স্থানীয়দের ভিটামাটিতে রোহিঙ্গাদের আবাস

কুতুপালংয়ে দুর্ভোগে আড়াইশ বাংলাদেশী পরিবার

রফিকুল ইসলাম, উখিয়া

শনিবার , ২৩ জুন, ২০১৮ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ
204

কুতুপালং সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর আশ্রয় স্থল। এই অঞ্চলকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মানবিক দিকটি ফুটে উঠেছে। কিন্তু এখানকার রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির অভ্যন্তর ও আশপাশে কয়েক দশক ধরে বসবাসকারী স্থানীয় অন্তত আড়াইশ বাংলাদেশী পরিবারকে পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। আশ্রিত লাখ লাখ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা কর্তৃক এসব স্থানীয় লোকজন নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের খবর কেউ নিচ্ছে না। বরং এসব বাংলাদেশী লোকজনকে রোহিঙ্গাদের কাছে জিম্মি অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড কুতুপালং এলাকা। কুতুপালং বাজার পাড়া, স্বর্ণ পাহাড়, লম্বাশিয়া, শাহপরীর দ্বীপ পাড়া ও টিভি কেন্দ্র সংলগ্ন পাড়ায় স্থানীয় বাংলাদেশী প্রায় আড়াইশ পরিবারের বসবাস। কয়েক দশক ধরে এসব লোকজন ক্রমাম্বয়ে বসতি গড়ে তুলেছেন। কিছু কিছু লোকের জোত জমি থাকলেও প্রায় অধিকাংশের বসতি সরকারি বন ভূমিতে। বছরের পর বছর ধরে তারা এখানে ঘরবাড়ি তৈরি করে খেত খামার গড়ে তুলেছে এবং হাঁস মুরগি, গবাদি পশু লালন পালন করে আসছে। ১৯৯২ সাল থেকে কুতুপালংয়ে সীমিত বন ভূমির উপর রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির ছিল। কিন্তু গত বছরের ২৫ আগস্টের পর ব্যাপক হারে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গার ঢল নামায় সে সময় যে যেখানে পেরেছে আশ্রয় নিয়েছে। উল্লেখিত পাড়াগুলো রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের আশপাশে হলেও রোহিঙ্গাদের থেকে তারা ছিল অনেকটা দূরে ও নিরাপদে। কিন্তু গত বছরের আগস্টের পর আসা রোহিঙ্গারা এসব বাংলাদেশী পাড়ায় গণবসতিতে আবাসস্থল গড়ে তোলে।

লম্বাশিয়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সাইফুল আলম (৪০), আলতাফ হোসেন (৩২), টিভি কেন্দ্র এলাকার উমর আলী (৫৫), সুলতান আহমদ (২৮) সহ অনেকে বলেন, উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দিয়ে আমরাই এখন উদ্বাস্তুর মত জীবন কাটাচ্ছি। কোনটা আমাদের বসত ভিটা, ক্ষেতখামার তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। সর্বত্র রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণ।

লম্বাশিয়া এলাকাটি পড়েছে নতুন করা ক্যাম্প১ উত্তর ও ক্যাম্প১ পশ্চিমাংশ, টিভি কেন্দ্র এলাকা পড়েছে ক্যাম্প৭ ও ক্যাম্প৮ এর পূর্বাংশ। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছে ক্যাম্প৩ ও ৪ এলাকার অভ্যন্তরে শাহ পরীর দ্বীপ পাড়ার ৫০/৬০টি পরিবার। চতুর্দিকে রোহিঙ্গা আশ্রয় স্থলের মাঝে এ কয়টি পরিবারে ঘরবাড়ি। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার সমুদ্রের করাল গ্রাসের ভাঙনের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে এসব পরিবার ৭/৮ বছর ধরে বন বিভাগের পাহাড়ি জঙ্গলাকীর্ণ জমি আবাদ করে বসতি গড়ে তুলেছে। এখানকার হেলাল উদ্দিন (১৮) জানান, তার পিতা আব্দুল মুনাফ জীবিকার তাগিদে শাহ পরীর দ্বীপ এলাকায় সমুদ্রে মাছ শিকার করেন। সে, তার মা, ৬ ভাই ও এক বোন ২০ শতক বন ভূমিতে ঘর করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে তাদের ঘরের চতুর্দিকে গড়ে উঠেছে শত শত রোহিঙ্গার ঘর। কার্যত ৩/৪ শতকের উপর ঘরটি ছাড়া আর কোনো অবশিষ্ট নেই।

জাহেদা বেগম (২৮) ও তার ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া মাহমুদুল্লাহ (১৪) অসহায়ের মত জানায়, /৪ বছর পূর্বে সমুদ্র পথে পিতা নুরুল বশর মালয়েশিয়া চলে যান। ৪০ শতকের বেশি পাহাড়ি টিলার উপর তাদের মাটির টিনের চালা ঘর ও বসত ভিটা। ঘরের চতুর্দিকে ছিল আম কাঁঠালের বাগান। এখনো অবশিষ্ট থাকা কয়েকটি গাছে প্রচুর আম দেখা গেছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা সব আম খেয়ে ফেলছে। পুরো ভিটায় আম বাগান থাকলেও বাগান কেটে ৪০টির বেশি রোহিঙ্গার ঘর হয়েছে। করা হয়েছে ল্যাট্রিন, নলকূপ, গোসলখানা। জাহেদা জানান, রাতদিন রোহিঙ্গাদের ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকে। ঘর থেকে বের হওয়া কঠিন। ছেলে মেয়ে নিয়ে বসবাসের পরিবেশ নেই। নিজ ঘরে এক প্রকার বন্দি অবস্থায় ছেলে মেয়ে নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, তাদের সামনে রোহিঙ্গারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রকমের ত্রাণ সামগ্রী পেলেও এসব স্থানীয়দের কিভাবে জীবন কাটছে তার খবর কেউ রাখছে না।

এছাড়া তারা হাঁস মুরগি, গবাদি পশুসহ খেত খামারে কিছু করতে পারছে না। কিছু বললে উল্টো ঝগড়া করে। কুতুপালং এলাকার ইউপি সদস্য বখতেয়ার আহমদ বলেন, স্থানীয় প্রায় আড়াইশ পরিবারের দুর্ভোগের কথা প্রশাসনের কাছে নালিশ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ প্রশাসনের একটি কথা এসব লোকজন সরকারি জায়গার উপর বসবাস করায় তাদের কিছু করার নেই।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী এসব স্থানীয় বাংলাদেশীদের নানা দুর্ভোগের কথা নিশ্চিত করে বলেন, আসলে ব্যাপকহারে রোহিঙ্গা আসায় আশ্রয় শিবির অভ্যন্তর ও আশপাশে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে। তিগ্রস্ত এসব স্থানীয় লোকজনকে সরকারি নির্দেশনায় ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

x