সৌদি আরব থেকে কেন ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে ফেরেন তারা?

মঙ্গলবার , ১২ জুন, ২০১৮ at ৭:১০ পূর্বাহ্ণ
40

স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ১২ বছরের সন্তানকে নিয়ে একটু স্বচ্ছল জীবন যাপনের আশায় নয় মাসে আগে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন খোদেজা (ছদ্মনাম)। সম্প্রতি সাতক্ষীরার এই নারী দেশে ফিরেছেন। তবে নিজের বাড়িতে নয়, তার স্থান হয়েছে ঢাকায় মানসিক হাসপাতালে। কারণ ৩২ বছর বয়সী খোদেজা দেশে ফিরেছেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে। গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরবে গিয়ে নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা নারীদের খোঁজখবর নিতে গিয়েই জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে দেখা মেলে খোদেজার। সঙ্গে রয়েছেন তার মা আর ছোট ভাই। দেখা গেল অপ্রাসঙ্গিক সব কথা বলছেন খোদেজা। সুস্থ খোদেজা কেন ফিরলেন অসুস্থ হয়ে? চেষ্টা চলে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার।

ভাই আফজাল বলেন, এইডা কীভাবে বলব, তার কাছে না শুনলে তো কিছু বলতে পারব না যে কী হইছে। ও তো কিছুই বলতি পারছে না। খালি ভুল বকছে। বলছিল যে, পানির সঙ্গে ওষুধ খাওয়াইছে কিনা, ইনজেকশন দিছে। তাই বলছে খালি। সৌদি আরবে যাওয়ার পর খোদেজার সাথে তার পরিবারের সবশেষ কথা হয়েছিল দুই মাস আগে। তখন বলেছিলেন, ভালোই আছেন। আফজাল জানান, এরপর বোনের সাথে কথা হয় দেশে ফিরলে, মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায়। মাঝখানের সময়টায় কী হয়েছিল, তার কোনো উত্তর নেই। খবর বিডিনিউজের।

খোদেজার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি একদম মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় আছেন। অন্যকে সন্দেহ করছেন।…. কথাও এলোমেলো বলছেন। যেটাকে আমরা আমাদের ভাষায় বলে থাকি ‘ব্রিফ সাইকোসিস’, মানে হচ্ছে সাময়িক সময়ের জন্য ভারসাম্যহীনতা। এটা থেকেও যেতে পারে, আবার অনেক সময় দীর্ঘ মেয়াদীও হতে পারে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলছেন, খোদেজার (ছদ্মনাম) অসুস্থতার কারণ শারীরিক নির্যাতন আর তীব্র মানসিক চাপ। যাকে বলা হয় ‘ব্রিফ সাইকোসিস্ট’। কিন্তু খোদেজার এই ‘ব্রিফ সাইকোসিস্টের’ পেছনের কারণ জানা গেছে কি নাএ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা যা পেয়েছি, তীব্র মানসিক চাপ তার ওপর ছিল। কর্মক্ষেত্রে এক ধরনের মানসিক চাপ তিনি অনুভব করতেন এবং সেই চাপটিকেই আমরা সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করছি। সৌদি আরবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথাও বলেন এই চিকিৎসক। খোদেজার মতোই তিন মাস আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফিরে এসেছেন নরসিংদীর ত্রিশোর্ধ্ব মনোয়ারা (ছদ্মনাম)। তার ছোট ভাই লোকমান বলেন, টেনশন করত। আর জিজ্ঞাসা করলে বলে মাইরধর করত। আর কিছু বলে না। ডাক্তার বলছে, ব্রেনে সমস্যা। লোকমান জানান, স্থানীয় একজন চিকিৎসকের কাছে বোনের চিকিৎসা করিয়েছেন। তবে এখনও পুরোপুরি সুস্থ হননি ১২ বছরের এক কন্যা সন্তানের মা মনোয়ারা। অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে এমন ছয়জন ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ গৃহকর্মী ফিরেছেন সৌদি আরব থেকে। কিন্তু সুস্থ অবস্থায় সৌদি আরবে যাওয়া নারী গৃহকর্মীরা কেন ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে দেশে ফিরে আসছেন, তার কোনো সঠিক কারণ উদঘাটন করা যাচ্ছে না। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসানের ভাষ্য, নির্যাতন মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় মানসিক ভারসাম্য হরাচ্ছেন নারী গৃহকর্মীরা

সৌদি আরবে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভালোমন্দ দেখভালের দায়িত্ব সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসের। কিন্তু গৃহকর্মীদের ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে ফেরার কারণ কী? এমন প্রশ্নে কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ। এমন কোনো তথ্যও পাননি বলে জানান তিনি। তবে দুইএক জনের ক্ষেত্রে এমনটা হতেই পারে বলে মনে করেন তিনি।

….. দেড় লক্ষ লোকের মধ্যে একটা লোক, দুইটা লোক বা পাঁচটা লোক একটু মেন্টালি ইয়ে হতেই পারে। দ্যাট ইজ নাথিং অ্যান্ড অ্যান্ড ইয়ে। এখান থেকে ফিরে গিয়েই যে সে মেন্টালি আপসেট হয়ে পড়েছে সেরকম কিছু না,’ বলেন রাষ্ট্রদূত। তার ভাষ্য, সৌদি আরবের আবহাওয়া, তাপমাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, জীবনধারণ পদ্ধতি পুরোপুরি আলাদা হওয়ায় গৃহকর্মীরা মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং খাপ খাওয়াতে পারে না। এজন্য তিনি কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না পাওয়াকে দায়ী করেন তিনি। ২০১১ সালের এপ্রিলে সৌদি ন্যাশনাল রিক্রুটমেন্ট কমিটি বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নিতে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। তবে সৌদি আরবে কর্মরত ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার ১৫০ জন গৃহকর্মীর সাক্ষাৎকারে ‘শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের’ ঘটনা উঠে আসে ২০১০ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনে। ফলে সমঝোতা স্মারক সই হলেও কোনো নারী কর্মী সৌদি আরবে যাননি। এরপর গৃহকর্মী নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ২০১৫ সালে চুক্তি করে সৌদি আরব। সেই চুক্তিতে নারী গৃহকর্মীর ওপর জোর দিয়ে একজন নারীর বিপরীতে ২/৩ জন পুরুষ শ্রমিক নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় দেশটি। এরপরই শুরু হয় নারী গৃহকর্মী পাঠানো।

x