাংশ মানুষ এসব সেবায় সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ইউনিয়ন পরিষদগুলো থেকে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন ৬০ শতাংশ মানুষ। এছাড়া শিক্ষার সেবায় ৬১ শতাংশ, পানি সরবাহে ৬৭, সামাজিক নিরাপত্তায় ৬৭, বসতবাড়ির ক্ষেত্রে ৩০, অবকাঠামোর ক্ষেত্রে ৬৩, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ৪২ পয়ঃনিষ্কাশনে ৩৩ এবং সামাজিক সচেতনতামূলক সেবা পাচ্ছেন ৬১ শতাংশ মানুষ। গড়ে এসব সুবিধা ৫০ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছালেও এখনো ৪৭ শতাংশ মানুষ এসব সেবা থেকে বঞ্চিত। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এসব খবর প্রকাশিত হয়।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, অবকাঠামোসহ নানা ধরনের সুবিধা শতভাগ নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের তথা স্থানীয় সরকারের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, উল্লিখিত খবরে দেখা যাচ্ছে স্থানীয় সরকারের এসব সুবিধা থেকে এখনো ৪৭ শতাংশ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। অর্থাৎ স্থানীয় সরকার নাগরিকদের অবশ্য প্রাপ্য এসব সুবিধা পৌঁছে দিতে পারছে না। তার ওপর যারা এসব সুবিধা পাচ্ছেন তাদের মধ্যে ৩৮ শতাংশ সন্তুষ্ট নন। গুণগত মান, অর্থায়ন ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটিতে তারা অসন্তুষ্ট। স্থানীয় সরকারের সঙ্গে এ দেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ যুক্ত থাকলেও স্থানীয় সরকারের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদগুলো শক্তিশালী নয়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় রয়েছে নানা জটিলতা ও চ্যালেঞ্জ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্পদের সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দুর্বলতা, দক্ষ জনবলের অভাব জনগণের কাছে সঠিক সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের অভাব, বাজেট ব্যবস্থাপনার অভাব ইত্যাদি। স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট (বিভাগ অথবা জেলা) গঠন ও কার্যকর করার ওপর জোর না দিয়ে মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে উপজেলার ওপর অতিমাত্রায় জোর দিতে গিয়েও ইউনিয়নকে অবহেলিত ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের চেয়ারম্যানরা তাদের কোন কাজকেই নিজের মনে করেন না। তারা তাকিয়ে থাকেন কেন্দ্রীয় সরকার এবং তার প্রতিনিধিদের দিকে। যদি স্থানীয় সরকারকে বিকেন্দ্রীকরণ বা যথার্থ স্বায়ত্তশাসিত করা হতো, তাহলে ঐসব কাজ তারা নিজেদের মতো করে রক্ষণাবেক্ষণ বা বাস্তবায়ন করতেন। এতে সেবার মানও বাড়তো। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, বাজেট দেওয়া বরাদ্দ ও সুবিধাগুলো সময়মতো পৌঁছাতে হব্‌ সে্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এটা করছে। অথচ আমাদের দেশে জনগণের গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এজন্য বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমাদের দেশের পার্থক্য রয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো ইউনিয়ন পরিষদগুলোর আর্থিক সচ্ছলতা নেই। তাদের কর আদায় বাড়ানোরও সক্ষমতা নেই। এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হলে ইউনিয়ন পরিষদগুলোয় নতুন পদ সৃষ্টি করতে হবে। এতে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে ইউনিয়ন পরিষদগুলো জনগণকে সেবা দিতে পারবে। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে হলে চারটি বিষয় অত্যাবশ্যক। এগুলো হলো, সরকারের সদিচ্ছা, জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানো, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো ও আর্থিকভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থ করা। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকারগুলোর যে কাজগুলো করার কথা, সেসব কাজ করা হচ্ছে কিনা সেটাও সরকার দেখে না। উপরন্তু কাজগুলো করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক সামর্থ্য গড়ে তোলার কোন পদক্ষেপও নেয়া হয়নি। পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষার মতো সরকারের সেবাদানকারী বিভাগগুলোর সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। মন্ত্রণালয়গুলো নিজেদের মতো পরিকল্পনা তৈরি করে তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করে। এসব পরিকল্পনা তৈরিতে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা না থাকায় কার্যকর সুফল দেয় না।
স্থানীয় সরকারের রাজস্ব আয়ের একমাত্র উৎস স্থানীয় কর। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী পরিষদগুলো পর্যাপ্ত কর আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে। বিপত্তিতে পড়েছে স্থানীয় সরকারগুলো। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে স্থানীয় সরকারকে আরো শক্তিশালী করা হবে। স্থানীয় সরকারগুলোর স্তর পুনর্বিন্যাস করে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনা তাদের হাতে দেওয়া হবে। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের ইশতেহারে স্থানীয় সরকার গুরুত্ব পেয়েছে। একটি বিশেষ অঙ্গীকারের শিরোনাম ‘আমার গ্রাম, আমার শহর : প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ’। এর আওতায় যাতায়াত, যোগাযোগ, সুপেয় পানি, সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এসব করতে হলে স্থানীয় সরকারকে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।

x