সৌন্দর্য ফিরে আসুক আমাদের চেতনায়

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ২২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ
16

রাজনীতি হারিয়েছে তার ঔদার্য। শিক্ষা হারিয়েছে তার নৈতিকতা। সংস্কৃতি হারিয়েছে তার নিজস্বতা, সমাজ হারিয়েছে তার মানবিকতা। মানুষ হারিয়েছে তার মর্যাদা। এভাবে ক্রমশ হারাচ্ছি আমাদের সবকিছু। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ পরিক্রমায় আমাদের অসাধারণ একটা অর্জন ছিল বহু মানুষের চেতনার দীর্ঘদিনের একটা দর্শন ছিল সেটা সামাজিক সাম্য এবং মানবিক মর্যাদা। এই দর্শনে মানুষের মধ্যে ঐকমত্য ছিল। পাকিস্তানিদের কাছে আমরা যত বেশী নিষ্পেষিত হয়েছি আমরা ততটা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। একাত্ম হয়েছি। স্বাধীন একটা দেশের স্বপ্ন যেমন ছিল তেমনি একটি কল্যাণমূলক সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্রও মানুষের প্রত্যাশায় ছিল। সময় খুব দ্রুত বদলে দিচ্ছে সবকিছু। সমাজ, রাষ্ট্র এসব বড় বড় ব্যাপার নিয়ে মানুষ এখন খুব ভাবছে না। এখন শুধু আমি আমাকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। বড় জোর পরিবারকে দেখি। মানুষ সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ে মানুষের মধ্যে আসছে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। সামাজিকভাবে বাস করতে গিয়ে মানুষ কিছু কিছু আদর্শ বা মানদণ্ড গ্রহণ করে নেয়। নীতিহীন সমাজ হয় বিভ্রান্তিকর ও অনিশ্চিত। নৈতিকতা হলো এক ধরনের মানবিক অবস্থা যা কাউকে অপরের মঙ্গল কামনা করতে এবং ভাল কাজের অনুপ্রেরণা দেয়। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেন ধর্ম, ঐতিহ্য ও মানব আচরণ এই তিনটি থেকে নৈতিকতার উদ্ভব ঘটে। সমাজে মানুষের যা কিছু করা উচিত তারা যা কিছু মঙ্গল মনে করে তার আদর্শ রূপই হচ্ছে মূল্যবোধ। এখন রাষ্ট্র কিংবা সমাজের যে রূপটি আমাদের সামনে দৃশ্যমান তা হচ্ছে করুণ রূপ। যে সমাজে ধনী দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে, সমাজ কাঠামোর বৈষম্য দূর করার সুযোগ নেই। বাজার অর্থনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের আগ্রাসন প্রতিষ্ঠিত সেখানে পরিবর্তন আমরা সহসা আশা করতে পারি না। নির্বাচন যেমনই হোক নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। সবকিছুৃতেই হারানো সৌন্দর্য ফিরে পাব এমন আশা করি না। সৌন্দর্য ফিরে আসুক আমাদের শিক্ষায়, শৃঙ্খলায়, সহনশীলতায়, মায়ামমতায় আচার আচরণে; ফিরে আসুক মানবিকতায়, ফিরে আসুক সংস্কৃতিতে। আমাদের চৈতন্যে ফিরে আসুক সুন্দরের প্রবাহ। আমাদের মানবিকতা গতিশীল হোক।
গত বছর আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবির আন্দোলন। দুটি আন্দোলনই ছিল জনপ্রিয় আন্দোলন। শিক্ষার্থীদের স্বত:স্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন যা একটা অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। কিন্তু তরুণদের এই স্বত:স্ফূর্ত আন্দোলনে সরকারের যেভাবে সাড়া দেওয়ার কথা সেভাবে তারা দেয়নি। সরকার সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করার ঘোষণা দিলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি অমিমাংসিত রেখে দিয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোললেও যাত্রীদের নিরাপত্তার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। সরকার আন্দোলনের মুখে সড়ক নিরাপত্তা আইন পাস করলেও সেই আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা। সড়ক নিরাপদ হলে পরিবহন শ্রমিকেরাও নিরাপদে থাকবে। নতুন সরকার এসব বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিবে বলে আশা করছি। সরকারের আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। শিক্ষার প্রসার ঘটছে কিন্তু মানের প্রসারতা নেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম দিক হচ্ছে ধনী দরিদ্রের মধ্যে সমতা আনা। ধনী দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। আজকের পত্রিকায় দেখলাম ধনী বৃদ্ধির হারে বিশ্বে তৃতীয় বাংলাদেশের অবস্থান। অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারেও প্রথম হয়েছিল বাংলাদেশ এই ধনীদের উত্থান কি অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য হচ্ছে নাকি অনৈতিকভাবে হচ্ছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরে আসলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে নিশ্চয়ই সামাজিক শৃঙ্খলা ও ফিরে আসবে। রাজনৈতিক সহিংসতা প্রভাবিত করে সমাজকে এমন কি পরিবারকেও। আমরা সবরকম সহিংসতা থেকে মুক্তি চাই। রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা পারিবারিক সহিংসতার পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। আমরা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, সামাজিক শৃঙ্খলা এমনকি পারিবারিক শৃঙ্খলা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলে বিশ্বাস করি। সরকারের যে কোন কর্ম পরিকল্পনায় নাগরিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাক এটাই আমরা প্রত্যাশা করছি।
যতবারই নির্বাচন হয় ততবারই নাগরিকদের প্রত্যাশা থাকে তাদের অধিকারগুলোর সুরক্ষা পাওয়ার। প্রত্যাশা থাকে সুশাসনের প্রত্যাশা থাকে আইন শৃঙ্খলার উন্নতির। মানুষের সেই প্রত্যাশা হোঁচট খায় বরাবরই। এইবার মানুষ আবারও বিশ্বাস করতে চায় তাদের প্রত্যাশা পূরণের পথেই হাঁটবে নতুন সরকার। সৌন্দর্য ফিরে আসুক আমাদের কাছে। আমাদের চেতনায়।

Advertisement