স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স নৃত্যোৎসব

সনেট দেব

বৃহস্পতিবার , ৯ আগস্ট, ২০১৮ at ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ
5

স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স আয়োজিত দুই দিনের নৃত্যোৎসব গত ৬ জুলাই শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটায় চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে শুরু হয়। অনুষ্ঠানের প্রথম দিন কথামালার পাশাপাশি পরিবেশিত হয় ভরতনাট্যম। দুই পর্বের সাজানো আয়োজনে প্রথম পর্বে কথামালা ও দ্বিতীয় পর্বে পরিবেশিত হয় নৃত্য।

মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে উৎসব উদ্বোধন করেন চট্টগ্রামের ভারতীয় দূতাবাসের সহকারী হাইকমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি শারমিন হোসেন এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার মোসলেম উদ্দিন সিকদার উপস্থিত ছিলেন। মুজাহিদুল ইসলাম ও শ্রাবণী দাশগুপ্তার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স‘র সভাপতি শুভ্রা সেনগুপ্তা।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় নৃত্যস্রষ্টা নটরাজকে প্রণাম জানিয়ে। এতে নটরাজের পায়ে ফুল দিয়ে শুরু করে নৃত্য ‘পুষ্পাঞ্জলি’। নৃত্যটি পরিচালিত হয় আরাবী রাগের আদি তালে। নৃত্য পরিচালক শুভ্রা সেনগুপ্তার নৃত্য পরিচালনায় এতে অংশগ্রহণ করেন, সম্পূর্ণা দাশ, ফাতেমা তোজ জোহরা, টুকটুক চক্রবর্তী, ইশা দাশ, সুমন দাশ, মোহাম্মদ কামাল, রবিউল হোসেন, তন্ময় বড়ুয়া ও দুর্জয় মল্লিক।

এরপর পর শুরু হয় নৃত্য মঙ্গলম। এখানে ভূমি, বায়ু, অগ্নি, গগন, সূর্য, চন্দ্র, জগত, জীব, দেহ ইত্যাদি প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ বর্ণনা করা হয়। নৃত্যটি সোহালা রাগে চতুরাশ্র তালে সৃষ্ট। পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন, ইশা, ফাতেমা, টুকটুক, মনীষা, দুর্জয়, সাবেদুজ্জামান, প্রসুনজিৎ, তাবাস্‌সুম, সঞ্চিতা দাশ, সঞ্চিতা বর্ধন, শ্রেয়া, অদিতি, অদ্বিতিীয়া, দিশা, অরিণ, প্রমিয়া, এলিস।

সম্পূর্ণা, রেফানজীবা, শুভ্রাসেন গুপ্তার পরিবেশনায় আল্লারিপু নৃত্য বেশ দর্শক প্রিয়তা পায়। আল্লারিপু ভরতনাট্যম অনুষ্ঠানের প্রথম নৃত্য অংশ। তেলেগু শব্দ আল্লারিম্পু থেকে এই শব্দটির উদ্ভব। আল্লারিপু শব্দের অর্থ পুষ্পিত বা প্রস্ফুট হওয়া। নৃত্যের মাধ্যমে শিল্পী নটরাজ দেবতা, দর্শক, সঙ্গীত শিল্পী সকলের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। এরপর প্রিয়া, ফাতেমা, মনিষা, পূজা, তিলোত্তমা, ঋতুপর্ণার নূপূরের ছন্দে পরিবেশিত হয় নৃত্য কউত্তোম। এটি রাগ সম্মুখপ্রিয়া এবং তাল রূপক। এটি তামিল কবিতা তাল এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছে ভগবান কার্তিকের বিভিন্ন রূপ ও গুণ। এখানে বর্ণনা করেছে কার্তিক শিবের ছেলে, সৌন্দর্য্যের প্রতীক।

পুরো আযোজনে দৃষ্টিনন্দন ছিলো নৃত্যশিল্পী শুভ্রা সেনগুপ্তার একক পরিবেশনা নৃত্য বর্ণম। ভরতনাট্যমের নৃত্ত ও নৃত্য পরস্পর মিলিত হয়ে প্রথম রসাস্বাদনের দ্বারা নৃত্যাঙ্গ পরিস্ফূটিত হয়। সুন্দর ও সর্বাত্মক করে তোলে শিল্পীর অভিনয় দক্ষতা ও নৃত্য নিপুণতা সম্যক রূপ। বর্ণমে পল্লবী, অনুপল্লবী এবং সাহিত্য দেখা যায়। এটি দক্ষিণ ভারতীয় ভাষায়, নবরত্নমালিকা/ কল্যাণী হয় এর সংগীত ভক্তিমূলক রাগে ও আদি তালে পরিবেশিত হয়। বর্ণম এর পরেই এই পর্যায়ে প্রেম গীতিমূলক পদগুলি অভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশিত হয় পদম। সংগীতাংশে অধিকাংশক্ষেত্রেই জনপ্রিয় কবি জয়দেব, পুরন্দর দাশ, ক্ষেত্রায়া রচিত মধুর পদাবলী পরিবেশিত হয়। এই পদমে মা মেয়ের তার স্বামীর ঘরের যাওয়ার জন্য বোঝাচ্ছে। তোমার স্বামী খুবই ভালো। তুমি ওর সাথে ঝগড়া করো না। তুমি যাও। যাও তুমি। তাও পরিবেশন করেন নৃত্য শিল্পী শুভ্রা সেনগুপ্তা।

বাচ্চাদের পরিবেশনায় পুষ্পাঞ্জলি নৃত্যও মঞ্চ মাতায়। গম্ভীরানাঢেয় রাগে ও আদি তালে এই নৃত্য পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন শিশু শিল্পী সঞ্চিতা দাশ, দিশা, সঞ্চিতাবর্ধন, শ্রেয়া, অরিণ, অদ্বিতীয়া, অদিতি, প্রমিয়া, এলিস। দুইটি তিল্লানা নৃত্য দিয়ে পরিবেশনা দিয়ে শেষ হয় প্রথম দিনের আয়োজন। ধনুশ্রী রাগের আদি তালে প্রথম তিল্লানা শুরু হয়ে শেষ হয় বৃন্দাবনী সারেং রাগে আদি রাগে দ্বিতীয় তিল্লানা দিয়ে। এতে অংশগ্রহণ করেন সাইবা, তাসনিয়া, মীম, পূজা, জান্নাতুল মীম, তাবাসসুম, সম্পূর্ণা, কামাল, সুমন, প্রিয়া, ফাতেমা, রেফানানজীবা, ইশা ও শুভ্রা সেনগুপ্তা।

নৃত্যোৎসবের দ্বিতীয় দিনে ৭ জুলাই সন্ধ্যা সাতটায় পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতিনাট্য মায়ার খেলা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ পরিচালক ড. সেলবাম থরেজ, অধ্যাপক রীতা দত্ত, লিটল জুয়েলস স্কুলের অধ্যক্ষ দিলরুবা আহমেদ, অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ ডেপুটি ডিরেক্টর ড. গুরুপদ চক্রবর্তী ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা।

প্রকৃতির প্রতিশোধ’এর পর রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য নাট্যবর্গীয় সৃষ্টি ‘মায়ার খেলা’। এটি গীতিনাট্য। ১৮৮৮ সালে ‘মায়ার খেলা’ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন প্রথম দৃশ্যে মায়াকুমারীগণের আবির্ভাব। মায়াকুমারীগণ কুহক শক্তির প্রভাবে মানব হৃদয়ে নানাবিধ মায়া সৃজন করে। হাসিকান্না, মিলনবিরহ, বাসনালজ্জা, প্রেমের মোহএ সমস্ত মায়াকুমারীগণের ঘটনা। একদিন নব বসন্তের রাত্রে তাহারা স্থির করিল, প্রমোদপুরের যুবকযুবতীদের নবীন হৃদয়ে নবীন প্রেম রচনা করিয়া তাহারা মায়ার খেলা খেলিবে। সেই থেকেই গীতিনাট্যের নাম ‘মায়ার খেলা’।

সংসার বড়ো কঠিন। কঠিন নিশ্চয়ই ভালোবাসায় যথার্থই সফল হওয়া সেও সংসারের মতো কঠিন। কে যে কখন কার প্রেমে পড়বে তা বুঝে ওঠা যায় না। আর প্রেমে পড়ার ব্যাপারটিও যে কি, কেন এতে কি হবে সেও বোঝানো যায় না। মায়াকুমারীগণ অমর, শান্তা, অশোক, কুমার ও প্রমদার মধ্যে নানা ঘটনা ঘটিয়ে শেষে গিয়ে বলেছেন, এরা সুখের জন্য প্রেম চায় প্রেম মেলে না, সুখও চলে যায়। জীবনের কঠিন ঘটনাটি হচ্ছে এই যে প্রেমও যায় সুখও যায়থাকে শুধু যন্ত্রণা। ‘মায়ার খেলা’ এই অসামান্য যন্ত্রণাকে নানা ঘটনা পরম্পরার ভেতর দিয়ে বোধগম্য করে তুলেছে। ‘মানসী’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ নরনারীর সম্পর্ক নিয়ে যেমনটি ভেবেছেন, ‘মায়ার খেলা’ যেন তারই একটি তরলিত রূপ।

মায়ার খেলা’ গীতিনাট্যের মায়াকুমারী চরিত্রে সম্পূর্ণা, সাইবা, তাসনিয়া, পূজা, সেতুলী, মীম, জান্নাতুল; শান্তা চরিত্রে রেফা নানজীবা তোরসা ও সম্পূর্ণা দাশ; প্রমদা চরিত্রে শুভ্রা সেনগুপ্তা; প্রমদার সখীগণ চরিত্রে প্রিয়া, মনিষা, ফাতেমা, টুকটুক, ইশা, ঋতুপর্ণা, তিলোত্তমা; অমর চরিত্রে হিল্লোল দাশ; কুমার চরিত্রে মোঃ কামাল; অশোক চরিত্রে মোঃ রবিউল ইসলাম ও পদ্মা চরিত্রে তন্ময়, দুর্জয়, সাবেদুজ্জামান দীপ্ত, অমিত ও প্রসুনজিৎ অভিনয় করেন।

x